Published : 05 Sep 2025, 10:24 PM
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে ‘নুরাল পাগলার’ কবর, বাড়ি ও দরবার শরিফে ‘তৌহিদী জনতার’ নামে হামলা-ভাঙচুরের সময় ভক্তদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শুক্রবার বিকালে গোয়ালন্দ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের জুড়ান মোল্লাপাড়ায় এলাকায় এ ঘটনায় নুরুল হকের লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
জেলার পুলিশ সুপার কামরুল ইসলাম রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন।”
নিহত ব্যক্তি গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের যতু মিস্ত্রিপাড়ার আজাদ মোল্লার ছেলে রাসেল মোল্লা (২৮)। তিনি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন।

জেলা সিভিল সার্জন এস এম মাসুদ বলেন, “আহতদের মধ্যে ২২ জনকে আমরা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছি। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল।”
নুরুল হক সম্প্রতি মারা যাওয়ার পর মাটি থেকে কিছুটা উপরে কবর তৈরি করে তাকে দাফন করা হয়। কবরটির কাবা শরিফের আদল দেওয়া হয়।
বিক্ষুব্ধদের অভিযোগ ছিল, নুরুল হক নিজেকে ইমাম মাহাদি দাবি করতেন; যদিও তার পরিবার ও ভক্তারা সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ নিয়ে তৌহিদী জনতার মধ্যে গত কয়েকদিন ধরেই উত্তেজনা চলছিল। স্থানীয় প্রশাসন দুপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছিলেন।
তার মধ্যেই জুমার নামাজের পর পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, বিভিন্ন স্থান থেকে তৌহিদী জনতা এসে শহীদ মহিউদ্দিন আনসার ক্লাবে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। তারা নুরুল হকের বাড়ি ও দরবারের ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে তারা দরবার শরিফ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
পুলিশ আগে থেকেই সেখানে থাকলেও বিপুল মানুষের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা সক্ষম হয়নি। পরে সেনাবাহিনী ও র্যাব এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
তখন ‘তৌহিদী জনতা’ নামধারীরা পিছু হটে নুরুল হকের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে বিক্ষোভ করে। এ সময় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়।
তখন আহতদের উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে পাঠায়।
এর কিছু পরে বাড়িতে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালায় হামলাকারীরা। তখন তারা বাড়ির সামনে থাকা নুরুল হকের কবর থেকে মরদেহ তুলে নিয়ে চলে যায়। পরে তারা মরদেহটি ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পদ্মার মোড়ে নিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
এ সময় হামলাকারীদের একজন মো. আল আমিন বলেন, “নুরাল পাগল একটা সময় নিজেকে ইমাম মাহাদি দাবি করেছেন। পাশাপাশি তিনি খোদাও দাবি করেছেন। তার কর্মকাণ্ড ছিলে শরিয়তবিরোধী। এসব ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মেনে নিতে পরে নাই। যে কারণে জনতা আজ নুরাল পাগলের দরবার ভেঙে দিয়েছে। বাড়িঘর ভাঙচুর করে আগুন দিয়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে তার লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে ফেলেছে।”
রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার কামরুল ইসলাম বলেন, “জুমার নামাজের পর তৌহিদী জনতা জড়ো হন। তাদের একটা অংশ দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। সে সময় পুলিশের গাড়ি ও ইউএনওর গাড়ি ভাঙ্চুর করে। পরে নুরুল হকের বাড়িতে হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে।”

বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার কামরুল ইসলাম।
স্থানীয়রা জানান, নুরুল হক আশির দশকের মাঝামাঝি চাপের মুখে তিনি এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। পরে আবার তিনি এলাকায় ফিরে আসেন। তার বেশ কিছু ভক্ত-অনুসারীও রয়েছে।
২৩ অগাস্ট ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পরে তার প্রতিষ্ঠিত গোয়ালন্দ দরবার শরীফের ভেতরে কাবা শরিফের আদলে রং করা মাটি থেকে প্রায় ১২ ফুট উঁচু বেদিতে দাফন করা হয়।
এরপর থেকে কবর নিচু, রঙ পরিবর্তন ও ইমাম মাহাদির দরবার শরিফ লেখা সাইনবোর্ড অপসারণের দাবি তোলেন তৌহিদি জনতা বিক্ষোভ করে আসছিলেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে উভয় পক্ষকে নিয়ে একটি সভাও হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি সমাধানে একটি কমিটিও গঠন করে।
কবরের ব্যাপারে প্রশাসন নুরুল হকের পরিবারের সঙ্গে কথাও বলে। পরিবার বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সময় নিয়েছিল। শুক্রবার সেখানে হামলার ঘটনা ঘটল।
থমথমে পরিস্থিতির কারণে নুরুল হকের পরিবার বা তার ভক্তদের সঙ্গে কথা বলা যায়নি। তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
'নুরাল পাগলা'র দরবারে হামলা-সংঘর্ষ, মৃত্যুর গুঞ্জন নিয়ে যা বলছে প্রশাসন
রাজবাড়ীর সেই 'নুরাল পাগলা'র লাশ তুলে আগুন, দরবারে হামলা-ভাঙচুর
উঁচু বেদী করে কবর, 'শরিয়ত-বিরোধী' দাবি তুলে বিক্ষোভের হুঁশিয়ারি