Published : 12 Jul 2025, 01:27 AM
সিলেট নগরী থেকে একটু দূরের গ্রাম জাহাঙ্গীরনগর। ছোট ছোট টিলা দিয়ে এলাকাটি ঘেরা। টিলার পাদদেশে বেশ কিছু বাড়িঘর। অধিকাংশই আধাপাকা, টিনের চাল। বোঝাই যায়, এসব বাড়িঘর করতে গিয়ে টিলা কাটতে হয়েছে। এমন একটি বাড়ির পাশের কিছুটা জায়গা টিনের বেড়া দেওয়া। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কী হচ্ছে।
সামনে গিয়ে দেখা যায়, কিছু লোক টিলার একপাশে শাবল চালাচ্ছেন। মাঝখানে কিছুটা গর্তের মতন হয়েছে। একজন জানালেন, টিলার মাঝখানে এভাবে গর্ত করে রাখলে, সেখানে বৃষ্টির পানি জমা হয়। সেই পানি টিলার ভেতরে ঢুকে মাটি নরম করে ফেলে। তখন কাটতে সুবিধা হয়। সেই মাটি কেটে বিক্রি করে দেওয়া হয়। জায়গাটি খালি হয়ে যায়। তখন সেখানে বাড়িঘর ওঠানো হয়।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, এই প্রক্রিয়ায় মাটি নরম করে টিলা কাটার বড় বিপদ হচ্ছে, বর্ষাকালে ধসের আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। তখন আশপাশের বাড়ির ওপর মাটি ধসে প্রাণহানি ঘটে। সেটা এখন আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি-বেলার তথ্যমতে, এভাবে টিলা কাটা এবং সেখানে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাসবাসের কারণে মাটি ধসে গত সাড়ে তিন বছরে সিলেটে বিভাগে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর গ্রামটি সদর উপজেলার টুকেরবাজার ইউনিয়নের মধ্যে পড়েছে। এখানে ঝুঁকি নিয়ে টিলার পাদদেশে বসবাস করা পরিবারের সংখ্যা অনেক। দেখলেই বোঝা যায়, গত কয়েক বছরে এখানে প্রচুর বসতি গড়ে ওঠেছে। কিছু নির্মাণাধীন।

এলাকার কয়েকজনের সঙ্গে টিলা কাটা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস নিয়ে কথা বলতে চাইলেও সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কেউ কথা বলতে আগ্রহী হননি। তবে কয়েকজন বলেছেন, বৃষ্টির দিনে তারা দিনের বেলায় এখানে থাকলেও রাতে থাকার সাহস পান না। রাতে বেলায় টিলা ধসের ভয়ে পরিবারের লোকজন আশপাশের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে গিয়ে থাকেন।
জানতে চাইলে টুকেরবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সফিকুর রহমান বলেন, “জাহাঙ্গীরনগরে ১৪০০ থেকে ১৫০০ ভোটার রয়েছে। দিন দিন মানুষ বাড়ায় টিলাতে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস বাড়ছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে টিলা না কাটতে মাইকিং করা হয়েছে। ওই এলাকায় অনেকদিন ধরে মানুষজন বসবাস করছে।”
চেয়ারম্যান দাবি করেন, বর্তমানে টিলা কেটে মাটি বিক্রি করা হয় না। তবে টিলা কাটা হচ্ছে, সেটা ঠিক।

“আমরা আমাদের পক্ষ থেকে টিলা না কাটতে সর্বোচ্চটা করছি। বাকিটা প্রশাসন দেখবে, এটা তাদের কাজ।”
কিন্তু প্রশাসন দেখে না; কিংবা দেখেও না দেখার ভান করে বলে অভিযোগ পরিবেশবাদীদের।
তারা বলছেন, এসব টিলা যখন কাটা হয়, তখন খুব নজরদারি চলে। জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে এসব করা হয়। কেউ কেউ টিলার মাটি ব্যবহার করছেন নতুন বাসাবাড়ির ভিটা তৈরিতে। প্রত্যেক বাসার পেছনে রয়েছে টিলা কেটে ফেলে রাখা মাটি। টিলার মাটি কাটতে কাটতে বাসার পেছনের জায়গা বড় হচ্ছে দিন দিন।
অপরিচিত লোক দেখলে এলাকার বাসিন্দাদের চোখেমুখে ভয় কাজ করে। তারা অপরিচিত লোকজনের গতিবিধির ওপর নজর রাখেন। আশপাশের বাসিন্দারা দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। রাতের বেলা এই এলাকার টিলা কাটা মাটি ট্রাকে করে পরিবহন করা হয়।
ভাড়া কম, তাই ঝুঁকি মেনে বসবাস
চারপাশে সবুজ টিলা আর চা বাগান। অপরূপ সিলেটে প্রতি বছরই টিলা ধসে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। সেইসঙ্গে দিন দিন বাড়ছে পাহাড়-টিলায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীর সংখ্যা। তবে কত মানুষ এভাবে বসবাস করছে, তার কোনো তথ্য নেই প্রশাসনের কাছে।
টিলাবহুল এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি প্রভাবশালী চক্র টিলা কাটা বা দখলে রাখার জন্য টিলার পাদদেশে ঘরবাড়ি বানিয়ে ভূমিহীনদের কম টাকায় ভাড়া দিচ্ছেন। আর নিম্ন আয়ের মানুষ কম ভাড়ার কারণে মৃত্যুকূপেই বসবাস করেছেন।
শুধু সদর উপজেলায় নয়; জৈন্তাপুর, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় টিলা ও পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে কয়েক হাজার মানুষ।
সিলেট নগরীর বালুচর, মেজরটিলা, পীরমহল্লা, খাদিমপাড়া, খাদিমনগর, জোনাকি, ইসলামপুর মংলিরপাড় এলাকায় বিভিন্ন টিলার পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সংখ্যা বেড়েছে।

কত মানুষ ঝুঁকিতে, হিসাব নেই
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলছে, সিলেট জেলায় অন্তত ১৫ হাজার মানুষ ‘ঝুঁকির্পূণভাবে’ পাহাড়-টিলায় বসবাস করছেন। তবে জেলা প্রশাসনের হিসাবে এমন পরিবারের সংখ্যা ১৬ শর মত।
সবশেষ ১ জুন গোলাপগঞ্জ উপজেলার লক্ষণাবন্দ এলাকায় টিলাধসে ঘুমন্ত একটি পরিবারের চারজনের প্রাণহানি ঘটে। এর আগে গত বছরের ১০ জুন সিলেট নগরীর মেজরটিলা চামেলিবাগ এলাকায় টিলা ধসে শিশুসহ একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু হয়। ২০২২ সালের ৬ জুন সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নের পূর্ব সাতজনি গ্রামে টিলা ধসে একই পরিবারের চারজনের প্রাণ যায়।
প্রতিবছর টিলা ধসে প্রাণহানি ঘটলেও প্রশাসন তাদের সরে যেতে বাধ্য করে না, শুধু সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করে দায় সারে বলে অভিযোগ পরিবেশবাদীদের।
সিলেট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার মধ্যে ৩৮৬টি পরিবার টিলা-পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। সিলেটে ১৬৯টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়-টিলা রয়েছে। এর মধ্যে সিলেটের গোলাপগঞ্জ পৌর এলাকায় পাঁচটি টিলার পাদদেশে সাতটি পরিবার, একই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ৭১টি টিলার পাদদেশে ৮৮টি পরিবার, বিয়ানীবাজার উপজেলায় নয়টি টিলায় নয়টি পরিবার, কানাইঘাট উপজেলায় একটি টিলায় তিনটি পরিবার, কানাইঘাট উপজেলায় ৭৫টি টিলার মধ্যে একটি টিলায় তিনটি পরিবার বসবাস করছে।
ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ঘিলাছড়া ইউনিয়নের ১২টি টিলায় ৩৮টি পরিবার বসবাস করছে। বিশ্বনাথ উপজেলার একটি টিলায় ছয়টি পরিবার, সদর উপজেলার খাদিমনগরে ২৫টি টিলায় মোট ৭০টি পরিবার, খাদিমপাড়ায় ১৫টি টিলায় মোট ৩৯টি পরিবার, টুকেরবাজারে ২০টি টিলায় ১২৫টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে।

অবশ্য সিলেটের জকিগঞ্জে নয়টি টিলা, গোয়াইনঘাটের পূর্ব জাফলংয়ে ঝুঁকিপূর্ণ একটি টিলাসহ মোট ২৭টি টিলা রয়েছে। সেগুলোতে জনবসতি নেই বলে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের ভাষ্য।
সিলেট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আবদুল কুদ্দুস বুলবুল বলেন, কত হাজার লোক টিলায় বসবাস করেন তার সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের হাতে নেই।
তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. বদরুল হুদা বলেন, “আমাদের একটি জরিপ চলছে। পরিবশে অধিদপ্তর সিটি করপোরেশনের ৮, ৩৫ ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে জরিপ চালিয়ে ৫০০টি পরিবার পেয়েছি টিলাতে। আমাদের কাজ চলমান আছে। আর টিলা কাটার তথ্য পাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের অভিযান চলছে।”
সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদও বলেছেন, কত মানুষ ঝুঁকিপূর্ণভাবে টিলায় বসবাস করছে, তার হিসাব তাদের হাতে নেই।
তবে তিনি বলেন, “সিলেটের বিভিন্ন পাহাড়-টিলায় দেড় হাজারের বেশি বাসাবাড়ি রয়েছে। টিলা এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস রোধে সাইনবোর্ড টাঙানো হবে।”
পরিবেশবাদী সংগঠন সেইভ দ্যা হেরিটেজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টর প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল হাই বলেন, “আমরা ২০১৭ সালে সিলেটে একটা জরিপ চালিয়ে দেখেছি জেলায় টিলার পাদদেশে প্রায় ১০ হাজার পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। তবে বর্তমানে এই সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে।
“কারণ দিন দিন টিলা কাটা বেড়েছে; যার ফলে ‘জ্যামিতিক হারে’ টিলাতে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে। আগের জরিপের থেকে এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে। বসবাসের জন্য টিলার অনেকাংশ কেটে ফেলায় টিলাগুলোও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে ধসে পড়ে প্রাণহাণির ঘটনা ঘটে।”

টিলার সংখ্যা নিয়েও ‘ধুম্রজাল’
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এর ৬ (খ) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারি বা আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করতে পারবে না। তবে অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে পাহাড় বা টিলা কাটা যেতে পারে।
তবে সিলেটে কী সংখ্যক টিলা ছিল, আর তার কতটা এখনও টিকে আছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে নেই।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি-বেলার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৬ সালে ভূমির মাঠ জরিপের তথ্যে সিলেটের ছয় উপজেলায় এক হাজার ২৫টি টিলার অস্তিত্ব ছিল। এর বাইরে আরও তিনটি উপজেলায় বেশ কিছু টিলা ছিল। এর মধ্যে অন্তত ১০০ টিলা পুরোপুরি কিংবা আংশিক সাবাড় হয়ে গেছে।
সেই এক হাজার ২৫টি টিলার মধ্যে নগর ও উপকণ্ঠ মিলিয়ে সিলেট সদর উপজেলায় টিলা ছিল ১৯৯টি। এর বাইরে গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ৪১৩টি, বিয়ানীবাজারে ২৭০টি, জৈন্তাপুরে ৯৮টি, গোয়াইনঘাটে ৪৪টি ও কোম্পানীগঞ্জে একটি টিলা ছিল সে সময়। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় ২৫১ দশমিক ৮ একর টিলা শ্রেণির ভূমি এবং দক্ষিণসুরমা ও কানাইঘাট উপজেলায়ও কিছু টিলার কথা এসেছিল জরিপে।
টিলা কাটা বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালানো হয় বলে জানান সহকারী পরিচালক মো. বদরুল হুদা। তিনি বলেন, পাহাড়-টিলা কাটা বন্ধে নিয়মিত অভিযান হচ্ছে। তার ধারাবাহিকতায় গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত সাতটি মামলায় ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া টিলা কাটার অভিযোগে পাঁচজনকে ১০ লাখ ২৮ হাজার ১০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ বলেন, টিলা এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস রোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুসারে প্রশাসনের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। বর্ষার মে মাসের মাঝামাঝি থেকে মাইকিং, দফায়-দফায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।