Published : 13 Jul 2026, 01:17 PM
অভিমান করে ২৫ বছর আগে বাড়ি ছেড়েছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন পর বাকপ্রতিবন্ধী ভাই-বোনেরা অবশেষে খুঁজে পেয়েছেন তাদের মেজ বোনের সন্ধান।
কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে; অসীম শূন্যে ঠাঁই হয়েছে বাক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধা ববি বেগম ওরফে ওয়াহিদা বেগমের।
গত ৪ জুলাই গভীর রাতে নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশনের একটি পরিত্যক্ত ঘরে ৭০ বছর বয়সি ববি বেগমের ওপর হামলা চালানো হয়।
গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকলেও ৮ জুলাই নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার ভৈরব রেলওয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।
এদিকে এ বাকপ্রতিবন্ধী বৃদ্ধার পরিবারের সদস্যরা অবশেষে বগুড়া থেকে এসে তার কবর জিয়ারত করেছেন। রোববার বিকালে মেথিকান্দা স্টেশনসংলগ্ন নুরপুর কবরস্থানে ববির কবর জিয়ারতের সময় স্বজনদের কান্নায় সেখানে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
ববি ওরফে ওয়াহিদা বেগমের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তার তিন ভাইবোনসহ পরিবারের মোট ১৩ সদস্য রোববার ভোরে বগুড়া থেকে মাইক্রোবাসে রওনা দিয়ে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে মেথিকান্দা স্টেশনে পৌঁছান। পরে তারা ববির কবর জিয়ারত করেন।
এ সময় তার তিন বাকপ্রতিবন্ধী ভাইবোন আনিসুর রহমান প্রামাণিক, আনসার আলী প্রামাণিক ও ফাতেমা বেগম উপস্থিত ছিলেন। অসুস্থতার কারণে এক ভাই ও দুই বোন আসতে পারেননি বলে জানা গেছে।
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঘোন সাগাটিয়া গ্রামের রহিম উদ্দিন প্রামাণিক ও আনিসা বিবি দম্পতির বড় মেয়ে ববি বেগম অভিমান করে করে বাড়ি ছেড়েছিলেন প্রায় ২৫ বছর আগে।

মৃত্যুর আগে ববি বেগমের সঙ্গে কেন যোগাযোগ করেননি সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে ওয়াহিদার ছোট বোনের জামাতা সৈকত ইসলাম বলেন, “২৫ বছর আগের পরিস্থিতিটা বুঝতে হবে। তখন তিনি (বুবি) এক ভাই ছাড়া বাকি ছয় ভাইবোনই বাকপ্রতিবন্ধী ছিলেন। ওই ভাই বগুড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলায় দীর্ঘদিন খোঁজাখুঁজি করেছেন।
“তিন বছর চেষ্টা করেও কোনো সন্ধান না পেয়ে তারা হাল ছেড়ে দেন। পরে তিনিও মারা গেলে খোঁজ চালিয়ে যাওয়ার মতো আর কেউ ছিলেন না। আমাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন মিলিয়ে প্রায় ২০ জন বাকপ্রতিবন্ধী।”
পরিবারের সদস্যরা জানান, বুবি বেগমের বাবা রহিম উদ্দিন প্রামাণিক ও মা আনিসা বিবি-দুজনই বাকপ্রতিবন্ধী ছিলেন। তাদের আট সন্তানের মধ্যে সাতজনই বাকপ্রতিবন্ধী হয়ে জন্মগ্রহণ করেন।
বুবিসহ তিন ভাইবোন মারা গেছেন। জীবিত পাঁচ ভাইবোনের সবাই বাকপ্রতিবন্ধী। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় ওয়াহিদার স্বামী মারা যান। তাদের একমাত্র কন্যাসন্তানটিও জন্মের পরপরই মারা যায়। এরপর বাবার বাড়িতেই থাকতেন তিনি।
প্রায় ২৫ বছর আগে ছোট এক বোনের সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে যান ওয়াহিদা। এর আগে রাগ করে তিনি মাঝেমধ্যে অন্য বোনের বাড়িতে গিয়ে আবার ফিরে আসতেন। তবে সেদিনের পর আর তিনি বাড়ি ফেরেননি। দীর্ঘ তিন বছর বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পর পরিবারের সদস্যরাও তার সন্ধান পাওয়ার আশা ছেড়ে দেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি দেখে তারা নিশ্চিত হন, মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশনের নিহত বৃদ্ধাই তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বজন ওয়াহিদা বেগম ওরফে বুবি।
রেলওয়ে পুলিশ ও স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানায়, দুই যুগ আগে একদিন একটি ট্রেন থেকে নেমে মেথিকান্দা স্টেশনে আশ্রয় নেন বাকপ্রতিবন্ধী ববি বেগম। এরপর আর কোথাও যাননি তিনি। স্টেশনের পরিত্যক্ত একটি কক্ষই হয়ে ওঠে তার স্থায়ী ঠিকানা।
প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দেওয়া, শৌচাগার পরিষ্কারসহ বিভিন্ন পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন তিনি। স্টেশন ও আশপাশের মানুষ, এমনকি নিয়মিত যাত্রীরাও তাকে চিনতেন। কেউ খাবার দিতেন, কেউবা টাকা দিয়ে সহায়তা করতেন। সেই অর্থের বেশিরভাগই তিনি খরচ না করে বছরের পর বছর জমিয়ে রেখেছিলেন।
ঘটনার রাতে কয়েকজন তার কক্ষে ঢুকে জমানো টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে চোখ-মুখে কিল-ঘুষি ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধর করা হয়। পরে হামলাকারীরা তার জমানো টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়।
পরদিন ৫ জুলাই বুধবার সকাল ৯টায় ময়নাতদন্তের জন্য বুবির লাশ নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে রাতে তার লাশ স্টেশন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। রাত ১০টায় স্টেশনের প্রবেশ মুখে খোলাচত্বরে ববি বেগমের জানাজা শেষে স্টেশনসংলগ্ন একটি সামাজিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
হামলা ও লুটের ঘটনায় ৬ জুলাই ভৈরব রেলওয়ে থানায় মামলা করেন স্টেশনের মাস্টার। পরে তার মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে সাকিব মিয়া (২৩), ইলিয়াছ মিয়া (৩৫), বিল্লাল মিয়া (২৫), দ্বীন ইসলাম (২৬) ও রিফাত মিয়া (২০) নামে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
রোববার দুপুরে নরসিংদীর অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বেলাল হোসেন তাদের প্রত্যেকের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বলে মামার তদন্তকারী কর্মকর্তা নরসিংদী রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির এসআই দীলিপ চন্দ্র সরকার জানিয়েছেন।
বুবির ছোট বোনের জামাতা সৈকত বলেন, “অনেকেই বলছেন, আমরা নাকি মৃত্যুর আগে না এসে এখন এসেছি তার টাকা পয়সার জন্য। স্পষ্ট করে বলতে চাই, যদি তার টাকা-পয়সা কিছু থাকে, সেগুলো যেন স্থানীয় মসজিদ-মাদ্রাসা বা এতিমখানায় বিলিয়ে দেওয়া হয়।
“ওই টাকা আমাদের দরকার নাই। ২৫ বছর পর তার কবরটা আমরা দেখতে পেরেছি, এটাই শান্তির।”
তিনি বলেন, “মেথিকান্দা স্টেশন ও আশপাশের মানুষের কাছে আমরা খুবই ঋণী, তারা বুবি বেগমকে আগলে রেখেছিলেন।”
আর পড়ুন-
'টাকা দিতে অস্বীকৃতি', মারধরের পর ২০ বছর রেলস্টেশনে কাটানো পরিচ্ছ
পরিচ্ছন্নতা কর্মী ববি বেগমের মৃত্যু: 'জমানো টাকা লুটের জন্য' নির্