Published : 20 May 2024, 05:20 PM
ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এখনও এ মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১৬ আসামির হদিস পায়নি পুলিশ।
মৃত্যুদণ্ডের আদেশের বিরুদ্ধে আসামিরা হাই কোর্টে আপিল করেছেন। এখনও শুনানি আসেনি। আটকে রয়েছে মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) শুনানিও।
সম্প্রতি হাই কোর্টে শুনানির জন্য কার্যতালিকাভুক্ত হয়েছে। বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য রয়েছে।
আগামী মাসের শেষ দিকে শুনানি শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন।
পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার, কারাগারে থাকা ২৩ আসামিসহ ৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দ্রুত কার্যকর করার দাবি পরিবারের।
২০১৪ সালের ২০ মে সকালে ফেনী শহরের একাডেমি এলাকায় গাড়িতে থাকা ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একরামকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে, কুপিয়ে, গুলি করা হয়। পরে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার ভিডিও সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
একরামের বড় ভাই জসিম উদ্দিন ৩৩ জনকে আসামি করে মামলা করলে চার বছর পর ২০১৮ সালের ১৩ মার্চ ৩৯ জনকে ফাঁসির আদেশ দেন ফেনীর জেলা ও দায়রা জজ।
এই মামলার আসামি ফুলগাজীর বিএনপি নেতা ও উপজেলা নির্বাচনে একরামের প্রতিদ্বন্দ্বী মাহতাব উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মিনারসহ খালাস পান ১৬ জন। মামলা চলাকালে এক আসামি র্যাবের সঙ্গে ‘কথিত বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান।
ফাঁসির দণ্ড পাওয়া আসামিদের মধ্যে আছেন জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির, ফেনী পৌরসভার তৎকালীন কাউন্সিলর আবদুল্লাহ হিল মাহমুদ। বাকিরা স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী।
পলাতক আসামিদের মধ্যে আছেন ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর মামাতো ভাই আবিদুল ইসলাম আবিদ।
ফেনী আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) হাফেজ আহম্মদ রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “স্থানীয় নির্বাচন থেকে আসামিদের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের কারণে একরামকে হত্যা করা হয়েছে বলে বিচারক রায়ে উল্লেখ করেছেন।”
কেন উচ্চ আদালতে শুনানি আটকা
বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিলে তা উচ্চ আদালতে অনুমোদন করতে হয়। একে বলে ডেথ রেফারেন্স শুনানি। আসামি পক্ষও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারে। দুটি শুনানিই একসঙ্গে চলে।
আসামিদের আইনজীবী আহসান কবীর বেঙ্গল বলেন, “জেলা জজ আদালতে রায় ঘোষণার পর উচ্চ আদালতে আপিল করেন দণ্ডপ্রাপ্তরা। ছয় বছরেও সেই আপিলের শুনানি হয়নি।”
ফেনী আদালতে পিপি হাফেজ আহম্মদ বলেন, “মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র, জব্দ তালিকা, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষীদের জবানবন্দি, জেরা ও নিম্ন আদালতের রায় পর্যায়ক্রমে পেপারবুকে সাজানো থাকে। সম্ভবত পেপারবুক প্রস্তুত না হওয়ায় আসামিদের আপিলের শুনানি শুরু হয়নি।”
ফেনী আদালতের সিনিয়র আইনজীবী শাহজাহান সাজু বলেন, এ মামলায় রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষ পৃথক দুটি আপিল করেছে। উচ্চ আদালতে মামলাটি বর্তমানে ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে।
আসামি পক্ষের সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, “আমরা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছি। হাই কোর্টের কার্যতালিকা অনুযায়ী শুনানি হবে।”
অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, “ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল হাই কোর্টে নিষ্পত্তি হতে পারে এ বছরই। আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স), রায়ের বিরুদ্ধে আপিল ও জেল আপিল-সংক্রান্ত পৃথক আবেদন সম্প্রতি হাই কোর্টে শুনানির জন্য কার্যতালিকাভুক্ত হয়েছে।”
বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য রয়েছে। আগামী মাসের শেষদিকে শুনানি শুরু হতে পারে বলে জানান তিনি।
উচ্চ আদালতে বিচার আটকে যাওয়া ও আসামিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন একরামুল হকের বড় ভাই ও মামলার বাদী জসিম উদ্দিন।
তিনি বলেন, “ন্যায়বিচার থমকে আছে। দেশান্তরী পলাতক আসামিদের অবিলম্বে দেশে এনে রায় কার্যকর করা হোক। একরামের তিন শিশুসন্তান অধ্যায়নরত রয়েছে। তাদের জন্য হলেও আসামিদের গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকর করা হোক।”
নিহত একরামুল হকের স্ত্রী তাসমিন আক্তার বলেন, “নৃশংস হত্যার ১০ বছর অতিবাহিত হলেও এখনও রায় কার্যকর না হওয়া দুর্ভাগ্যের। আমি আমার সন্তানদের নিয়ে আজও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারিনি।
“সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা অনেকে দেশে ও দেশের বাইরে খুব আরাম-আয়েশে ঘুরে বেড়ালেও তাদের ফিরিয়ে আনতেও কখনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমরা এ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত রায় কার্যকর চাই। আমরা ভীতসন্ত্রস্ত না থেকে স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবনযাপন করতে চাই।”
নানা কর্মসূচি
একরামের মৃত্যুবার্ষিকীতে দলীয় একাধিক কর্মসূচি পালিত হয়েছে ফেনীতে। সোমবার দুপুরে প্রয়াত নেতার সমাধিতে ফুল দেন জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। পরে দলীয় নেতা-কর্মীরা কবর জিয়ারত করেন।
বিকালে ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলীয় কার্যালয়ে স্মরণসভা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয় বলে জানিয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের সদ্যনির্বাচিত চেয়ারম্যান হারুন মজুমদার।
কারাগারে যারা
মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে কনডেম সেলে বন্দিদের মধ্যে আছেন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির আদেল, যাকে রায়ে হত্যার পরিকল্পনাকারী বলা হয়েছে। ফেনী পৌরসভার কাউন্সিলর আবদুল্লাহিল মাহমুদ শিবলু, সাজ্জাদুল ইসলাম পাটোয়ারী ওরফে সিফাত, আবু বক্কার সিদ্দিক ওরফে বক্কর, আজমির হোসেন রায়হান, শাহজালাল উদ্দিন শিপন, জাহিদুল ইসলাম জাহিদ ওরফে আজাদ, কাজী শানান মাহমুদ, মীর হোসেন আরিফ, আরিফ ওরফে পাঙ্কু আরিফ, রাশেদুল ইসলাম রাজুও বন্দি।
অন্যরা হলেন- সোহান চৌধুরী, জসিম উদ্দিন নয়ন, নিজাম উদ্দিন আবু, আবদুল কাইউম, নুর উদ্দিন মিয়া, তোতা মানিক, জিয়াউর রহমান বাপ্পি, মো. সজিব, মামুন, রুবেল, হুমায়ুন ও টিপু।
এদের মধ্যে জিয়াউর রহমান বাপ্পিকে ২০২১ সালের ১২ নভেম্বর গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পলাতক যারা
মৃত্যুদণ্ডের সাজা নিয়ে আত্মগোপনে আছেন জাহিদ হোসেন, আবিদুল ইসলাম, চৌধুরী মো. নাফিজ উদ্দিন, আরমান হোসেন, জাহেদুল হাসেম, জসিম উদ্দিন, এমরান হোসেন, রাহাত মো. এরফান, একরাম হোসেন ওরফে আকরাম, শফিকুর রহমান, কফিল উদ্দিন মাহমুদ, মোসলে উদ্দিন, ইসমাইল হোসেন, মহিউদ্দিন আনিছ, মো. বাবলু ও টিটু। এদের মধ্যে আটজন বিচার চলার সময় জামিনে মুক্ত হয়ে পালিয়ে যান।
ফেনী মডেল থানার ওসি মো. শহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তাদের হদিস পেলেই গ্রেপ্তার করা হবে। তবে শুনেছি বেশ কয়েকজন আসামি বিদেশে পালিয়ে রয়েছে।”