কুমিল্লায় ইভিএমের শঙ্কা কাটাচ্ছে সিসি ক্যামেরা

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নিয়ে সংশয়ের মধ্যেই কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।

স্পেশাল অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর, কুমিল্লা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 14 June 2022, 02:32 PM
Updated : 14 June 2022, 06:48 PM

তবে প্রতিটি কেন্দ্রের ভোটকক্ষে (বুথে) ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্তে মেয়র পদে প্রধান তিন প্রতিদ্বন্দ্বীর দুজন মো. মনিরুল হক সাক্কু ও নিজাম উদ্দিন কায়সার সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। আর ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত আশাবাদী, ভোট সুষ্ঠুই হবে।

বুধবার সকাল ৮টা থেকে শুরু হবে ভোটগ্রহণ। ১০৫টি কেন্দ্রের ৬৪০টি কক্ষে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ইভিএমে ভোট নেওয়া হবে।

মঙ্গলবার কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছানো হয় ইভিএম। সোমবার থেকেই শুরু হয়েছিল সিসি ক্যামেরা বসানোর কাজ।

মঙ্গলবার সকালের মধ্যে কেন্দ্রগুলোতে ৭৪৫টি ক্যামেরা বসানো হয়েছে বলে এশিয়াবিজ টেকনোলজির পক্ষ থেকে জানানো হয়। ইসির হয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সিসি ক্যামেরা বসাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

সদ্য সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু ইভিএম নিয়ে তার অস্বস্তির কথাই জানিয়েছেন।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে বসানো হয়েছে এমন সিসি ক্যামেরা। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গত নির্বাচনে দুপুর ১২টার পর বেশ কিছু কেন্দ্র আমার প্রতিপক্ষের লোকজন দখল করে নিয়ে জাল ভোট দিয়েছিল। এবার নির্বাচন কমিশন আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছে ভোট সুষ্ঠু হবে। তারা ইভিএমে ভোট নিবে, প্রতিটি কেন্দ্রে ও বুথে সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছে।

“তবে আমি চাইব, নির্বাচন কমিশনের লোকজন শুধু এগুলো লাগিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করবেন না। প্রতিটি সিসি ক্যামেরা মনিটরিং করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবেন তারা।”

সাক্কুর মতোই বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া নিজাম উদ্দিন কায়সার ভোটের দিন সিসি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণের সুযোগ চেয়ে পাননি।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উদ্যোগটা ভালো, তবে আমার কাছে বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। সিসি ক্যামেরা কী সুষ্ঠু ভোটের জন্য স্থাপন করা হয়েছে, নাকি ভোটারদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, সেটা এখনও ভাবাচ্ছে আমাকে।

“কমিশন যদি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ক্যামেরা স্থাপন করে, তাহলে আমরা ভোটের দিন সিসি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণের অনুমতি পাইনি কেন? এখন সবকিছু অনলাইনে সম্ভব। আমাদেরকে পাসওয়ার্ড দিলে আমরাও পর্যবেক্ষণ করতে পারতাম। আর ভোটের সময় ক্যামেরা চালিয়ে নির্বাচন কমিশনকে ঘুমালে চলবে না। প্রতিটি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ করে কোনো ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে হবে।”

কায়সারের সিসি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণের সুযোগ না পাওয়ার বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা মো.শাহেদুন্নবী চৌধুরীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে পরীক্ষামূলকভাবে কেন্দ্রে ও ভোটকক্ষে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। ঢাকায় ইসি সচিবালয় থেকে এবং কুমিল্লায় রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে সিসি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে জানান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ডিসি ও এসপিকে পর্যন্ত সিসি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরীক্ষামূলক হওয়ায় অন্য কারও কাছে পাসওয়ার্ড দেওয়া সম্ভব নয়। প্রার্থীদের দাবি থাকলেও এবার তা দেওয়া যায়নি। সিসি ক্যামেরা পরীক্ষামূলকভাবে সফল হলে আগামীতে পর্যবেক্ষণের পরিসর বাড়ানো যায় কি না, তা নিয়ে ভাববে ইসি।”

ইসি থেকে জানানো হয়েছে, কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সব ভোট কক্ষে থাকছে সিসি ক্যামেরা। এসব ক্যামেরায় ভোটের আগের দিন থেকে পরদিন মোট ৪৮ ঘণ্টা ধরে ধারণ করা ভোট দেওয়ার গোপন কক্ষ বাদে ভোটকেন্দ্রের ভিডিও থাকবে ইসির কাছে। কেউ অনিয়ম করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভোট কক্ষে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা নিয়ে এরই মধ্যে কুমিল্লা নগরী জুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। দুপুরে কুমিল্লা হাই স্কুল কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল স্থানীয় কয়েকজনকে, গোপন কক্ষে ক্যামেরা থাকবে কি না, তা দেখতে এসেছেন। ক্যামেরার আওতায় গোপনকক্ষ নেই দেখে আশ্বস্ত হন তারা।

ইভিএমে ভোট দেওয়া নিয়ে দ্বিধান্বিত এই নগরীর ভোটাররা। সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জুনায়েদ হোসেন সোহাগ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইভিএমে ভোট দেওয়ার পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা নেই আমার। সময়াভাবে সোমবার মক ভোটিংয়েও যেতে পারিনি। দেখাইয়া দিলে ভোট দিতে পারব আশা করি।”

জুনায়েদ শুনেছেন, ইভিএম মেশিন প্রায়ই ‘হ্যাঙ্গ’ হয়। নির্দিষ্ট সময়ে ভোটারদের সবাই ভোট দিতে পারে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মাহবুবুল হক ভূঁইয়া প্রার্থী ও ভোটারদের সংশয় থাকায় ইভিএম ব্যবহার না করা ভালো হত বলে মনে করেন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইভিএমের কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে নির্বাচনে এর ব্যবহার বাতিল করেছে উন্নত বিশ্বের বহু দেশ। আমাদের নির্বাচন কমিশনের এমনিতেই নানান সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এর মধ্যে এর ব্যবহার নির্বাচন নিয়ে সংশয় আরও বাড়াবে।”

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), কুমিল্লার সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নতুন নির্বাচন কমিশন তাদের প্রথম নির্বাচনটি ইভিএমে না করলেও পারতেন। প্রার্থীরা সংশয়ে আছেন, হ্যাঙ্গ হয়ে যাওয়ার নাম করে সময়ক্ষেপন করা হয় কি না। অনিচ্ছাকৃত কোনো ত্রুটি ঘটলেও পুরো নির্বাচনটি বিতর্কিত হয়ে যাবে।”

মেয়র পদপ্রার্থী কায়সার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শুনতে পাচ্ছি, সরকারদলীয় প্রার্থী ও তার মনোনয়নদাতা ভোট গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা ঘটানোর পরিকল্পনা করছেন। কেন্দ্রে কেন্দ্রে তারা সেই রকম কিছু ভোটারকে নিয়োজিত করেছে, যারা ভোটগ্রহণ বিলম্বিত করে দিতে চেষ্টা করবে।”

মনোনয়ন দাতা বলতে কায়সার কুমিল্লা-৬ (আদর্শ সদর, সিটি করপোরেশন, সেনানিবাস এলাকা) আসনের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারকে বুঝিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ উপেক্ষা করে বাহার নির্বাচনী এলাকায় থাকলেও তাকে বাড়ির বাইরে দেখা যায়নি, ফোনও ধরেননি।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত স্বতন্ত্র প্রার্থী কায়সারের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

তিনি উল্টো শঙ্কা প্রকাশ করেন, বিএনপির (দলটি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে প্রার্থী হওয়া সাক্কু ও কায়সার) দুই মেয়র প্রার্থীর রেষারেষি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

এদিকে প্রার্থী-ভোটারদের আশ্বস্ত করে ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কুমিল্লার ভোট নিরাপদ করতে ইসি তৎপর রয়েছে।

“ইভিএম নিয়ে সংশয়ের কোনো কারণ নেই। ভোটে শ্লথগতি বা ভোট দিতে কোনো ধরনের ত্রুটি যাতে না হয়, সে পদক্ষেপ নেওয়া আছে।”

ইভিএম নিয়ে কমিশনের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি বলে জানান ইসির এ কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, “ইভিএম কাস্টমাইজেশনের সময় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। মক ভোটিংও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

“ভোটারদের ভোট দিতে যাতে বিলম্ব না হয়, সেজন্য আঙুলের ছাপ না মিললে এনআইডি কার্ড নাম্বার দিয়েও ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক