Published : 29 Dec 2025, 09:52 PM
ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায় রেললাইন উপরে ফেলার প্রায় ১৪ ঘণ্টা পর ঢাকা-ময়মনসিংহ পথে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। তবে ত্রিশালের আউলিয়া নগর থেকে গফরগাঁওয়ের মশাখালী পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথে ২০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলবে।
সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয় বলে জানান ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন সুপারিন্টেন্ডেন্ট আব্দুল্লাহ আল হারুন।
এদিন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে গফরগাঁও স্টেশনের আউটার সিগনালের কাছে রেলের পাত খুলে ফেললে ‘অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ইঞ্জিনসহ দুটি বগি লাইনচ্যুতের ঘটনা ঘটে।
এদিকে ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে বঞ্চিত প্রার্থীর সমর্থকেরা তৃতীয় দিনের মত আন্দোলনে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সেইসঙ্গে রেলওয়ে স্টেশন ভাঙচুর করেছে একদল লোক। এ ঘটনায় দুইজন আহত হয়েছেন।
আতঙ্কে গফরগাঁও পৌর শহরে তিন দিন ধরে সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। ট্রেন যোগাযোগ বন্ধের সঙ্গে দিনভর বাস চালাচলও সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। এতে কার্যত পুরো শহর অচল হয়ে পড়ে।
ময়মনসিংহ রেলওয়ে থানার ওসি আক্তার হোসেন বলেন, উপজেলার সালটিয়া মাঠখোলা এলাকায় ২০ ফুটের মত রেললাইন উপরে ফেলে হয়। এ সময় যাত্রীরা আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করে ট্রেন থেকে নেমে পড়েন। এ ঘটনার পর ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
খবর পেয়ে ঢাকা থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন এসে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে উদ্ধার কাজ শেষ করে। পরে রাত সাড়ে ৭টার দিকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয় বলে জানান তিনি।

ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার পর জামালপুর থেকে ঢাকাগামী ‘যমুনা এক্সপ্রেস’ ট্রেন সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে ময়মনসিংহ স্টেশনে এসে অস্থায়ীভাবে থেমে যায়। পরে বিকল্প পথে গৌরীপুর, কিশোরগঞ্জ ও ভৈরব হয়ে ঢাকা যাত্রা করে ট্রেনটি।
ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন সুপার আবদুল্লাহ আল হারুন বলেন, বিকল্প হিসেবে ভৈরব হয়ে ঢাকাগামী যমুনা এক্সপ্রেস ছেড়ে গেছে। এ ছাড়া ঢাকা থেকে জামালপুর এক্সপ্রেস ও মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেন ভৈরব হয়ে ময়মনসিংহে আসে।
চার ট্রেনের যাত্রা বাতিল
ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ বন্ধ থাকায় ঢাকা-তারাকান্দি পথে আন্তঃনগর অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস, তারাকান্দি-ঢাকা পথে আন্তঃনগর অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস, দেওয়ানগঞ্জ বাজার-ঢাকা পথে আন্তঃনগর ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ও নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ-ঢাকা পথে আন্তঃনগর হাওর এক্সপ্রেসের যাত্রা বাতিল করা হয়।
পরে বাতিল হওয়া ট্রেনের যাত্রীদের টিকিটের মূল্য ফেরত পেতে অনলাইনে রিফান্ড গ্রহণের জন্য অনুরোধ করে রেলওয়ে বিভাগ।
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) ময়মনসিংহের ইনচার্জ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে অনিবার্য কারণে ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়।
দুর্ঘটনার সময় আন্তঃনগর অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেনের গতিসীমা ২০ কিলোমিটারে ছিল; তাই বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন চালক আব্দুল হালিম।
তিনি বলেন, “আউটার সিগনালে ঝুঁকি থাকায় ট্রেনটি সেখানেই থামানোর কথা ছিল। তবে থামানোর ১০০ গজ আগেই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ট্রেনটি। বিকট শব্দে পড়ে যায় ট্রেনের ইঞ্জিনসহ দুটি বগি। পরে নেমে দেখি ২০ মিটার রেললাইনের পাত অন্যত্র সরিয়ে রাখা হয়েছে।”

ট্রেনটির সহকারী চালক হাসিম উদ্দিন বলেন, কুয়াশার কারণে ট্রেনের গতি ছিল ৫০ কিলোমিটার। স্টেশনের আগে আউটার সিগনাল ঝুঁকি থাকায় সেখানে ট্রেনটি থামানোর কথা ছিল। যার কারণে গতিসীমা ২০ কিলোমিটারে নিয়ে আসা হয়। গতি কম থাকা তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
কারণ অনুসন্ধানে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন
রেললাইন উপরে ফেলার ঘটনায় পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করার কথা জানিয়েছেন ঢাকা বিভাগীয় প্রকৌশলী সিরাজ উদৌল্লা।
তিনি বলেন, আগামী তিন কার্য দিবসের মাঝে তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে প্রাপ্ত দোষীদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।
ট্রেন দুর্ঘটনায় যা বলছে স্থানীয়রা
স্থানীয় আশরাফুল ইসলাম বলেন, “দুর্ঘটনার সময় বিকট শব্দ হয়। তখন বাসা থেকে বের হয়ে দেখি যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে নামছেন। এমন কাজ করা মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়। আরো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। যারা রেললাইন উপরে ফেলেছে তারা দেশের শত্রু। তাদেরকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।”

রফিকুল ইসলাম নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, “বিএনপির মনোনয়নকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা চলছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগের ‘দোসরা’ এমন কাজ করে থাকতে পারেন। বিএনপির পক্ষে এ কাজ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”
যা বলছে প্রশাসন
গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এন এম আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন হওয়ায় উপজেলা পরিষদসহ আশপাশে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
পৌর শহরের বিভিন্ন স্থানে সড়কে ছোটোখাটো প্রতিবন্ধকতা করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ হয়ে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “উপজেলা শহরে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে কোনো ঝামেলা যেন না হয়, সে দিকে তৎপর রয়েছে প্রশাসন। তবে, গফরগাঁওয়ের পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”
এর আগে শনিবার দুপুরে ময়মনসিংহ-১০ আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পান আক্তারুজ্জামান বাচ্চু। এরপর বিষয়টি জানাজানি হলে মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের কর্মীরা আন্দোলন শুরু করেন। এরপর থেকে রেললাইন অবরোধ ও অগ্নিসংযোগ করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন বঞ্চিতদের সমর্থকরা।