২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

শুকনো মৌসুমেও পদ্মার চরে রাসেলস ভাইপারের উপদ্রব

“সা‌পের কতা আর কি ক‌বো। ধা‌নের গা‌ছের সঙ্গে জড়া থা‌হে, বাদাম গা‌ছের সা‌থে প‌্যাচা থা‌হে।”

শামিম রেজা, ‍রাজবাড়ী প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 21 Jan 2026, 12:04 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:36 PM

রাজবাড়ীর পদ্মা তীরবর্তী এলাকায় রাসেলস ভাইপারসহ বিষধর সাপের কামড়ে প্রায়ই নানা বয়সী মানুষ আহত হচ্ছেন।

ধান কাটতে গিয়ে রাসেলস ভাইপারের কামড়ে বাড়ছে কৃষক আহতের সংখ্যা। এতে চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। শুষ্ক মৌসুমে সাপের উপদ্রপ কম হলেও বর্ষায় বেড়ে যায়।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, গত দুই বছরে জেলায় রাসেলস ভাইপারসহ বিভিন্ন সাপের কামড়ে আহত হয়েছেন ৩৭০ জন।

সাপের কামড়ে আহত রোগীকে ওঝার কাছে না নিয়ে সরাসরি নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন এস এম মাসুদ।

পাংশা উপজেলার শাহমীরপুর গ্রামের পদ্মার চরে ধান কাটতে গিয়ে কৃষক মো. হেলাল বিশ্বাসের পায়ে কামড় দেয় রাসেলস ভাইপার। সাপটি ধরে তিনি পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।

ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং সাপের ভয়ে কৃষকরা তাদের কৃষি কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন।

সারেজমিনে শাহমীরপুর গ্রামের পদ্মার চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে বর্তমানে আখ মাড়াইয়ের কাজ চলছে। তবে সাপের আতঙ্কে কৃষকরা চরম উদ্বেগের মধ্যে কাজ করছেন। আখের ক্ষেতে কিংবা পালা দেওয়া খড়ের মধ্যে কাজ শুরুর আগে তারা বাঁশ বা লাঠি দিয়ে নেড়ে যাচাই করছেন, কোথাও সাপ লুকিয়ে আছে কি-না। এরপরও আতঙ্ক নিয়েই প্রতিদিন মাঠে নামতে হচ্ছে তাদের।

কৃষক হেলাল বিশ্বা‌সকে সাপে কাটার ঘটনার বর্ণনায় তার স্ত্রী বি‌থি খাতুন ব‌লেন, “দ‌্যাড় মাস আগে আমার স্বামী পদ্মার চ‌রে ধা‌নের ক্ষেতে কাজ করবার যায়। তহুন তার পায় এ‌্যটা সাপ কামুড় দ‌্যায়। সে সাপটা ধ‌রে হস‌পাতালে নি‌য়ে যায়। এহুনো তার চি‌কিৎসা করা‌নো লাগ‌তে‌ছে।”

তিনি বলেন, “স্বামীর চিকিৎসায় এই দেড় দ‌্যাড় মা‌সে ম‌্যালা টাকা খরচ হয়‌ছে। এক এক বার পরীক্ষা করা‌তি দশ থে‌কে বা‌রে হাজার ক‌রে টাকা লাগে। পার তে মাতা পর্যন্ত পরীক্ষা করা‌নো লা‌গে।

“সরকা‌রি হাসপাতা‌লে ব‌্যবস্থা নাই ক্লি‌নি‌কি পরীক্ষার জ‌ন্নি টাকা বে‌শি লা‌গে। এহু‌নো ম‌্যালা পরীক্ষা করা‌নে লাগ‌বি। টাকার জ‌ন্নি পরীক্ষা পিছা গে‌ছে। এজ‌ন্নি আমরা ম‌্যালা সমস‌্যায় আ‌ছি।”

শাহমীরপুর গ্রামের পদ্মা পা‌ড়ে আখের ক্ষে‌‌তে কাজ কর‌ছিলেন বা‌রেক বিশ্বাস। সাপের প্রসঙ্গ উঠলে তি‌নি ব‌লেন, “হাবাসপুর, শাহমীরপুর এই জাগাডা সাপের আমদা‌নি বে‌শি। এতা যে কন‌তে ক‌্যাম্মা আই‌লো তা বুজলাম না। সাপ কতক জ‌নের কামড়ায়‌ছে, কতক জ‌নের দাবড়ায়‌ছে, কতক জন সাপ মা‌রেছে।”  

এ কৃষক ব‌লেন, “মা‌টে কাজ করবার গে‌লি ভয় ক‌রে। মাস খা‌নিক আ‌গে ভূই‌ত (জমি) লাঙ্গল দি‌বো। তো ভূইততে হু‌ড়োজাবা (খড়কুটো) গুছায়া একজাগা পাজা ক‌রে থুলাম। প‌রে সেই হু‌ড়োজাবা সরা‌বেড় গে‌লি দেহা যা‌চ্চে, হুড়োজাবার ভেতর সাপ ব‌সে আ‌ছে। স‌গো‌লেই অতঙ্ক হ‌য়ে ‌গে‌ছে।”

একটু দূ‌রেই আখ মাড়াই কর‌তে করতে হা‌মিদ আলী ব‌লছিলেন, “আমা‌দের এই দি‌কে সা‌পের উৎপাত বে‌শি। ‌অনেকে‌ই ব‌লে পদ্মার চ‌রেই রা‌সেলস ভাইপার সাপ আছে। কিন্তু আমার এই আখের ক্ষে‌ত থে‌কেই কিছু দিন আগে দুইটা রা‌সেলস ভাইপার সাপ মার‌ছি। এখা‌নে আস‌লে সবাই আত‌ঙ্কিত।”

তিনি ব‌লেন, “হাসপাতা‌লে ভ‌্যাক‌সিন পাওয়া যায় না। আমা‌দের নদী এলাকা অনেকেই ক্ষে‌‌তে কাজ করার সময় কাম‌ড়ে আক্রান্ত হয়ে ফ‌রিদপু‌রে যে‌তে হয়, অ‌ন‌কেই দেহা যায় প‌থেই মারা যায়।”

আনিস প্রামাণিক ব‌লেন, “সা‌পের কতা আর কি ক‌বো। সা‌পের জ‌ন্নি এই এলাকায় স‌গো‌লেই ভ‌য়ে থা‌কে। ধা‌নের গা‌ছের সঙ্গে জড়া থা‌হে, বাদাম গা‌ছের সা‌থে প‌্যাচা থা‌হে। আখ ক্ষে‌‌তে কু‌শো‌রের জ‌রের ম‌দ্দি দেহা যায়; তহন যা ভয় লা‌গে।”

“সাম‌নে নদী‌তে যহন পা‌নি বাড়‌বি তহন সাপ কিল‌বিল কিল‌বিল কর‌বি চার‌দিক। এই সাপ তাড়া‌নে জ‌ন্নি সরকা‌রের ব‌্যবস্থা নিবার কন।”

না‌জিম মণ্ডল ব‌লেন, “কয়‌দিন আগেও চ‌রে ধান কাট‌তে‌ছি তহন দে‌খি বিশাল এটা সাপ প‌্যাচায়া আছে। সেই সাপ লা‌ঠি দি‌য়ে বা‌ড়ে (পি‌টি‌য়ে) মারলা। প‌রে আগুন ধরায়া পুড়ালাম। সাপ আছে ম‌্যালা ‌এদিক।”

সিভিল সার্জন এস এম মাসুদ ব‌লেন, “গত দুই বছরে রাসেলস ভাইপারসহ বিভিন্ন সাপের কামড়ে আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ৩৭০ জন চিকিৎসা নিয়েছে। এরম‌ধ্যে পাংশা উপ‌জেলা‌তে ১৯৩ জন সা‌পের কাম‌ড়ে আক্রান্ত হ‌য়ে‌ছে।

“সাপের কামড়ে আহত রোগীকে ওঝার কাছে না নিয়ে সরাসরি কাছের কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসতে হবে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন আছে।”

আগামী বর্ষা মৌসু‌মের জন‌্য স্বাস্থ‌্য বিভাগ পর্যাপ্ত প্রস্তু‌তি নি‌য়ে রে‌খে‌ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “বর্তমা‌নে সা‌পের কাম‌ড়ে আক্রান্ত রোগী‌দের জন‌্য জেলার পাঁচটি সরকা‌রি হাসপাতা‌লে প্রায় দুইশটি অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন মজুদ আছে।”