Published : 24 Aug 2025, 02:39 PM
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) বরখাস্ত হওয়া এসআই মাহবুব হাসানকে পেটানোর পর পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে স্থানীয় লোকজন।
নগরের হজোর মোড় এলাকায় শনিবার রাত ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে বলে বোয়ালিয়া থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ জানান।
পিটুনির শিকার ৩৫ বছর বয়সী সাবেক এ এসআইয়ের বিরুদ্ধে নিরীহ মানুষকে ‘হয়রানি’ ও ‘ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের’ অভিযোগ রয়েছে।
বোয়ালিয়া থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, “এসআই মাহবুব হাসানের বিরুদ্ধে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজির একটাই মামলা আছে। ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হবে।
“পরবর্তীতে অন্য কোন মামলায় তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে সেটিতেও গ্রেপ্তার দেখানো হবে।”
রাতে মাহবুবকে পুলিশে তুলে দেওয়ার সময় জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগরীর সাংগঠনিক সেক্রেটারি জসিম উদ্দিন সরকার ও ছাত্রশিবিরের মহানগরের সাবেক সভাপতি খাইরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
পরে জসিম উদ্দিন উপস্থিত স্থানীয় লোকজনের উদ্দেশ্যে বলেন, “এই সেই মাহবুব হাসান, যে মানুষকে কখনও গাঁজা, কখনও হেরোইন, কখনও ইয়াবা দিয়ে মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠাত। আমার সামনে সাক্ষী সোহাগ আছে, এই সোহাগকে মারতে মারতে উলঙ্গ করে মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠিয়েছে। আমাদের রাজশাহীর রেলগেট এলাকার রাজিব আলী রাতুলকেও মেরে আহত করে মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে।
“৫ তারিখের পরে মানুষের কথা বলার সুযোগ হয়েছে, কথা বলছে। এই অপরাধী ঘাপটি মেরে এই শহরে অবস্থান করছিল।”
তিনি বলেন, “এই হাসান অসংখ্য বিএনপি জামায়াতের নেতাকর্মী হত্যার আসামি। আমাদের আফসোস লাগে, ধিক্কার জানাই ওই ব্যবস্থাপনাকে যারা দেখার পরেও তাকে গ্রেপ্তার করছিল না। বিএনপি-জামায়াত এবং সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে এবং তার বাড়িতে গিয়ে জনতা তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে।
“আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আদালতের মাধ্যমে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।”
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) বরখাস্ত হওয়া এসআই মাহবুব হাসানের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর ২০১৩ সালে এসআই নিয়োগে তার চাকরি হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি রাজশাহী নগরের মতিহার থানায় ছিলেন। পরে ২০১৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) যোগদান করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, চাকরিজীবনের শুরু থেকেই ‘অত্যন্ত বেপরোয়া’ ছিলেন মাহবুব। তার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্রলীগ করতেন তিনি। পরে ‘দলীয় প্রভাবে’ পুলিশে চাকরি নেন এবং ডিবিতে যোগ দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে দমন-নিপীড়ন চালান। নিজেকে ‘অপরাজেয়’ ভাবা মাজবুব রাজশাহীতে বিএনপি, জামায়াত, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের অসংখ্য নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে জখম ও পঙ্গু করেছেন।

ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলামকে আটক করে অস্ত্রসহ মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীই নয়; সাধারণ মানুষকেও চাঁদাবাজি ও মামলা বাণিজ্যের ফাঁদে ফেলেছিলেন মাহবুব।
এসব অপকর্মের মাধ্যমে মাহবুব প্রচুর টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে ভুক্তভোগীদের দাবি। রাজশাহীর রেলগেট এলাকার রাজিব আলী রাতুলকেও মাহবুব মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসিনা সরকারের পতনের পর রাতুলের বাবা মাসুদ রানা এই হাসানের বিরুদ্ধে প্রথম বোয়ালিয়া থানার মামলা করেন।
মামলার বরাতে ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর তৎকালীন এসআই মাহবুব হাসান সাদা পোশাকে মাসুদ রানার বাড়িতে গিয়ে তার ছেলে রাজীব আলী রাতুলের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে তাকে শিমলা বাগানে তুলে নিয়ে যান। এরপর মাসুদ রানাকে ফোন করে জানানো হয়, তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচ লাখ টাকা না দিলে রাজীবকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হবে। টাকা নিয়ে শিমলা বাগানে ছুটে গেলে মাসুদ রানাকে ওই টাকাই হাসানের হাতে তুলে দিতে হয়।
“এ সময় হাসান আশ্বাস দেন, রাতুলকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু পরদিন তাকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। এ মামলায় দীর্ঘ ১৬ মাস কারাভোগ করেন রাতুল। জামিন পাওয়ার পর এসআই হাসানের সঙ্গে দেখা হলে রাতুল টাকা ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করেন। তখন হাসান ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং হুমকি দেন-তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ করেছেন, টাকা চাইলে এবার মেরেই ফেলা হবে।”
সরেজমিনে দেখা যায়, পিটুনির ফলে হাসান রক্তাক্ত হয়েছেন। তার মাথায় জখম দেখা গেছে।
নগরীর চন্দ্রিমা থানার ওসি মেহেদী মাসুদ বলেন, “আটকের পর হাসানকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আমাদের থানায় তার নামে মামলা নেই। তাই তাকে বোয়ালিয়া থানা-পুলিশের কাছে হাসপাতালেই হস্তান্তর করে দেওয়া হয়েছে।”
রাজশাহী নগর পুলিশের মুখপাত্র গাজিউর রহমান বলেন, মাহবুব হাসান সবশেষ নগর ডিবিতে ছিলেন। তারপরই তিনি বরখাস্ত হয়েছেন। তার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত এখনও জানেন না।