এসএসসির প্রশ্ন ফাঁস: ইউএনওকে শোকজ, তদন্ত শেষ করেছে বোর্ড

সাময়িক বরখাস্তের পর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 23 Sept 2022, 10:24 AM
Updated : 23 Sept 2022, 10:24 AM

চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা দুদিন সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত কাজ শেষ করে ফিরে গেছেন। এ ঘটনার পর সাময়িক বরখাস্ত হওয়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান শারীরিক জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম শুক্রবার দুপুরে বলেন, “বিধি মোতাবেক ইউএনও দীপক কুমার দেব পরীক্ষার ব্যাপারে সব ধরনের চিঠি ইস্যু করেছেন। তারপরেও কোনো গাফিলতি আছে কি-না বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

“ইউএনওকে শোকজ করা হয়েছে। তাকে জবাব দিতে বলা হয়েছে। শোকজের জবাব পেলে পরবর্তীতে করণীয় ঠিক করা হবে।”

প্রশ্নপত্র ফাঁসের দিন অর্থাৎ গত বুধবারই ইউএনওকে শোকজ করা হয়েছে। তিন কার্যদিবসের মধ্যে তাকে জবাব দিতে বলা হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

এ ব্যাপারে জানতে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপক কুমার দেব শর্মাকে একাধিবার মোবাইলে ফোন করলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় চলতি এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি প্রথম এবং দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীদের নজরে এলে নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন। 

মঙ্গলবার দুপুরে ভূরুঙ্গামারী নেহাল উদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে প্রশাসনের কর্মকর্তারা এসএসসির চারটি বিষয়ের প্রশ্নপত্র উদ্ধার করেন। বুধবার দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের গণিত, কৃষিশিক্ষা, পদার্থবিজ্ঞান ও রয়ায়ন পরীক্ষা স্থগিত করার ঘোষণা আসে। পরে বৃহস্পতিবার পরীক্ষার নতুন সময়সূচি ঘোষণা করে শিক্ষা বোর্ড।

এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাতে গ্রেপ্তার করা হয় প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্র সচিব লুৎফর রহমান, ইংরেজির শিক্ষক আমিনুর রহমান রাসেল এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক জুবায়ের হোসাইনকে। আর বৃহস্পতিবার বাংলার শিক্ষক সোহেল আল মামুন, পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হামিদুল ইসলাম এবং অফিস সহায়ক সুজন মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। 

এ ঘটনায় ট্যাগ অফিসার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আদম মালিক চৌধুরী চারজন শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করে একটি মামলাও করেন ভূরঙ্গামারী থানায়।

উপজেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান, ইউএনও দীপক কুমার দেব শর্মা ১১ সেপ্টেম্বর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমানকে একটি চিঠি দেন। এর স্মারক নম্বর ০৫.৪৭. ৪৯০৬. ০০০.১৩.০২৩.২২.৮৫৯।

চিঠিতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও অন্যান্য গোপনীয় কাগজপত্রাদি যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়। এতে বলা হয়, ভূরুঙ্গামারী থানায় প্রশ্নপত্র ও অন্যান্য গোপনীয় কাগজপত্রাদি সংরক্ষিত রয়েছে। উক্ত সিলগালাকৃত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও অন্যান্য গোপনীয় কাগজপত্রাদি বিবরণী মোতাবেক সঠিক আছে কি-না তা যাচাই-বাছাই করে ১৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের করার জন্য অনুরোধ করা হয়।

এই চিঠির অনুলিপি ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি ও উপজেলার ছয়টি পরীক্ষা কেন্দ্রের সচিবকেও দেওয়া হয়। চিঠিতে আরও উল্লেখ ছিল, পরীক্ষার সময়সূচি অবশ্যই খামের উপরে লিখতে হবে।

এ ছাড়া একই তারিখে ইউএনওর স্বাক্ষরিত ০৫.৪৭. ৪৯০৬. ০০০.১৩.০২৩.২২ নম্বর স্মারকে প্রত্যেক কেন্দ্রের ট্যাগ অফিসারদের নাম উল্লেখ করা হয়। যে কেন্দ্র থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, সেই ভূরুঙ্গামারী নেহাল উদ্দিন পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ট্যাগ অফিসার হিসেবে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আদম মালিক চৌধুরীর নাম উল্লেখ রয়েছে।

এই চিঠিতে ইউএনও উল্লেখ করেন, ট্যাগ অফিসাররা ‘পরীক্ষার দিনগুলোতে থানা হতে নির্ধারিত প্রশ্নপত্র উত্তোলন নিশ্চিত এবং পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে সার্বক্ষণিক কেন্দ্রে উপস্থিত থেকে পরীক্ষা গ্রহণ’ করবেন।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শামছুল আলম প্রশ্নপত্র সর্টিংয়ের দায়িত্বের ব্যাপারে বলেন, “এক বা দুদিনে একজন মানুষের পক্ষে কয়েক হাজার প্রশ্নের প্যাকেট যাচাই-বাছাই করা অসম্ভব। এ জন্য ভূরুঙ্গমারীর ছয়টি পরীক্ষা কেন্দ্রের জন্য কমপক্ষে ছয় জনকে কয়েকদিন সময় দিয়ে প্রশ্ন সর্টিং করার দায়িত্ব দিলে নির্ভুলভাবে সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পারতেন।

“প্রশ্নপত্র ফাঁসের এ দায় সংশ্লিষ্ট কেউ এড়াতে পারেন না।”

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের তিন সদস্যের দল ভূরুঙ্গামারীতে তাদের কাজ শেষ করে ফিরে গেছেন। বৃহস্পতি ও শুক্রবার তারা সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ ও জবানবন্দি গ্রহণ করেছেন।

এ সময় শামছুল আলম আরও জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত হওয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান বৃহস্পতিবার অসুস্থ হয়ে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। অবস্থার অবনতি হলে শুক্রবার তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তিনি উচ্চ রক্তচাপসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন।

এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আলমগীর হোসেন শুক্রবার বলেন, “আমার কাছে এ ব্যাপারে কোনো চিঠি আসেনি। প্রশ্নপত্রের ক্ষেত্রে আমরা শুধু নিরাপত্তা দিয়ে থাকি। বাকি কাজ সভাপতি এবং তার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সর্টিং, সিলগালা করে রাখা না রাখা তাদের দায়িত্ব।”

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান বলেন, “আমাকে দায়িত্বে অবহেলার কারণে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। আমি বর্তমানে হসপিটালাইজড আছি। এর বেশি কিছু বলতে পারবো না।”

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়। ইংরেজি প্রথম এবং মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষার পর প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে আলোচনা হয়। অভিযোগ আসে, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকেও। স্থানীয় সাংবাদিকরাও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হন। পরে উপজেলা প্রশাসনও এ নিয়ে নজরদারি শুরু করে।   

পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন একপর্যায়ে নিশ্চিত হয়, অনুষ্ঠিত কোনো বিষয়ের প্রশ্নপত্রের প্যাকেটের মধ্যে করেই সামনের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সরানো হয়েছে। তারপরই ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপক কুমার দেব শর্মা, সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মোর্শেদুল হাসান, ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে একটি দল নেহাল উদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানের কক্ষে তল্লাশি চালায়।

সেখান থেকে তখন চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার গণিত, কৃষি বিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান ও রসায়নের প্রশ্নপত্র উদ্ধার করা হয়; যে বিষয়গুলোর পরীক্ষা এখনও হয়নি।

বিকালে পুলিশ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান ও প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। পরে রাতে প্রধান শিক্ষককে আটক করা হলেও মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম, পুলিশ সুপার আল আসাদ মো. মাহফুজুল ইসলাম, দিনাজপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কামরুল ইসলাম ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপক কুমার দেব শর্মা বৈঠকে বসেন। ইউএনওর কার্যালয়ে প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন তারা।

পরে তারা উপজেলা পরিষদে কেন্দ্র সচিব লুৎফর রহমান, সহকারী শিক্ষক আমিনুর রহমান রাসেল এবং শিক্ষক জুবায়ের হোসাইনের সঙ্গেও কথা বলেন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, সচিব অধ্যাপক জহির উদ্দিন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শামছুল আলমসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপজেলা পরিষদ ত্যাগ করেন।

উপজেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, প্রশ্ন বাছাইয়ের (সর্টিং) সময়ে কোনো একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের প্যাকেটের মধ্যে অন্য পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্রও ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। কেন্দ্রের দায়িত্বরত ট্যাগ অফিসার বোর্ডের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী পাঠানো প্রশ্নেপত্রের খাম গণনা করে থাকেন। প্যাকেট সিলগালা করে তার ওপর স্বাক্ষর করেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান। থানা থেকে কেন্দ্রে প্রশ্নপত্রের প্যাকেট আনার পর কৌশলে অন্য প্রশ্নগুলো সরিয়ে ফেলা হয়।

হতে পারে, এখানে কোথাও হয়তো দায়িত্বে অবহেলা হয়েছে। কিন্তু সেটি তদন্ত না করে বলা যাচ্ছে না বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

তবে স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক ও শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, অনেক অভিভাবককে ইংরেজি প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নের জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা গেছে।

আরও পড়ুন:

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক