Published : 01 Jun 2026, 08:47 PM
আমৃত্যু আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে যাওয়া তোফায়েল আহমেদ দলীয় পরিচয়ের বাইরেও জাতীয় পর্যায়ে একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন; যার শুরুটা হয়েছিল একটি জাতির মুক্তির আন্দোলনের একজন তুখোড় ছাত্রনেতা হিসেবে, আর পরের অর্ধশতকে বহু রাজনৈতিক উত্থান পতনের ঘটনায় তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্রদের একজন।
ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের এই অগ্রসৈনিক মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের একজন। স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও তিনি ছিলেন প্রথম সারিতে।
প্রবীণ এই আওয়ামী লীগ নেতা সব মিলিয়ে এমপি হয়েছেন নয়বার, দুই দফা মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছেন, দলের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী ফোরামে দায়িত্ব পালন করেছেন ১৮ বছর।
তবে জীবনের শেষ বছরগুলোতে দলের রাজনীতিতে তার সেই প্রভাব আর থাকেনি। ২০০৭-০৮ সালে জরুরি অবস্থার সময় ‘সংস্কারপন্থি’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর তিনি দলে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন।
বার্ধকব্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগে সোমবার রাজধানী স্কয়ার হাসপাতালে মারা যান তোফায়েল আহমেদ; তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর জীবনের শেষ দিনগুলো তার কেটেছে একেবারেই নিভৃতে, রোগ-শোকের সঙ্গে লড়াই করে।

রাজনীতিতে পথচলা
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর দ্বীপ জেলা ভোলা সদরের দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে আজহার আলী ও ফাতেমা খানমের পরিবারে তোফায়েল আহমেদের জন্ম।
ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাসের পর ভর্তি হন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে। সেখান থেকে ১৯৬২ সালে আইএসসি এবং ১৯৬৪ সালে বিএসসি করেন।
সে বছরই তিনি ভোলা শহরের আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন। তাদের একমাত্র সন্তান তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী পেশায় চিকিৎসক।
তোফায়েল আহমেদের রাজনীতির প্রথম পাঠ ১৯৫৭ সালে। তখন তিনি ভোলা সরকারি হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। প্রাদেশিক পরিষদের একটি উপনির্বাচন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভোলা সরকারি কলেজ মাঠে জনসভায় বক্তৃতা করছিলেন।
সেখানে বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা কিশোর তোফায়েলের মনে গভীর রেখাপাত করে। সেদিনই সিদ্ধান্ত নেন, কোনোদিন রাজনীতি করলে ‘এই নেতার রাজনীতি করব।’ একসময় তিনি পরিণত হন বঙ্গবন্ধুর অন্যতম সহচরে।

ষাটের দশকের শুরুতে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক এবং কলেজের অশ্বিনী কুমার হোস্টেলের সহ-সভাপতি ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।
ব্রজমোহন কলেজে স্নাতক শেষে তোফায়েল ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে; মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি ১৯৬৪ সালে তৎকালীন ইকবাল হল (শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, পরের বছর মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহসভাপতি এবং ১৯৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।
১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালে চারটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা কর্মসূচি ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন।

অভ্যুত্থানের মুখে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন স্বৈরশাসক আইয়ুব খান। পরদিন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হিসেবে তোফায়েল ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেন শেখ মুজিবুর রহমানকে। গণঅভ্যুত্থানেই আইয়ুব খানের পতন ঘটে, অবসান হয় মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থার।
সেই সময়ের কথা স্মরণ করে ২০১৬ সালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন, “’৬৬ সালে ৬ দফা দিয়ে তিনি (বঙ্গবন্ধু) আমাদেরকে বলেছিলেন, ‘সাঁকো দিলাম। এই সাঁকো পেরিয়ে একদিন স্বাধীনতায় পৌঁছব’।
“সত্যিই ৬ দফা ছিল আমাদের মুক্তির সনদ। ৬ দফা কী—এটা আইয়ুব খান উপলব্ধি করেছিল বলেই তাকে আগরতলা মামলার আসামি করে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলাতে চেয়েছিল।”
সেই সব দিনে তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে লড়াই-সংগ্রামে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, “তোফায়েল আহমেদ ছাত্রলীগ করত, আর আমি ছিলাম বামপন্থি ছাত্র ইউনিয়ন নেতা। তার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সমান্তরাল একটা ভিন্ন মতাদর্শ এবং রাজনৈতিক দর্শনটাও ভিন্ন ছিল। কিন্তু তৎকালীন রাজনীতিতে ছাত্র ইউনিয়ন এবং ছাত্রলীগ সম্মিলিতভাবে আইয়ুব বিরোধী সংগ্রামে লিপ্ত ছিল।

“সেই সূত্রে পরিচয়টা গড়ে ওঠে। মফস্বল থেকে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তৎকালীন জহরুল হলের অর্থাৎ ইকবাল হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ছিলেন। তার সাথে আমার পরিচয় সম্ভবত ’৬৮ সালের ডাকসু নির্বাচনে— তিনি ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হওয়ার সময়। এরপর থেকে আমরা একেবারে অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে একেবারে ফরোয়ার্ডের খেলোয়াড় ছিলাম।”
এভাবেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল জানিয়ে সেলিম বলেন, “’৬৯ মুভমেন্ট যখন হল, তখন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের পর ঠিক হল যে আমাদের কোনো দল থেকে না আমরা ডাকসু যেহেতু নির্বাচিত সংস্থা, এখানকার ভিপি হিসেবে তোফায়েল আহমেদ আমাদের মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করবে।
“সুতরাং, সমস্ত পাবলিক মিটিংয়ে মুখপত্র হিসেবে সংগ্রাম পরিষদ পক্ষের কোনো বক্তব্য যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বক্তব্য ঠিক হলেও তার মুখ দিয়ে এটা প্রচারিত হয়েছে। এইভাবে তিনি জনগণের ভেতরে একটা জনপ্রিয় এবং ছাত্রদের প্রধান নেতা হিসেবে তার একটা ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে।”

ঊনসত্তরেই তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। আবাসিক হল ও ডাকসুর ভিপি থাকাকালে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্যে আসেন।
পরের বছরের ২ জুন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তোফায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি শুরু করেন। সে বছর ভোলার দৌলতখান-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধে ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক চার প্রধানের একজন ছিলেন তোফায়েল। তিনি ছিলেন বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা সমন্বয়ে গঠিত দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ডের দায়িত্বে।
মুক্তিযুদ্ধের অস্থির সময়ে তোফায়েল আহমেদ যে ভূমিকা রেখেছিলেন, তা তুলে ধরেতে গিয়ে সিপিবি নেতা সেলিম বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি, শেখ মনি ভাই, রাজ্জাক ভাই আর সিরাজুল আলম খান—এই চারজনের একটা আন্ডারগ্রাউন্ড গোপন কমিটি হয়। সেটাকে নিউক্লিয়াস বলা হত। আবার এই চারজনকে চার খলিফাও বলা হত। মুক্তিযুদ্ধে তিনি একটা অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
“মুক্তিযুদ্ধে উনি বিএলএফ-বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স, যেটা মুজিব বাহিনী নামে পরিচিত—এর পরিচালকমণ্ডলীর একজন ছিলেন। তিনি যে ট্রেনিং নিয়েছিলেন, সেটা লিডারস ট্রেনিং-যেটা সোভিয়েতের কায়দায়।
“স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু এসে তাকে তার রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব দেয়, ওই পিরিয়ডটা অনেক রাজনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে তিনি জড়ান। পরে এটা কন্টিনিউ করতে থাকে। ৭৫ এর পরেও জিয়া সরকারের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন, এরশাদ বিরোধী অভ্যুত্থান এই সময়ে আমরা একসঙ্গে সম্মিলিতভাবে যে লড়াই করেছি, সেটা আমাকে তার খুবই ঘনিষ্ঠ একজন হিসেবে পরিণত করে।”
স্বাধীন দেশে তোফায়েল
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম সংগঠক তোফায়েল দেশ স্বাধীনের পর সংবিধান প্রণয়নে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন।
এর মধ্যে ১৯৭৩ সালে তিনি ভোলা থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পঁচাত্তরের ২৫ জানুয়ারি দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ঘোষণার পর প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ‘রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী’ নিযুক্ত হন তোফায়েল।
সে বছরই বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল গঠিত হলে এর যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরপরই তোফায়েলকে গৃহবন্দি করা হয়। পরে পুলিশ কন্ট্রোল রুম এবং রেডিও অফিসে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়।
৬ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, রাখা হয় ময়মনসিংহ কারাগারের কনডেম সেলে। পরে কুষ্টিয়া কারাগারে তাকে স্থানান্তর করা হয়। তখন দীর্ঘ ৩৩ মাস তিনি কারাগারে ছিলেন।
কুষ্টিয়া কারাগারে থাকা অবস্থায় ১৯৭৮ সালে তোফায়েল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করে সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন তিনি। সে সময় তাকে একাধিকবার কারাগারেও যেতে হয়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তোফায়েল আহমেদ শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং ২০১৪ সাল থেকে থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
ব্যক্তি তোফায়েল আহমেদকে দেখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সিপিবি নেতা সেলিম বলেন, “তিনি অসাধারণ স্মৃতি শক্তি সম্পন্ন ছিলেন এবং শত শত হাজার হাজার টেলিফোন নম্বর মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। তার সঙ্গে আমার পারিবারিক সম্পর্ক ছিল খুব ভালো; তার একটা শখ ছিল, মানে ফ্যাশনেবল শার্ট-প্যান্ট তিনি খুব পছন্দ করতেন। বিশেষ করে টাই, ভালো টাই।”

হতাশা, কোণঠাসা
তোফায়েল আহমেদ নৌকা প্রতীক নিয়ে মোট ১২ বার নির্বাচন করেছেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে প্রথম ভোটে বিজয়ী এ রাজনীতিক ৮০ বছর বয়সেও জয়ের মুখে দেখেছেন। ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি নৌকা প্রতীকেই জয় পান।
১৯৭০ এ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ, ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে–সবমিলিয়ে তিনি নয়বার এমপি হয়েছেন।
রাজনীতির নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে তোফায়েল ১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন, যে পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ ১৮ বছর।
সংবিধান থেকে ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ অপসারণ, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এবং মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন তিনি। তোফায়েল ২০১০ সালে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হন, যে পদেই ছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

তবে দাপুটে এই রাজনীতিবিদ জীবনের এক পর্যায়ে এসে তার সেই প্রভাব হারিয়ে ফেলেন। শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়ে দলের ভেতরেই কোণঠাসা হয়ে পড়েন।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালে তার মেয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফিরিয়ে এনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বসানোর ক্ষেত্রে যাদের মূল ভূমিকা ছিল, তোফায়েল আহমেদ তাদের একজন। তবে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর তোফায়েল যথেষ্ট শক্ত অবস্থান নেননি– এমন একটি ধারণাও দলের শীর্ষ পর্যায়ে তৈরি হয়েছিল।
অনেকে মনে করেন, ওই কারণে শেখ হাসিনার সঙ্গে তোফায়েল আহমেদের সম্পর্কে এক ধরনের শীতলতা তৈরি হয়েছিল। আশির দশকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হলেও দলের সাধারণ সম্পাদক হতে না পারায় এক ধরনের হতাশাও তৈরি হয়েছিল তোফায়েলের মধ্যে।

এরপর ২০০৭-০৮ সময়ে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার আলোচনার মধ্যে আওয়ামী লীগে সংস্কারপন্থি হিসেবে চিহ্নিত হন আব্দুর রাজ্জাক, আমির হোসেন আমুর, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং তোফায়েল আহমেদসহ কয়েকজন প্রবীণ নেতা। তার খেসারত তাদের পরবর্তী বছরগুলোতে দিতে হয়েছে।
২০০৮ সালে নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েন সংস্কারপন্থি হিসেবে চিহ্নিত নেতারা। দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হয়েও সেবার মন্ত্রিসভায় ডাক পাননি তোফায়েল আহমেদ।

অবশ্য পরে ২০১৪ সালে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর শেখ হাসিনা তার নতুন সরকারে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছিলেন তোফায়েল আহমেদকে। তবে দলের ভেতরে পুরনো প্রভাব তিনি আর ফিরে পাননি।
শেষ দিকে এসে বয়স আর অসুস্থতার কারণে শারীরিকভাবেও কাবু হয়ে পড়েছিলেন এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ। স্ট্রোক করায় শরীরের একটি অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল তার। কার্যত হুইলচেয়ারে বন্দি হয়ে পড়েছিল তার জীবন।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের বিচারে তোফায়েল আহমেদ রাজনৈতিক জীবনের একটি পর্যায়ে হতাশ হয়ে পড়লেও রাজনীতির পথ থেকে বিচ্যুত হননি।
“শেষ পর্যন্ত তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে ছিলেন।”