Published : 25 Jan 2026, 02:33 PM
নির্ধারিত আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার প্রায় ২৫ বছর পরও লালমনিরহাট ও রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার সংযোগস্থলে তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত ব্রিটিশ আমলের ঐতিহাসিক রেলসেতু দিয়ে প্রতিদিন যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করছে।
সেতুটির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা নিয়ে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ থাকলেও রেল কর্তৃপক্ষের দাবি-‘এ মুহূর্তে বড় কোনো ঝুঁকি নেই’।
রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগীয় প্রকৌশলী শিপন আলী জানান, ১৮৯৯ সালে তৎকালীন নর্দান বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ২ হাজার ১১০ ফুট দীর্ঘ এই রেলসেতুটি নির্মাণ করে।
রেলওয়ের নথি অনুযায়ী, সেতুটির নির্ধারিত মেয়াদ ছিল ১০০ বছর। সে হিসাবে ১৯৯৯ সালে এর কার্যকারিতা শেষ হওয়ার কথা ছিল।

সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুটির একাধিক স্থানে কাঠের স্লিপার পচে গেছে, কোথাও নাট-বল্টু ঢিলা, আবার কোথাও নেই। ভারি ট্রেন চলাচলের সময় সেতুর বিভিন্ন অংশে স্পষ্ট কম্পন অনুভূত হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রেললাইনে ফাটল বা ত্রুটি দেখা দিলে স্থায়ী সংস্কারের পরিবর্তে অস্থায়ীভাবে ঝালাই ও প্যাচওয়ার্ক করে ট্রেন চলাচল আবার চালু করা হয়।
সদর উপজেলার মিশন মোড় এলাকার ব্যবসায়ী মিল্টন খন্দকার বলছিলেন, “তিস্তা রেলসেতুটির ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচলের সময় বুকটা কেঁপে উঠে, না জানি কখন কি ঘটে।”
সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর এলাকার কলেজ শিক্ষার্থী আজিজুল ইসলাম অভিযোগের সুরে বলেন, “দুর্ঘটনা না ঘটলে রেলের ঘুম কখনই ভাঙবে না। অবিলম্বে তিস্তা সেতুর বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্ত আসা দরকার।”
লালমনিরহাট রেলওয়ে থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৮টি যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী ট্রেন তিস্তা রেলসেতু ব্যবহার করে। এসব ট্রেনের মধ্যে তেল, সার ও খাদ্যবাহী ট্রেনও রয়েছে।
এতে যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ভয়াবহ পরিণতি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
৭৫ বছর বয়সী সদর উপজেলার তিস্তা এলাকার বাসিন্দা আলী আহম্মেদ বলেন, “আমার জন্মের আগেই সেতুটি হয়েছে। এখন শুনছি মেয়াদও শেষ। তবু প্রতিদিন ট্রেন চলছে-বড় দুর্ঘটনা হলে দায় নেবে কে?”
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, রাতে তেল বা সারবাহী ট্রেন গেলে পুরো সেতু কেঁপে ওঠে। কিন্তু রেলওয়ে শুধু সাময়িক মেরামত করে দায় এড়াচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রকৌশলী শিপন আলী বলেন, “ভারি ট্রেন চলাচলের সময় কিছুটা ঝাঁকুনি স্বাভাবিক। আমরা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করি। তবে সেতুটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনায় নতুন সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।”

রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, দীর্ঘদিন ধরে নতুন তিস্তা রেলসেতু নির্মাণের প্রস্তাব আলোচনায় থাকলেও এখনো প্রকল্প অনুমোদন, বাজেট বরাদ্দ বা দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ রেল যোগাযোগ বাধ্য হয়েই ঝুঁকিপূর্ণ এই পুরোনো সেতুর ওপর নির্ভর করছে।
তিস্তা এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, “এই সেতু লালমনিরহাটের রেল যোগাযোগের প্রাণ। সংস্কার করে ঝুঁকি এড়ানো যাবে না; দ্রুত নতুন সেতু চাই।”
আদিতমারী উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সুলতান হোসেন বলেন, “মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন যে ট্রেনগুলি চলাচল করছে এতে করে যাত্রীরা ভয় ও শঙ্কা নিয়ে একরকম বাধ্য হয়েই যাতায়াত করছে। সবার আগে যাত্রীদের বিষয়টি আমলে নেওয়া দরকার রেল কর্তৃপক্ষের।

শুক্রবার লালমনিরহাট রেলওয়ে ডিভিশন পরিদর্শনে গিয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “তিস্তা রেলওয়ে সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ। এ মুহূর্তে স্থায়ী সমাধানের কোনো আশাও নেই। বর্তমানে ঝুঁকি কমাতে সেতুতে ট্রেনের গতি নামিয়ে আনা হয়েছে ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটারে।”
“লালমনিরহাট রেল বিভাগে বর্তমানে মিটার গেজ রেললাইনের আধিক্য বেশি। রেল সেবাকে আরও গতিশীল ও আধুনিক করতে পার্বতীপুর থেকে লালমনিরহাট পর্যন্ত ব্রডগেজ লাইন স্থাপন করার একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।”
আঠারো দশকে নির্মিত তিস্তা রেলসেতুটি নিয়ে মহাপরিচালক বলেন, “সেতুটির আয়ুষ্কাল ২৫ বছর আগেই পার হলেও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এটি এখনো সচল রাখা হয়েছে এবং ট্রেন চলাচল অব্যাহত আছে। তবে ব্রডগেজ লাইন স্থাপনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে, বর্তমান সেতুর স্থলে একটি আধুনিক নতুন রেলসেতু নির্মাণের বিষয়টিও সেই পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।”
তিস্তা রেলসেতুর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও মালামাল চুরির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আফজাল হোসেন বলেন, “রেলওয়ে জনগণের রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষা করা কেবল রেল কর্তৃপক্ষের কাজ নয় বরং আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব।”
এ সময় রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক আবু হেনা মোস্তফা, বিভাগীয় প্রকৌশলী আহসান হাবিব ও রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।