সুরাইয়াকে কোলে নিয়ে কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন মা মিনারা বেগম

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে মা মিনারা বেগমের কোলে থাকা সাত মাস বয়সী সুরাইয়া আক্তার আশার মাথার অর্ধেক উড়ে যায়; ঘটনাস্থলে সে প্রাণ হারায়।

মোঃ শাকিল আহমেদবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
Published : 29 July 2022, 02:18 PM
Updated : 29 July 2022, 02:18 PM

শেষ সময়ে ভোট দিয়ে সুরাইয়াকে কোলে নিয়ে ফলাফলের জন্য কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন মা মিনারা বেগম। হঠাৎ শুরু হয় সহিংসতা।

সহিংসতা থামাতে পুলিশ প্রথমে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এর মধ্যেই মা মিনারার কোলে থাকা সাত মাস বয়সী শিশু সুরাইয়া আক্তার আশার মাথার অর্ধেক উড়ে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। গুলিতে মেয়েটির মৃত্যু হয়েছে বলে মিনারা বেগমের ভাষ্য।

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় বাচোর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বুধবার এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার দুদিন পরেও এ ঘটনায় মামলা হয়নি।

নিহত সুরাইয়া বাচোর ইউনিয়নের মীরডাঙ্গী আশ্রয়ণ প্রকল্প গ্রামের মো. বাদশার মেয়ে। সন্তান হারানো পরিবারের আহাজারিতে এলাকায় নেমেছে শোকের ছায়া।

গত বুধবার রাণীশংকৈল উপজেলার হোসেনগাঁও, বাচোঁর ও নন্দুয়ার ইউনিয়ন পরিষদের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে বাচোর ইউনিয়নের ভাংবাড়ি ভিএফ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ ও গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করেন প্রিজাইডিং অফিসার মো. খতিবর রহমান।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ঘোষিত ফলে ইউপি সদস্য পদে বাবুল হোসেন ৪৯৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। অপর তিন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মধ্যে আজাদ আলী ৪৪২ ভোট, খালেদুর রহমান ২৪৫ ভোট ও কামালউদ্দিন ২১৩ ভোট করে পান। ফলাফল ঘোষণার পর কয়েকজন প্রার্থীর সমর্থকরা লাঠিসোঁটা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জিড়িয়ে পড়ে।

এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে ‘গুলিতে’ মা মিনারা বেগমের কোলে থাকা সাত মাস বয়সী সুরাইয়া আক্তার আশা ঘটনাস্থলে প্রাণ হরায়।

এ ঘটনায় এলাকাবাসী তাৎক্ষণিকভাবে সুরাইয়ার লাশ নিয়ে বিক্ষোভ করেন। ওই সময় তারা রাণীশংকৈল আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে এবং থানার সামনে এসে বিক্ষোভ করতে থাকেন। পরে পুলিশ এসে তাদের সরিয়ে দেয়।

বৃহস্পতিবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য সুরাইয়ার লাশ দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ। দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে প্রশাসন।

দুপুর আড়াইটার দিকে লাশ হস্তান্তরের পর রাণীশংকৈল উপজেলার মীরডাঙ্গী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে শিশুটির নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য ইয়াসিন আলী, রাণীশংকৈল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেল সুলতান জুলকার নাইন কবির, উপজেলা চেয়ারম্যান শাহরিয়ার আজম মুন্নাসহ স্থানীয় মুসল্লিরা।

নিহত সুরাইয়ার মা মিনারা বলেন, “শেষ বেলায় ভোট দিয়া ফলাফল শুনিবার তানে কেন্দ্রত ছিনো। সেলা হঠাৎ করে মারামরি শুরু হইল। আর সেলা পুলিশের গুলিত মোর বেটিডার মাথার খুলিডা অর্ধেকখান উড়ে গেইল। আর কোনদিন মোর বেটিডাক জড়ায় ঘুমাবা পারিমোনি।”

রাণীশংকৈলের ইউএনও সোহেল সুলতান জুলকার নাইন কবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা নিহতের পরিবারকে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছি। সেইসঙ্গে এ ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, নিহতের পরিবার সঠিক বিচার পাবে আমরা আশা করছি।”

ময়নাতদন্ত শেষে দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান হাবিবুর রহমান মুঠোফোনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শিশুটির মাথায় আঘাত ছিল। এটি লোহার রডের আঘাতেও হতে পারে, বুলেটের আঘাতও হতে পারে। খুলির একটি অংশ পাওয়া যায়নি।”

এ ঘটনায় ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) রামকৃষ্ণ বর্মণকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মো. মাহবুবুর রহমান।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

রাণীশংকৈল থানার ওসি জাহিদ ইকবাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাচোর ইউপি নির্বাচনে ভাংবাড়ি ভিএফ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ফলাফল ঘোষণার পর ভোট গ্রহণে দায়িত্বরত ব্যক্তি ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় এখনও কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। হামলার ঘটনাটি যেহেতু নির্বাচন সংক্রান্ত, তাই ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসারকেই মামলা করতে হবে।”

এখনও মামলা না হওয়া সম্পর্কে এর বেশি কিছু বলতে পারেননি ওসি জাহিদ।

ঠাকুরগাঁওয়ের এসপি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ফলাফল ঘোষণার পর পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকরা ভোট গ্রহণের দায়িত্বে থাকা লোকজনের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। আত্মরক্ষায় পুলিশ প্রথমে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। তাতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে পুলিশ গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়। পরে তারা জানতে পেরেছে, এক শিশু মারা গেছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা সারা দিনের প্রচেষ্টায় সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচন উপহার দিলাম। নির্বাচন শেষে এমন একটি ঘটনা সত্যিই কষ্টকর। এ ছাড়া পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলার প্রক্রিয়া চলছে।”

এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে

ভোটের দিন পুলিশের ওপর হামলা ও শিশু সুরাইয়া নিহত হওয়ার ঘটনার পর থেকে ভাংবাড়ি এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। হয়রানি থেকে বাঁচতে ইতোমধ্যে অনেকেই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেছে অন্য এলাকায়।

ভাংবাড়ি ভিএফ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মকবুল হোসেন বলেন, “ভোটের দিন যারা পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে, তারা সবাই বহিরাগত। এখন এলাকার লোকজন আতঙ্কের মধ্যে আছে।”

ফুটকিবাড়ী এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, “পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হবে, এমনটি শোনা যাচ্ছে। তবে এ মামলায় যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন। আমরাও চাই, প্রকৃত দোষীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাক।”

মামলা প্রসঙ্গে ভাংবাড়ি ভিএফ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা খতিবর রহমান বলেন, “এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে; খসড়াও করা হয়েছে। তবে মামলা এখনও থানায় জমা দেওয়া হয়নি।”

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মো. মাহবুবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিষয়টি দুঃখজনক। তদন্ত কমিটি হয়েছে; কমিটি এক সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেবে। তারপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত সুরাইয়া আক্তার আশা পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। পরিবারটিকে সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ডিসি মাহবুবুর রহমান।

আরও পড়ুন:

ইউপি নির্বাচন: ঠাকুরগাঁওয়ে ভোট কেন্দ্রে গুলিতে শিশু নিহত

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক