Published : 13 Aug 2025, 09:53 AM
“পূর্ণিমা ও অমাবস্যায় সন্ধ্যা নামার আগে গহিন বনে অবস্থান নেই। সন্ধ্যা নামলে অভয়ারণ্যের নদী-খালে নিস্তব্ধ অন্ধকারে তখন শুধু পানির কলকল শব্দ আর দূর থেকে ভেসে আসা কিছু মানুষের ফিসফাস শোনা যায়।
“তখনই মাছ শিকার করি।” -কথাগুলো বলছিলেন খুলনার দাকোপ উপজেলার সুতারখালি এলাকার বনজীবী জেলে মোজাম ফকির।
প্রজনন মৌসুমেও পূর্ব ও পশ্চিম সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে দেদার চলছে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার। কিছু অসাধু জেলে বিষ ব্যবহার করে মাছ ধরায় বনের গহিনে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, মাছের পোনা, অন্যান্য জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রতিনিয়ত ধ্বংস হচ্ছে।
ফলে প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনে মাছ ধরা পাশ পারমিট বন্ধ রাখা শুধু ‘কাগজে কলমে’ সীমাবদ্ধ থাকছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রতি বছর ১ জুন থেকে ৩১ অগাস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। এ সময় সুন্দরবনে সাধারণ মানুষের চলাচলসহ বনজীবীদের প্রবেশের পাশাপাশি পর্যটক প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা থাকে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, “জুন থেকে আগস্ট-এই তিন মাস সুন্দরবনের নদী-খালের মাছের প্রজনন মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। এই তিন মাস সুন্দরবনের নদী ও খালে থাকা বেশির ভাগ মাছ ডিম ছাড়ে। এছাড়া এই সময়ে বন্যপ্রাণীরও প্রজনন মৌসুম। এই তিন মাস বনে পর্যটক ও বনজীবীরা না গেলে বনের জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী নিরুপদ্রব থাকে।”

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুন্দরবনের প্রশাসনিক অবকাঠামো খুবই দুর্বল। অধিকাংশ টহল ফাঁড়ি ভাঙাচোরা। আধুনিক অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, জলযানের অভাবে ডাকাত, চোরাশিকারির পিছু নিতে বন কর্মকর্তা-প্রহরীদের আগ্রহ কম। এ কারণে বন অপরাধী চক্রের সঙ্গে তারা মিলেমিশে থাকেন।
জনবল সংকটসহ বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও সুন্দরবনকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধ দমনে বন কর্মকর্তা ও প্রহরীরা সচেষ্ট রয়েছেন বলে দাবি খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ।
এছাড়া সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ উপকূল এবং নদীর মোহনায় ‘নেট জাল’ দিয়ে চিংড়ির পোনা ধরছেন স্থানীয়রা। জালগুলো মশারির মতো প্রায় নিশ্ছিদ্র। এতে চিংড়ির সঙ্গে নানা জাতের মাছের রেণু, পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ ও মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য-সামুদ্রিক প্রাণীর লার্ভাও মারা পড়ছে।
সব মিলিয়ে হুমকির মুখে পড়েছে বনের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ।
তবে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের প্রবণতা ঠেকাতে ‘ড্রোন দিয়ে নজরদারি’ করা হচ্ছে বলে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন।

‘পূর্ব’ ও ‘পশ্চিম’ এই দুটি প্রশাসনিক বিভাগে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ বিভক্ত। খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ নিয়ে পশ্চিম সুন্দরবন। আর বাগেরহাট ও খুলনার সামান্য অংশ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন।
সুন্দরবনের এই দুই বিভাগের খুলনার কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপ, বাগেরহাটের মোংলা, শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বেশিরভাগ বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। তাদের প্রায় অধিকাংশই বংশপরম্পরায় বনজীবী এবং সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদীতে সারা বছর মাছ-কাঁকড়া ধরে এবং বনে গোলপাতা ও মধু আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
সুন্দরবন লাগোয়া এসব গ্রামগুলোর পুরুষরা সুন্দরবনে মাছ ধরা, গোলপাতা কাটা, কাঁকড়া ধরা ও মধু আহরণ করেন। আর নারী ও শিশুরা ব্যস্ত থাকেন চিংড়ির পোনা ধরা ও কাঠ সংগ্রহের কাজে। কিন্তু বর্তমানে নানা সংকট এসব বনজীবীদের জীবন-জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
মহাজন-বনবিভাগের যোগসাজশ
সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো বনের নদী-খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরার প্রতিযোগিতা। এই অপতৎপরতার পেছনে কাজ করছে প্রভাবশালী কয়েকটি গোষ্ঠী। একটি গোষ্ঠী বন উপকূলের একশ্রেণির মাছ ব্যবসায়ী, যাদের বলা হয় ‘কোম্পানি মহাজন’। তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত জেলেদের প্ররোচনা দেন বিষ ছিটিয়ে দ্রুত বেশি মাছ শিকারে। আরেক গোষ্ঠী হলো অসাধু বনরক্ষী। কোম্পানি মহাজনদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে তারা অভয়ারণ্যের নদী-খালে ঢুকে বিষ ছিটিয়ে মাছ ধরার সুযোগ করে দেন। এসব চক্রকে সহযোগিতা করছেন এক শ্রেণির সাংবাদিক।
বনজীবীদের ভাষ্য, সুন্দরবনে সারা বছরই কিছু অপরাধ কর্মকাণ্ড চলে। বিশাল এ বনের সবখানে সারা বছরই তারা সক্রিয় থাকেন।
খুলনার সুন্দরবন ঘেঁষা কয়রা উপজেলার তেঁতুলতলার চর এলাকার বনজীবী গফুর গাজী বলেন, জঙ্গল ব্যবসায়ী ‘মহাজনদের’ (যারা বনভূমি থেকে সম্পদ আহরণ করে ব্যবসা করে) টাকা দিয়ে তারা বনের অভয়ারণ্যের নদ-খাল ইজারা নেন। বন কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করেন মহাজনরা। তবে বন্ধের সময় তাদের টাকা ‘বেশি’ দিতে হয়।

“আর বনের প্রহরীদের সঙ্গে আমরা সমঝোতা করে নেই। প্রহরীরা না চাইলে বনের একটা খালের পানিও জেলেদের ছোঁয়ার ক্ষমতা নেই। বন বিভাগের লোকজন ডিউটি খরচের নামে বন ফাঁড়িতে আমাদের কাছ থেকে সারা বছরই সমানে টাকা আদায় করে।”
চাহিদামত টাকা না পেলে ভোর হতেই দালালদের মাধ্যমে বন বিভাগের লোকেরা ট্রলারে এসে রাতভর ধরা মাছ নিয়ে যায়। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলে ধরে নিয়ে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ বনজীবী গফুর গাজীর।
তিনি বলেন, “বনের অন্য সব খালের চেয়ে অভয়ারণ্যে বেশি মাছ পাওয়া যায়। যে কারণে অভয়ারণ্যের খাল দখল নিয়ে স্থানীয় মহাজনদের মধ্যে ‘প্রতিযোগিতা’ রয়েছে। মহাজনরা দালালদের মাধ্যমে বন বিভাগকে ‘মোটা অংকের টাকা দিয়ে’ অভয়ারণ্যের খাল দখল নেন। পরে তা জেলেদের কাছে চুক্তিতে ইজারা দেওয়া হয়।
“তবে বিপত্তি বাধে যখন বড় ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ‘বেশি টাকা’ নিয়ে ছোট ব্যবসায়ীদের ওই এলাকা থেকে সরিয়ে দিতে জেলেদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়, তখন।”
সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু, দুর্যোগ, সুন্দরবন সুরক্ষা ও শিক্ষা সহায়তা বিষয়ে নিয়ে কাজ করা কয়রা সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি তারিক লিটু বলেন, “সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদের কিছু প্রভাবশালী বন বিভাগকে ম্যানেজ করে অভয়ারণ্য এলাকাতে সারা বছরই বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার করেন। এমনি হরিণসহ বন্যপ্রাণী নিধনও থামানো যায়নি।”
সুন্দরবন সুরক্ষায় বনে প্রবেশাধিকার আরও সংরক্ষিত, বনের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ এবং বন বিভাগের জনবল, লজিস্টিক সাপোর্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই সততা থাকতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

একই সঙ্গে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার প্রভাবশালী অসাধু মাছ ব্যবসায়ী আড়তদার মহাজনদের তালিকা করে তাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, “জনবল সংকটসহ বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও সুন্দরবনকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধ দমনে সচেষ্ট রয়েছেন বন কর্মকর্তা ও প্রহরীরা। প্রায়ই কীটনাশক, কীটনাশক প্রয়োগে ধরা মাছ, নিষিদ্ধ ঘন জাল ও হরিণ শিকারের ফাঁদ, মাংসসহ অনেককে আটক করা হচ্ছে। ধ্বংস করা হচ্ছে গহিন বনে বানানো শুঁটকির মাচা।”
“তবে টহল বোটের শব্দ পেলেই অপরাধীরা পালিয়ে যায়।” যোগ করেন তিনি।
বেপরোয়া অপরাধী চক্র
সুন্দরবনের সাধারণ জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার’ সময়টাতে বনঅপরাধ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এ সময় দর্শনার্থী এবং সাধারণ জেলেরা না থাকার সুযোগে একাধিক অপরাধী চক্র বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
খুলনার সুন্দরবন প্রভাবিত দাকোপ উপজেলার সুতারখালি এলাকার বনজীবী জেলে মোজাম ফকির বলছিলেন, সুন্দরবনের অভয়ারণ্যের নদী-খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরা এখন সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে এ প্রবণতা বেড়েছে।
“সুন্দরবনে এখন মাছ ধরতে গেলে কোম্পানি মহাজনদের তালিকাভুক্ত হতে হয়। ওই চক্রের বাইরে কোনো বনজীবী জেলে সুন্দরবনে মাছ ধরতে গেলে বন কর্মকর্তা-প্রহরী বা পুলিশ দিয়ে মাছসহ ধরিয়ে দেওয়া হয়।”
মোজাম বলেন, “বন বিভাগের স্থানীয় অফিস থেকে প্রথমে জেলেদের নামে বিএলসি নেন ‘জঙ্গল’ ব্যবসায়ী মহাজনরা। জেলেদের নামে বন বিভাগের বিএলসি নিলেও নিয়ন্ত্রণ থাকে মহাজনের হাতে। দাদন ও ভাড়ার ফাঁদে ফেলে তারা জেলেদের পাঠান প্রবেশ নিষিদ্ধ অভয়ারণ্যে বিষ দিয়ে মাছ ধরতে।”

সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনের বনজসম্পদ আহরণে অবৈধ ও অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করার এ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলছেন, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষায় কর্মরত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা ফাউন্ডেশন’-এর মিডিয়া সমন্বয়ক ওবায়দুল কবির সম্রাট।
সম্রাট বলেন, “আগে দেখা যেত, অভয়ারণ্য এলাকায় একটি-দুটি দল বিষ দিয়ে মাছ ধরত; তারা মৎস্যজীবী ছিলেন। কিন্তু এখন সেখানে দাদনদাতা হয়ে গেছেন সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মাছ ব্যবসায়ী মহাজন। তারাই এখন বনবিভাগের সঙ্গে রফা করেন। পরবর্তীতে বনের অভয়ারণ্যের বিভিন্ন নদী-খাল জেলেদের কাছে অলিখিত ইজারা দেন। এসব চক্র অবৈধ নানা উপায়ে সুন্দরবনের বনজসম্পদ আহরণ ও পাচারে জড়িত।”
তিনি বলেন, “বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-প্রহরীদের যোগসাজশে পশ্চিম সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে খুলনার কয়রা ও দাকোপ এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগরকেন্দ্রিক কয়েকটি চক্র গড়ে উঠেছে। আরও কয়েকটি চক্র রয়েছে পূর্ব সুন্দরবনের বাগেরহাটের মোংলা, শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জকেন্দ্রিক। অসাধু কিছু বন কর্মকর্তা-প্রহরী বছরের পর বছর সুন্দরবনের একই এলাকায় দায়িত্ব পালন করায় এসব চক্রের সঙ্গে মিশে রয়েছেন। এদের সহযোগিতা করছেন স্থানীয় একশ্রেণির সংবাদকর্মী।
“বিষ, নিষিদ্ধ ঘন জাল বা হরিণ শিকারের ফাঁদসহ কেউ ধরা পড়লে ওই চক্রের কারও নাম প্রকাশ করতে চায় না। কারণ ওরাই আবার তাদের মুক্ত করে আনে। এ কারণে মূল অপরাধী চক্র বরাবরই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসবের পেছনে টাকা, প্রভাব আর দায়মুক্তির চুক্তি কাজ করে।”
তবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সুন্দরবনে প্রবেশ করে মাছ-কাঁকড়া ধরা বা বন্যপ্রাণী শিকারের কোন সুযোগ নেই দাবি করে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, “সুন্দরবনে সারা বছরই বন বিভাগের নিয়মিত জোরালো টহল অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
বিষ দিয়ে ধরা মাছ শুঁটকি করে বিক্রি
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ‘প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার’ মাঝেই পশ্চিম সুন্দরবনের গহিন বনের নীলকোমল স্টেশনের আওতাধীন বালুরগাং, আমড়া তুলি, নীলকোমল অফিস খাল, বঙ্গবন্ধু চর, পুনতি দ্বীপ, কেঁড়ড়াসুটি, ভোমরখালীর আওতাধীন বয়ার শিং, ভোমরখালি অফিস খাল, পাটকোস্টার আওতাধীন মোরগখালী, চেরাগাখি, পাটকোস্টা অফিস খাল, কাশিয়াবাদের আওতাধীন নলবুনিয়া, বজবজা, খাসিটানা, ছোটো দুখমুখি, বড় দুধমুখি, পিনখালি, চালকি, কালাবগির আওতাধীন আদাচাই, অফিস খাল, মামার খাল, গেওয়াখালীসহ অন্যান্য খাল ও ভারানিতে ২০০-২৫০টি নৌকায় চিংড়ি ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিকার করেন ‘একদল জেলে’।
ওইসব এলাকার বনজীবী জেলেরা বলছেন, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার মাছ ব্যবসায়ী মহাজনদের হয়ে সারা বছরই মাছ ধরেন তারা। ওইসব মাছ ভোরে কয়রার বেদকাশির ফুলতলা, চাঁদালি, শ্যামনগরের নওয়াবেকী, গাবুরা, প্রতাপনগর, দাকোপের নলিয়ান ও সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে মোংলায় বিভিন্ন আড়তে বিক্রি করা হয়।
জেলেদের ভাষ্য, স্থানীয় লোকজন এসব মাছ খায় না। এসব মাছ থেকে বিশেষ করে চিংড়ি থেকে ‘বিষের উৎকট গন্ধ’ আসে। ফলে এগুলো চলে যাচ্ছে ঢাকাসহ অন্য বড় শহরে। বড় রেস্তোরাঁ, নামিদামি সুপারশপের পাশাপাশি অনলাইনে সুন্দরবনের মাছ এবং শুঁটকি বলে ব্র্যান্ডিং করেও বিক্রি হয়।
সুন্দরবন ঘেঁষা কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের আনোয়ার হোসেন নামের এক জেলে বলেন, “বিষ দিয়ে ধরা চিংড়ি সরাসরি লোকালয়ে আনা হয় না। স্থানীয় শুঁটকির ফড়িয়ারা গোপনে জেলেদের কাছ থেকে কম দামে এসব চিংড়ি কিনে সুন্দরবনের সন্নিকটে কয়েকটি উপজেলায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ‘খটিঘরে’ আগুনে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করে চড়া দামে বিক্রি করেন।
“বিষ দিয়ে ধরা চিংড়ি থেকে বিষের গন্ধ আসে-লোকালয়ে আনা যায় না। যে কারণে বনের মধ্যেই এখন চিংড়ি শুকানোর ব্যবস্থা করা হয়। প্রতি কেজি শুঁটকি ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়।”
তিনি বলেন, “এ কাজে গহিন বনের ভেতরে গাছ কেটে ফাঁকা জায়গা তৈরি করা হয়। তারপর অস্থায়ী মাচা করে আগুন দিয়ে চিংড়ি শুকানো হয়। পরে তা বস্তায় ভরে নদীপথে বিভিন্ন শহরে পাঠানো হয়। সিমেন্টের কাঁচামাল নিয়ে সুন্দরবনঘেঁষা কয়রার আংটিহারা শুল্ক অফিস হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা জাহাজের কর্মীদের মাধ্যমেও বিষ দিয়ে ধরা চিংড়ি ও হরিণের মাংস পাচার হয়। আবু বক্কার নামে ঘাট মাঝি ও শুল্ক স্টেশনের কর্মচারী স্থানীয় একব্যক্তি এর হোতা।”
তবে আবু বক্কার এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসব তার প্রতিপক্ষের রটনা।
বিষ দিয়ে মাছ ধরে তারপর শুঁটকি তৈরির বিষয়টি সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক দীপক চন্দ্র দাসও শিকার করেছেন।
তিনি বলেন, “কিছু অসাধু জেলে সুন্দরবনের গহিনে কীটনাশক ছিটিয়ে চিংড়ি ধরেন। পরে গাছ কেটে আগুনে শুকিয়ে শুঁটকি বানান। আমরা অভিযানে গহিন বনে এমন কারখানার সন্ধান পাচ্ছি। এসব শুঁটকির কারখানাগুলো আগে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার লোকালয়ে ছিল। বন বিভাগ ও প্রশাসনের অভিযান এড়াতে এখন সেগুলো বনের গভীরে চলে গেছে।”
তবে নীলকোমল ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম ও কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন মাছ ব্যবসায়ী মহাজন চক্রের কাছ থেকে ‘উৎকোচ নিয়ে’ অভয়ারণ্য এলাকাতে জেলেদের বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
বিষ প্রয়োগে মাছ ধরা হয় কী করে?
বিষ দিয়ে মাছ ধরার প্রক্রিয়া কি জানতে চাইলে দাকোপ উপজেলার সুতারখালি এলাকার বনজীবী জেলে মোজাম ফকির বলেন, পূর্ণিমা ও অমাবস্যায় বনে প্রবেশের সময় তারা মহাজনদের দেওয়া কৃষিকাজে পোকা দমনে ব্যবহৃত ডায়মগ্রো, ফাইটার, রিপকর্ড ও পেসিকল নিয়ে যান। সন্ধ্যা নামার আগে গহিন বনে অবস্থান নেন তারা।
পূর্ব অভিজ্ঞতায় খালে মাছের ধরন বুঝে দুই ধরনের কীটনাশক বিষ ব্যবহার করেন তারা। একটা সাদা মাছের জন্য, আরেকটি চিংড়ির জন্য। জোয়ার হওয়ার কিছু আগে ভাত, চিড়া, পাউরুটি বা বিস্কুটের সঙ্গে কীটনাশক মিশিয়ে খালের পানির মধ্যে ছিটিয়ে দেন।
খালের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ছোট ফাঁসের জাল পাতেন। ভাটার সময় পানি নামতে শুরু করলে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিস্তেজ হয়ে পানিতে ভেসে ওঠে এবং জালে আটকে যায়। তখন জেলেরা ওইসব মাছ সংগ্রহ করেন বলে জানান মোজাম ।
তিনি বলেন, “বনের অভয়ারণ্যের খালে বিষ দেওয়ার পর মাছ ভেসে উঠলে বড় মাছগুলো তারা তুলে নেন। কিন্তু ছোট মাছগুলো থেকে যায়। সেগুলো অনেক পাখি খায়। যার ফলে বনের নদী ও খালে প্রায়ই মৃত পাখি ভাসতে দেখা যায়।”
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মোজাম ফকির বলেন, “বিষ দিয়ে মাছ শিকার করলে একসঙ্গে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। তবে বিষ দিয়ে মাছ ধরার পরে ওই খালে অনেক দিন কোনো মাছ ঢোকে না। কারণ খালে মাছের খাবার থাকে না। যে কারণে আমরা এখন আগের চেয়ে মাছ কম পাচ্ছি।
“ছোট ফাঁসের জালে বনের নদী ও খালের নিচে থাকা শামুক, ঝিনুক, সামুদ্রিক শৈবাল, প্রবাল, মরা গাছের শিকড়-ডালপালাসহ সবকিছু উঠে আসে।”
নিরাপত্তাহীনতায় বিপন্ন বনজীবীরা
প্রবেশ নিষেধের সময়ে মাছ শিকারের বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনার সুন্দরবন ঘেঁষা কয়রা উপজেলার তেঁতুলতলার চর এলাকার বনজীবী গফুর গাজী বলেন, “নিয়ম মানলে তো আর পেট চলে না। আমাদের সঞ্চয় নেই। বছরের একটা বড় সময় নিষেধাজ্ঞার কারণে ৯২ দিন বনে ঢোকা যায় না।
“পরিবার এ সময়ে না খেয়ে, আধপেটা খেয়ে থাকে। এ সময়ে সরকারের কোনো খাদ্যসহায়তাও আমরা পাই না। পরিবার বাঁচাতে বাধ্য হয়ে আমরা নিষিদ্ধ সময়েও বনে যাই।”
এখন শুধু সুন্দরবনের ওপর নির্ভর করে ‘সংসার চলে না’ জানিয়ে তিনি বলেন, “বনে আগের মত মাছ-মধু, গোলপাতা মিলছে না। তাছাড়া দিন যত যাচ্ছে, বন কর্মকর্তা-প্রহরীদের ঘুষের পরিমাণ এবং মহাজনদের নির্দয় আচরণও তত বাড়ছে।”
খুলনার কয়রা উপজেলার ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের শাজাহান সানা বলছিলেন, ছোটবেলা থেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গহিন বনের নদী-খালে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে এখন আর আগের মতো সংসার চালাতে পারছেন না। কোম্পানি মহাজন চক্রের কাছে থেকে দাদন নেওয়ায় ‘কম দামে’ তারা তাদের কাছে মাছ বিক্রি করতে বাধ্য করেন।
কেউ প্রতিবাদ করলে বন বিভাগের লোক দিয়ে আটক, জেল-জরিমানা এবং বিএলসি আটকে রেখে শাস্তি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
যদিও সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমানের ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞার তিন মাস প্রান্তিক জেলে-বাওয়ালিদের বিকল্প খাদ্য সহায়তার দেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা। এটা প্রক্রিয়াধীন আছে।
মাছে বিষ প্রয়োগ ও বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে সুন্দরবনকে বিপন্ন করার যে অভিযোগ রয়েছে- সে প্রসঙ্গে জানতে পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনার কয়রা ও দাকোপ কেন্দ্রিক কয়েকজন মহাজনের সঙ্গে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
তারা বলছে, ‘জঙ্গল’ ব্যবসা এখন আর আগের মতো নেই। বনজসম্পদ আহরণে পদে পদে ‘ঘুষ’ লাগায় ‘ক্ষতি পোষাতে’ তারা বনের নদী-খালে মাছ শিকারে বিষ ব্যবহার করেন। গোলপাতা নৌকায় বেশি করে গোলপাতা ও কাঠ বোঝাই করতে বাধ্য হন। মধুতে ভেজাল মেশান, বনের ভেতরে কাঠ পুড়িয়ে শুঁটকি তৈরি ও বন্যপ্রাণী শিকার করেন।
তাদের ভাষ্য, ‘জঙ্গলে’ ব্যবসা করতে হলে স্থানীয় দালাল চক্রের মাধ্যমে সারা বছরই বন কর্মকর্তা-প্রহরীদের টাকা দিতে হয়। তাদের চাহিদা মত টাকা না দিলে বন্যপ্রাণী হত্যা ও পাচার মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া দেওয়া হয়। বন নিষেধাজ্ঞার সময়ে আরও বেশি টাকা দিতে হয়। তবে তারা বেশি টাকা পেলেই একজনকে সরিয়ে অন্য ব্যবসায়ীদের বনের নদী-খাল দেন। এবার নৌকা প্রতি ১০-১৫ হাজার টাকা করে দিয়ে বন বিভাগকে ‘ম্যানেজ’ করে তারা বনে ঢুকছেন।
মহাজনদের অভিযোগ, খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ছিলেন। এ সময়ে তিনি কয়েকটি বনঅপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হওয়ার পর তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। দুই বন প্রহরীর যোগসাজশে খুলনা রেঞ্জের আওতাধীন বিভিন্ন স্টেশনে তার পছন্দের লোক বসিয়ে তিনি মোটা অংকের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ওইসব বনঅপরাধী চক্রের মাছ ধরার সুযোগ করে দিচ্ছেন। খুলনা থেকে তারা বন কর্মকর্তা-প্রহরীদের বদলি ও পোস্টিং নিয়ন্ত্রণ করেন।
তারপর রয়েছে বনদস্যুদের অত্যাচার। সুন্দরবনে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কয়েকটি বনদস্যু দল। তারা বনজীবীদের আটকে রেখে তাদের কাছ থেকে টাকা নেয়।
তবে বনজীবীরা বলছেন, বনে বনদস্যু কোম্পানি মহাজনরা এখন ‘এককাট্টা’। ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণের পর যে বনদস্যুরা নিক্রিয় ছিল, অসাধু মাছ ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতায় তারা আবার সুন্দরবনে ফিরেছে। এই ডাকাতরা নির্দিষ্ট কোম্পানি মহাজনের নিয়োজিত জেলেদের সুরক্ষা দেয়, আর অন্যদের ডাকাতি করে। বনের মধ্যে যেখানে নেটওয়ার্ক পায় সেখানে গিয়ে মোবাইল ফোনে মহাজনদের সঙ্গে কথা বলে।
তবে বনঅপরাধীদের সঙ্গে বন কর্মকর্তা-প্রহরীদের সখ্যতার অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করেছেন সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান।
তিনি বলেন, “বনকেন্দ্রিক অপরাধের সঙ্গে বন কর্মকর্তা-প্রহরীদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অনৈতিক সুবিধা না পেয়ে অনেকেই এসব অভিযোগ করেন।”
বিষের মাছ জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি
“বিষাক্ত পানির মাছ খেলে মানুষের পেটের পীড়াসহ কিডনি ও লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ক্যান্সারেরও ঝুঁকি তৈরি করে। যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।” বলেন, খুলনার ডেপুটি সিভিল সার্জন সৈকত মো. রেজওয়ানুল হক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ প্রয়োগের ফলে পানি বিষাক্ত হয়ে জলজপ্রাণী মারা যাচ্ছে। বনের উদ্ভিদের ওপরও এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে; হুমকির মুখে রয়েছে গোটা বনের জীববৈচিত্র্য।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষক অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, “সুন্দরবনের যেসব খালে কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়, তার বিষক্রিয়া ওই এলাকায় চার মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত থাকে। এর ফলে জলজপ্রাণীদের প্রজনন ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত ও সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
“আবার এই কীটনাশক মিশ্রিত পানি ভাটার টানে যখন গভীর সমুদ্রের দিকে যায়, তখন সেই এলাকার মাছও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
অধ্যাপক হারুন বলেন, “কীটনাশক প্রয়োগের পর জেলেরা সেখান থেকে শুধু বড় মাছগুলো সংগ্রহ করেন। ছোট মাছগুলো তারা নেন না। কিন্তু এই ছোট মাছগুলো ছিল বড় মাছের খাবার। ফলে ওই এলাকার খাদ্যচক্রেও ব্যাপক প্রভাব পড়ে।
“শুধু বিষ প্রয়োগ নয়, বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ ঘন জাল ব্যবহার করে মাছ ধরা হচ্ছে। মাছ ধরার এইসব প্রক্রিয়া বনের জলজ জীববৈচিত্র্যকেই বিপন্ন করে তুলেছে।”
এ বিষয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক নাজমুল আহসান বলেন, “দীর্ঘমেয়াদে বিষ দিতে থাকলে পরিবেশে এটা থেকে যায়। এটা খাদ্যচক্রে থেকে যাচ্ছে। এটা সরাসরি মাছের শরীরে যাচ্ছে, সেই মাছ আমরা খাচ্ছি।
“বিষক্রিয়ায় মাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। মাছের ক্ষেত্রে পানি থেকে অক্সিজেন ফুলকার মাধ্যমে ডিফিউশন হয়ে ব্লাডে যায়। ডিজলভ অক্সিজেন থেকে ব্লাডে যায় ডিফিউজড অক্সিজেন। বিষের কারণে ফুলকাটা তখন ইন-অ্যাকটিভ হয়ে যায়; অন্য কোনো ক্ষতি হয় না, মাছটা অবশ হয়ে যায়। তবে বিষটা মাছের শরীরে থেকে যায়।”
তিনি বলেন, খাদ্যচক্রে মাটির তলদেশে ছোট ছোট প্রাণী থাকে, তাদের ক্ষেত্রেও এটা হচ্ছে। ধীরে হলেও এর প্রভাব এবং প্রতিক্রিয়া কী হবে, কতটুকু হবে তা গবেষণার বিষয়।
বন বিভাগের তথ্য বলছে, সুন্দরবনের ৬০১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে জলভাগের পরিমাণ ১৮৭৪ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার, যা পুরো সুন্দরবনের আয়তনের ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ। ১৩টি বড় নদীসহ ৪৫০টির মতো খাল রয়েছে সুন্দরবনে। সুন্দরবনের আয়তনের অর্ধেকের বেশি এলাকা এখন অভয়ারণ্য। এসব এলাকায় জেলেদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
প্রায় ২৮৯ প্রজাতির স্থলজপ্রাণী বাস সুন্দরবনে। আছে প্রায় ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর, বিভিন্ন প্রজাতির মাছসহ ২১৯ প্রজাতির জলজ প্রাণী।
জোয়ারে পানিতে প্লাবিত হওয়া বনের জলাধার ভেটকি, রূপচাঁদা, দাঁতিনা, চিত্রা, পাঙাশ, লইট্যা, ছুরি, মেদ, পাইস্যা, পোয়া, তপসে, লাক্ষা, কই, মাগুর, কাইন, ইলিশসহ ২১০ প্রজাতির সাদা মাছের আবাস। রয়েছে গলদা, বাগদা, চাকা, চালী, চামীসহ ২৪ প্রজাতির চিংড়ি।
শিলাসহ ১৪ প্রজাতির কাঁকড়ার প্রজননও হয় এখানে। পাশাপাশি এখানে ৪৩ প্রজাতির মালাস্কা ও এক প্রজাতির লবস্টার রয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে (বাগেরহাট ও খুলনার সামান্য অংশ) পাঁচ হাজার ৮০০ জন আর পশ্চিম বিভাগে (খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ) ছয় হাজার ৩১০ জন তালিকাভুক্ত বনজীবী রয়েছেন। আর বছরে ২ লাখেরও বেশি দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেন।
কী ব্যবস্থা?
এ বিষয়ে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক বলেন, সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চল দস্যুমুক্ত এবং চোরাচালান ও অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে কোস্টগার্ডের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বিষ দিয়ে মাছ শিকার ঠেকাতে বর্তমানে ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “এর মাধ্যমে সুন্দরবনে অবৈধভাবে প্রবেশ করা জেলেদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। জব্দ করা হচ্ছে বিষ এবং বিষ দিয়ে ধরা মাছ। বনের গহীন এলাকায় শুঁটকি তৈরির স্থান চিহ্নিত করে ধ্বংস করা হচ্ছে।”
সাম্প্রতিক সময়ে বন অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে দাবি করে প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, গত পাঁচ বছরে সার্বিকভাবে সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাঘ যেসব প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে সেগুলোর পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে।
“সুন্দরবন সুরক্ষায় বন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে।”
কোনো অনৈতিক কাজে বন বিভাগের কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেন এ বন কর্মকর্তা।