Published : 09 Feb 2026, 12:36 PM
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে মানিকগঞ্জের সিংগাইরের মাঠজুড়ে হাসছে গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা ও রজনীগন্ধা।
বসন্তবরণ, ভালোবাসা দিবস ও ২১ ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে সিংগাইরে ফুলের বাগানগুলোতে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
মাঠজুড়ে ফুটেছে নানা জাতের ফুল আর বাড়তি চাহিদায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা; উৎসব ঘিরে কয়েক কোটি টাকার বেচাকেনার প্রত্যাশা তাদের।

সিংগাইরের তালেবপুর ইউনিয়নের ইরতা ও নতুন ইরতা, ধল্যা ইউনিয়নের ফোর্ডনগর, জয়মন্টপ ইউনিয়নের ভাকুম, শায়েস্তা ইউনিয়নের নীলটেক এবং জার্মিত্তা ইউনিয়নের পানিশাইল এলাকাগুলো এখন ফুলপল্লী হিসেবে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত।
এসব এলাকার ফুলচাষিরা বলছেন, বছরের অন্য সময়ের তুলনায় বসন্তবরণ, ভালোবাসা দিবস ও ২১ ফেব্রুয়ারিকেই ফুলের ‘মূল মৌসুম’ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সময়কে সামনে রেখে জমি প্রস্তুত, সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ এবং ফুলগাছের পরিচর্যায় বাড়তি শ্রম ও সময় দিতে হয়।
ধল্লা ইউনিয়নের ফোর্ডনগর এলাকার পাইকারি ফুল ব্যবসায়ী মো. সোহেল রানা বলছিলেন, বসন্ত আর ভালোবাসা দিবসকে সামনে রেখে ঢাকার বিভিন্ন বাজার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে আগাম অর্ডার আসছে তার কাছে। এই সময়টা ফুলের চাহিদা বেশিই থাকে।

সিংগাইর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সিংগাইরে ৩২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের আবাদ হয়েছে। এসব জমিতে গোলাপ, জারবেরা, চন্দ্রমল্লিকা, গ্লাডিওলাস, জিপসি, স্টার ফুল, রজনীগন্ধা ও গাঁদা উৎপাদিত হচ্ছে।
উৎপাদিত ফুলের বড় অংশ ঢাকাসহ গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয় বলে শহরের শহীদ রফিক সড়কের ফুল বিক্রেতা আজহার আলী জানান।
সিংগাইরে ফুলচাষ আগের তুলনায় ‘বেড়েছে’ বলে সিংগাইর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল বাশার চৌধুরী জানান।

এদিকে উৎসব যত ঘনিয়ে আসছে, ফুলের দামও তত বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বসন্তবরণ ও ভালোবাসা দিবসের দিনগুলোতে ফুলের দাম বেড়ে যায়।
জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন ফুলের দোকান ও পাইকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিটি দেশি গোলাপ ৩০ থেকে ৪০ টাকা, জারবেরা ৪০ থেকে ৫০ টাকা, গ্লাডিওলাস ২০ থেকে ৩০ টাকা এবং রজনীগন্ধা ১০ থেকে ১৫ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিস ও বাজার সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এই তিন দিবসকে ঘিরে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ৯০ লাখ টাকা করে তিন দিনে কোটি টাকার ফুল বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লাভের হিসাব নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন অনেক চাষি। তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সার ও কীটনাশকের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সংকট ও মজুরি বৃদ্ধি। ফলে ফুল বিক্রি থেকে যে আয় আসে, তার বড় অংশই চলে যাচ্ছে খরচ মেটাতে।
এক দশক ধরে ফুল চাষ করে আসা ধল্লা ইউনিয়নের ফোর্ডনগর এলাকার ফুলচাষি আব্দুল মজিদ মিয়া বলেন, এ মৌসুমে ১৫ বিঘা জমিতে চায়না গোলাপসহ বিভিন্ন জাতের ফুল চাষ করেছেন। অন্যান্য সময়ে মাসে গড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রি করে খরচ বাদে ৮০-৯০ হাজার টাকা লাভ থাকে।

তবে এ বছর গোলাপে ছত্রাকের আক্রমণ এবং কীটনাশকের দাম বৃদ্ধির কারণে ভালো দাম না পেলে তিনি ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে জানান।
একই এলাকার ফুলচাষি মো. সিরাজ মিয়া বলছেন, “এ বছর ফুলের রঙ ও আকার ভালো হয়েছে। তবে সার, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ কম হবে।”
পাইকারি ফুল ব্যবসায়ী মো. সোহেল রানা বলেন, পরিবহন ও শ্রম খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসার চাপও বাড়ছে তার। সঠিক সময়ে ফুল বাজারে পৌঁছাতে পারলে লাভের সুযোগ থাকলেও ঝুঁকিও কম নয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিংগাইর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল বাশার চৌধুরী বলেন, “আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সঠিক মাত্রায় সার ও কীটনাশক প্রয়োগ এবং শ্রম সাশ্রয়ী পদ্ধতি গ্রহণ করলে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে লাভবান হবেন কৃষক।”