১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

নুসরাত হত্যা: হাই কোর্টের রায়ে সন্তুষ্ট মা চান পরিবারের নিরাপত্তা

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ জনের মধ্যে দুজনের সাজা বহাল রেখেছে হাই কোর্ট; এ ছাড়া চারজনকে যাবজ্জীবন এবং বাকি ১০ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

ফেনী প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 24 Aug 2026, 04:49 PM

Updated : 16 Sep 2026, 05:11 PM

ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় হাই কোর্টে আপিলের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে তার পরিবার।  

সোমবার রায় ঘোষণার পর এক প্রতিক্রিয়ায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বলেন, “আদালতের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। হাই কোর্ট যে রায় দিয়েছে, আমরা তাতে সন্তুষ্ট। আদালত হত্যার কথা বলেছে, তাকে হত্যা করা হইছে, তাতেই আমরা সন্তুষ্ট। 

“আমার পরিবারকে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। এখন শুধু আমাদের নিরাপত্তার প্রয়োজন।”

২০১৯ সালে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার পরীক্ষা কেন্দ্র সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নুসরাতকে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনা তখন সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে।

ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাই কোর্ট বেঞ্চ আলোচিত এই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ জনের মধ্যে দুজনের সাজা বহাল রেখেছে। এ ছাড়া চারজনকে যাবজ্জীবন এবং বাকি ১০ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। 

মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা দুই আসামি হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীম।

যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- নূর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ও জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন।

খালাস প্রাপ্তরা হলেন—সোনাগাজীর সাবেক পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মাদ্রাসার গভর্নিং বডির তৎকালীন সহ-সভাপতি রুহুল আমীন ও মহিউদ্দিন শাকিল।

রায় ঘোষণার পর সোনাগাজীর গ্রামের বাড়িতেই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মা শিরিন আক্তার ও মামলার বাদী নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। 

এ সময় মামলার বাদী নোমান বলেন, “পরিবারের সবাই শুরু থেকেই ন্যায়বিচার চেয়েছিলাম। নিম্ন আদালতের রায়ের পর আসামিদের স্বজনরা আমাদেরকে নানাভাবে হুমকি দিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনও তা অব্যাহত রেখেছে। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের পরিবারের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দাবি করছি।” 

সংবাদ সম্মেলনে বিলাপ করতে করতে শিরিন আক্তার বলছিলেন, “আজকে কোর্টে প্রমাণ করে দিছে আমার মেয়েরে হত্যা করা হইছে। আমার কোনো নিরাপত্তা নাই। আমার ছেলেদেরকে কিভাবে হুমকি-ধামকি দিতেছে। বাড়িঘর আগুন জ্বালাই দিব। আমরা নাকি নাটক সাজায় মামলা কইচ্ছি। মামলা কইচ্ছি, কোনো অপরাধ হইছেনি। ও সিরাজ্জারে, হেতের লাগি আমার মেয়ে হারাইছি। রাফি মারে ছাড়া সাতটা বছর কেমনে রইছেরে...।”

রায় ঘোষণার পর, নুসরাতের এলাকা সোনাগাজীর সাধারণ মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। 

জহিরুল হক নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “দীর্ঘ সময় বিচারের বাণী নীরবে কেঁদেছিল। আজ আপিল বিভাগের রায় যথাযথ হয়েছে। দোষীরা শাস্তি পেয়েছে আর নির্দোষরা খালাস পেয়েছে।”

রোববার থেকে সহকারী পুলিশ সুপার (দাগনভূঞা-সোনাগাজী সার্কেল) এর নির্দেশে নুসরাত জাহান রাফির সোনাগাজী গ্রামের বাড়িতে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। 

সোনাগাজী মডেল থানার ওসি আবুল হাশিম বলেন, “রায়কে ঘিরে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নুসরাতের সোনাগাজীর বাড়িতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। উচ্চ আদালতে মামলার রায় শোনার পর এখনও আইন-শৃঙ্খলার কোনো ধরনের অবনতির ঘটেনি। আমরা এই এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রেখেছি।”

ওসি বলেন, মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নুসরাত হত্যার পর থেকে তাদের বাড়িতে দুইজন পুলিশ সর্বদা নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত ছিল। রোববার থেকে সেখানে আরও সাতজন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। 

২০১৯ সালে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন নুসরাত। এর আগে ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। ওই ঘটনায় নুসরাতের মা মামলা করার পর সে বছরের ২৭ মার্চ পুলিশ গ্রেপ্তার করে অধ্যক্ষ সিরাজকে।

সিরাজ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার পক্ষে নামে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তার মুক্তি দাবিতে মানববন্ধনেও সক্রিয় ছিল মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থী। মামলা তুলে নিতে ক্রমাগত হুমকিও দেওয়া হচ্ছিল বলে নুসরাতের পরিবারের অভিযোগ।

এর মধ্যেই ৬ এপ্রিল পরীক্ষা শুরুর আগে পরীক্ষা কেন্দ্র সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নুসরাতকে কৌশলে ডেকে নিয়ে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

অগ্নিদগ্ধ নুসরাতকে ঢাকায় এনে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছিল; টানা পাঁচ দিন যন্ত্রণা সহ্য করে ১০ এপ্রিল মারা যান তিনি।

নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার দুদিন পর তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। নুসরাতের মৃত্যুর পর এটি হত্যা মামলায় পরিণত নেয়।

নুসরাতকে যখন ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়েছিল, তখনও তিনি বলছিলেন, তিনি প্রতিবাদ করে যাবেন। প্রতিবাদী এই তরুণীর জন্য প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। বিচারের দাবিতে কর্মসূচি পালিত হয় গোটা দেশজুড়ে।

প্রথমে সোনাগাজী থানার পরিদর্শক কামাল হোসেন মামলাটি তদন্ত করলেও পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ ওঠায় পরে তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ওই বছরের ২৯ মে পিবিআইয়ের পরিদর্শক শাহ আলম ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেন।

আরও পড়ুন:

যেভাবে নুসরাত হত্যা

ফেনীতে নুসরাত হত্যা: হাই কোর্টে ২ জনের ফাঁসি বহাল, ৪ জনের যাবজ্জীবন

নুসরাত হত্যায় ১৬ আসামির সবার মৃত্যুদণ্ড

নুসরাতের ভিডিও: ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে মামলা

সোনাগাজীর ওসি বদলি, মামলার দায়িত্বে পিবিআই

নুসরাতের খাতার পাতায় অধ্যক্ষের যৌন নিপীড়নের বর্ণনা

নুসরাতকে বাঁচানো গেল না

অধ্যক্ষের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ‘বৈঠক করে’ নুসরাতের গায়ে আগুন