Published : 05 Apr 2026, 07:59 PM
নারায়ণগঞ্জে অপহরণের পর নিখোঁজ থাকা এক তরুণের লাশের সন্ধান পাওয়া গেছে। পুলিশ বলছে, অপহরণের পর দিনই তার মরদেহ অজ্ঞাত হিসেবে উদ্ধার হয়। পরিচয় শনাক্ত করতে না পারায় পুলিশের তত্ত্বাবধানে তাকে দাফন করা হয়।
উদ্ধারের সময়কার মরদেহের ছবি দেখে রোববার সকালে পরিবারের লোকজন তাকে শনাক্ত করেন বলে জানিয়েছেন রূপগঞ্জ থানার ওসি এ এইচ এম সালাউদ্দিন।
পরিবারের দাবি, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাখাওয়াত ইসলাম রানা ও তার অনুসারীরা ওই তরুণকে অপহরণের পর হত্যা করেছে।
রানা ২০০৫ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাওয়া যুবদলের সেই সময়ের ‘ক্যাডার’ মমিনউল্লাহ ডেভিডের ভাগনে।
নিহত ২১ বছর বয়সী মাহফুজুর রহমান শুভ ফতুল্লার পূর্ব ইসদাইর রসুলবাগের ঝুট ব্যবসায়ী মো. সোহেলের ছেলে।
১ এপ্রিল ফতুল্লা মডেল থানায় শুভর অপহরণের অভিযোগে মামলা রেকর্ড করা হয়। ওই মামলায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সাখাওয়াত ইসলাম রানাকে প্রধান আসামি করে আরও ১০ জনকে আসামি করেন শুভর মা মাকসুদা বেগম।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় ইসদাইর রেললাইন এলাকা থেকে অপহরণের শিকার হয় তার বড় ছেলে শুভ।
মারধরের পর শুভকে একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে তোলা হয়। ওই ইজিবাইকের পেছনে পেছনে শুভর মোটরসাইকেলটিও চালিয়ে যান রানা। এরপর শুভ কিংবা তার মোটরসাইকেলটির সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনার ১৫ থেকে ২০ দিন আগে চাষাঢ়া রেললাইন এলাকায় সাখাওয়াত ইসলাম রানার সঙ্গে তর্ক হয় শুভর। এরপর থেকে রানা ও তার সহযোগীরা শুভকে হত্যার হুমকি দিচ্ছিল বলে এজাহারে বলেন তার মা।
এজাহারে বলা হয়, শুভ আগে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র মেরামতের কাজ করলেও পরে এলাকার কিছু বখাটে যুবকের সঙ্গে মাদক সেবনে আসক্ত হয়ে পড়েন। অপরাধ কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়েছিলেন।
এই মামলার পর পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও শুভর সন্ধান দিতে পারেনি।
এর মধ্যে তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ মার্চ উদ্ধার হওয়া রূপগঞ্জের অজ্ঞাত মরদেহের ছবি দেখালে রোববার পরিবারের লোকজন তা শুভর বলে শনাক্ত করে।
ফতুল্লা মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন বলেন, মামলাটি এখন অপহরণের পর হত্যা হিসেবে তদন্ত করা হবে।
রূপগঞ্জ থানার ওসি সালাউদ্দিন বলেন, “৩০ মার্চ সকালে রূপগঞ্জ থানার কাঞ্চন পৌরসভার কালনী এলাকা থেকে মরদেহটি অজ্ঞাত হিসেবে উদ্ধার করা হয়। তার মাথা, মুখমণ্ডল, হাত, পা ও বুকে আঘাতের চিহ্ন ছিল। নীলাফুলা জখম ছিল।”
শরীরের এসব জখম হত্যার আগে নির্যাতনের নির্দেশ করছে বলেও জানান তিনি।
মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করতে না পারায় অজ্ঞাত হিসেবে রাজউকের কবরস্থানে পুলিশের তত্ত্বাবধানে দাফন করা হয়।
তবে, মরদেহের ময়নাতদন্তের পর এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলাও দায়ের করে বলে জানান ওসি সালাউদ্দিন।
মামলার প্রধান আসামি স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সাখাওয়াত ইসলাম রানাসহ অন্যরা পলাতক রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের গ্রেপ্তারেও অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেন, “আমি যেকোনো হত্যার বিচার চাই। সাখাওয়াত ইসলাম রানার বিরুদ্ধে অভিযোগ যা উঠেছে তা তদন্ত সাপেক্ষ ব্যাপার। তদন্তে তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রশাসন আইনগতভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
“কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে যদি কেউ তাকে অযথা ফাঁসাতে চায় এমন প্রমাণিত হয়, সেক্ষেত্রে প্রশাসন যেন তাকে হয়রানি না করে।”
তিনি বলেন, “একইসঙ্গে যেহেতু তিনি বিএনপির একটি সহযোগী সংগঠনের নেতা, সেক্ষেত্রে দলের হাইকমাণ্ড বিষয়টি নিয়ে তদন্ত ও যাচাই-বাছাই করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে।”

পুলিশের অসহযোগিতার অভিযোগ পরিবারের
এদিকে, শুভর বাবা মো. সোহেলের অভিযোগ, অপহরণের রাতেই থানা পুলিশের শরণাপন্ন হয়েছিলেন তিনি। তবে, পুলিশের সহযোগিতা পাননি। মামলাও রেকর্ড করা হয়েছে তিন দিন পর।
সোহেল বলেন, “শুরু থেকেই সবার নাম বলছি, কারা তুইল্লা নিয়া গেছে তাদের নামও বলছি। কিন্তু পুলিশ পাত্তা দেয় নাই। আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরলেও ধরে নাই। শুরুতেই পুলিশ গুরুত্ব দিলে আমার ছেলেরে হয়ত জীবিত পাইতাম।”
তিনি ছেলে হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিও জানান।
তবে, তদন্তে কোনো প্রকার অবহেলা ছিল না বলে দাবি করেন ফতুল্লা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন।
তিনি বলেন, “আমি নিজে শুরু থেকে ঘটনাটির আপডেট ফলো রেখেছি। সারাদিন পুলিশ কাজ করেছে। বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়েছি। আমাদের প্রথম টার্গেট ছিল ভিক্টিমকে উদ্ধার করা আর কারা জড়িত তাদের শনাক্ত করা।”
“সবাই পুলিশের নেগেটিভটা দেখে, কিন্তু আমরা শুরু থেকেই কাজ করেছি।”