Published : 21 Jun 2026, 12:11 AM
আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবসের আগের দিন সকালে কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কয়েক শিশু ঘুড়ি উড়াচ্ছিল। পাতলা পলিথিনে তৈরি ছোট ঘুড়িগুলো আকাশে উড়লেও তার সুতো শক্ত করে বাধা ছিল শিশুর হাতে থাকা নাটাইয়ে ।
সেদিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে ক্যাম্পের রোহিঙ্গা যুবনেতা মুজিবুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখো রোহিঙ্গার জীবনও যেন এ ঘুড়ির মতো। স্বপ্ন আছে, স্মৃতি আছে, ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে।
“কিন্তু সেই স্বপ্নের সুতো আটকে আছে যুদ্ধ, রাজনীতি, কূটনীতি, পরিচয়ের সংকট এবং আন্তর্জাতিক উদাসীনতার জটিল গিঁটে।”
৯ বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য ছেড়ে মুজিব যখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন, তখন তার বয়স ১৫ বছর।
কৈশোর পেরোনোর সেই সময়টিতে তার জীবন ছিল একেবারেই অন্যরকম। নিজের বাড়ি, নিজের গ্রাম, পরিচিত পরিবেশ আর স্বাধীন চলাফেরার সুযোগ ছিল জীবনের স্বাভাবিক অংশ।
কিন্তু সেগুলো আজ শুধুই স্মৃতি। এখন তিনি কক্সবাজারের একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে উদ্বাস্তু হিসেবে জীবন কাটান। তার মতো আরও লাখো শিশু-যুবক সীমাবদ্ধতা, অনিশ্চয়তা আর সংকীর্ণ পরিবেশের মধ্যে প্রতিটি দিন পার করছে।
এই শরণার্থী শিবিরের আরেক বাসিন্দা আবদুস সালাম বলেন, “আমার ছেলে যখন বাংলাদেশে আসে, তখন তার বয়স পাঁচ বছর। এখন সে প্রায় চৌদ্দ। সে তার গ্রামের নাম জানে, কিন্তু সে গ্রামের কোনো স্মৃতি তার নেই।”
কথার মাঝেই তিনি থেমে যান। চোখ চলে যায় দূরের পাহাড়ের দিকে। যেদিকে মিয়ানমারে তাদের জন্ম, যেখানে তার শিকড়, জমি-ঘর, স্মৃতি।
২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর অভিযানের পর কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গার সঙ্গে তিনিও বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন।
এর আগেও কয়েক দফায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। ফলে প্রায় নয় বছর পর বাংলাদেশে কক্সবাজারের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে ১৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা।
২০ জুন বিশ্ব যখন আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস পালন করছে, তখন এসব রোহিঙ্গার কাছে দিনটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি হারিয়ে যাওয়া ঠিকানা, আত্মপরিচয় ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের স্মরণ দিবস। তাদের সংকট বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটে পরিণত হয়েছে।

‘আমাদেরও দেশ ছিল’
রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথা বলেছেন ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের’ সদস্য ডা. জুবায়ের।
কণ্ঠে বেদনা, ক্ষোভ ও প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তিনি বলেন, “২০ জুন পৃথিবীর সব শরণার্থীর জন্য একটি বিশেষ দিন। এই দিনে তারা স্মরণ করে, কেন তারা শরণার্থী হয়েছে, কীভাবে তাদের দেশ হারিয়েছে, কারা তাদের দেশছাড়া করেছে।
“আমাদেরও দেশ ছিল, আমরাও এই দিনে ফেলে আসা সেই দেশ, বাড়ি, জমি, কবরস্থান, আত্মীয়-স্বজন, মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তানদের স্মরণ করি। অনেকের পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। অনেকেই আর বেঁচে নেই।”
ডা. জুবায়েরের মতে, বিশ্ব শরণার্থী দিবসের মূল বার্তা হওয়া উচিত নতুন করে যেন আর কোনো জনগোষ্ঠী শরণার্থী না হয়।
“আমরা বিশ্বকে বলতে চাই, আমরা কখনো শরণার্থী হতে চাইনি। পৃথিবীর কোনো মানুষই শরণার্থী হতে চায় না।”

পরিচয়ের সংকট, হারিয়ে যাওয়া একটি প্রজন্ম
রোহিঙ্গা সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পরিচয়ের প্রশ্ন, এ কথা বারবার তুলে ধরেন জুবায়ের।
“আমরা বলি, আমরা রোহিঙ্গা। কিন্তু রাখাইনের মগরা বলে আমরা বাঙালি। মিয়ানমার রাষ্ট্র আমাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। আমাদের পরিচয় অস্বীকার করে।”
তার ভাষায়, “যে জনগোষ্ঠীর পরিচয় স্বীকৃত নয়, তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন কীভাবে সম্ভব?”
তিনি অভিযোগ করেন, ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে, আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাখাইনে নতুন শক্তি হিসেবে উঠে আসা আরাকান আর্মির সময়ও রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা পায়নি।
“আজও মগ আর মিলিটারি নিজেদের মতো খেলা খেলছে। আমরা মাঝখানে পিষ্ট হচ্ছি।”
নয় বছরের শরণার্থী জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে ডা. জুবায়ের বলেন, “ক্যাম্প একটা কারাগার।”
তিনি বলেন, “কারাগারের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে খারাপ। এখানে মানুষের স্বাধীনতা সীমিত। কাজের সুযোগ সীমিত। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে।”
তার ভাষায়, “আমরা বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু আমরা বাংলাদেশের জন্য বোঝা হয়ে থাকতে চাই না।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্ব যদি রাখাইনে আমাদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল তৈরি করে, সেটা শরণার্থী শিবির হলেও আমরা যেতে প্রস্তুত। অন্তত সেটা আমাদের ভূমি হবে।”
এদিকে ক্যাম্পে এখন এমন একটি প্রজন্ম বড় হচ্ছে, যারা কখনও মিয়ানমার দেখেনি।
২০১৭ সালে যে শিশুর বয়স ছিল ১০, সে এখন তরুণ। যার বয়স ছিল ১৫, সে এখন কর্মক্ষম যুবক। কিন্তু তাদের সামনে নেই কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

সংখ্যা বাড়ছে, সংকটও বড় হচ্ছে
বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান বলেছেন, বাস্তবতা হচ্ছে সংকটটি দিন দিন আরও বড় হচ্ছে।
“২০১৭ সালে সবচেয়ে বড় ‘ইনফ্লাক্সের’ সময় প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ এসেছিল। এখন নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের উপরে। গত দুই-আড়াই বছরে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।”
তিনি বলেন, “প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ হাজার শিশু ক্যাম্পে জন্ম নিচ্ছে। অর্থাৎ জনসংখ্যা স্থির নেই, ক্রমাগত বাড়ছে।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন মনে করেন, রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি।
“২০১৭ সালে আমরা ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার কথা বলেছিলাম। এরপর গত ৯ বছরে প্রতিবছর গড়ে ৩০ হাজার করে বেড়েছে। জন্মহার থেকে মৃত্যুহার বাদ দিলেও দুই থেকে আড়াই লাখ নতুন মানুষ যুক্ত হয়েছে। তার সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে দেড় থেকে দুই লাখ নতুন অনুপ্রবেশকারী যোগ করলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৫ লাখের বেশি।”
তার মতে, “বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা আবাসভূমি।”
রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “বাংলাদেশ তাদের নাগরিকত্ব দেবে না। মিয়ানমারও গ্রহণ করছে না। তারা এক ধরনের রাষ্ট্রহীন ভবিষ্যতের মধ্যে বড় হচ্ছে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “দীর্ঘমেয়াদি হতাশা সামাজিক অস্থিরতা, অপরাধ, মানবপাচার ও অনিয়মের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।”

কমছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ-সহায়তা
একসময় রোহিঙ্গা সংকট ছিল বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে। কিন্তু এখন ইউক্রেইন যুদ্ধ, গাজা যুদ্ধ, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনাসহ নানা সংকট আন্তর্জাতিক মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে।
রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “রোহিঙ্গা সংকট ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার তালিকা থেকে নিচে নেমে যাচ্ছে।”
কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের আরও সক্রিয় হওয়ার প্রয়োজনীয় তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যথেষ্টভাবে বোঝাতে পারিনি যে এটি শুধু বাংলাদেশের নয়; এটি আন্তর্জাতিক দায়িত্বের বিষয়।”
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগের পাশাপাশি কমছে রোহিঙ্গাদের জন্য আসা সহায়তার পরিমাণও।
মিজানুর রহমানের ভাষায়, “সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি এখন অর্থসংকট।”
তিনি বলেন, “প্রতিবছর জনসংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু অর্থায়ন কমছে। ফলে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আশ্রয়- সবখানে চাপ বাড়ছে।”
তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীনসহ সহায়তাকারী দেশগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
“তাদের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হতো না।”
ফেরেনি একজনও, প্রত্যাবাসনের রোডম্যাপও নেই
রোহিঙ্গা সংকটের শুরুতে প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদ ছিল। ২০১৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়। ২০১৮ সালের শুরুতে হয় বাস্তবায়ন চুক্তি।
অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। নভেম্বরে চুক্তি, ডিসেম্বরে টাস্কফোর্স, জানুয়ারিতে ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট এগ্রিমেন্ট। তখন মনে হয়েছিল দুই বছরের মধ্যেই প্রত্যাবাসন শুরু হবে।”

কিন্তু তা হয়নি। ২০১৮ সালে প্রথম এবং ২০১৯ সালে দ্বিতীয় দফা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।
“কারণ মিয়ানমার নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, জমি-সম্পত্তি বা ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা দিতে পারেনি,” বলেন রাহমান নাসির।
“বাংলাদেশও জোর করে কাউকে ফেরত পাঠাতে পারেনি। রোহিঙ্গারা যেতে রাজি না হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির কারণে তাদের জোর করে পাঠাতে পারে না।”
আরআরআরসি মিজানুর রহমান বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য কখনোই রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে রাখা নয়। আমরা চাই তাদের ন্যূনতম সেবা নিশ্চিত করতে এবং সসম্মানে নিজ দেশে ফিরিয়ে দিতে।”
তিনি বলেন, “নয় বছর প্রায় শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত একজন ব্যক্তিকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।”
এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি রাখাইনের যুদ্ধ পরিস্থিতির কথা সামনে আনেন।
“প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ পরিবেশ প্রয়োজন। সেই পরিবেশ এখনও নেই।”
তার হিসাবে, বাংলাদেশ ২০১৭-১৮ সালেই প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছিল।
“তারা প্রায় আড়াই লাখ মানুষের তথ্য যাচাইও করেছে। কিন্তু যাচাই করা আর প্রত্যাবাসন শুরু করা এক বিষয় নয়।”
রাহমান নাসির উদ্দিন প্রত্যাবাসন পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেন ‘স্ট্যান্ডস্টিল’ হিসেবে।
“এটা সামনে যাচ্ছে না, পিছিয়েও যাচ্ছে না। এক ধরনের স্থবিরতা।”
তিনি বলেন, “কোভিড মহামারির পর পুরো প্রক্রিয়া আরও ধীর হয়ে যায়। এরপর মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান, গৃহযুদ্ধ, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন— সব মিলিয়ে প্রত্যাবাসন কার্যত থেমে গেছে।”
তার মতে, “বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসনের বাস্তব রোডম্যাপ দৃশ্যমান নয়।”
নতুন বাস্তবতা
রাখাইনের রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন আগের চেয়ে অনেক জটিল।
রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “২০১৭ সালে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ মূলত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে ছিল। এখন বাস্তবতা বদলে গেছে।”
তার মতে, “আজ যদি মিয়ানমার সরকারও প্রত্যাবাসনে সম্মত হয়, প্রশ্ন হচ্ছে, সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা কি তাদের আছে?”
কারণ হিসেবে রাখাইনের বড় অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার কথা বলেন তিনি।
“বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রাখে। কিন্তু আরাকান আর্মি কোনো রাষ্ট্র নয়। ফলে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় যেতে পারে না।”
বিকল্প কী?
প্রত্যাবাসনই একমাত্র স্থায়ী সমাধান— এ বিষয়ে প্রায় সবাই একমত। কিন্তু প্রত্যাবাসন না হলে কী হবে? এই প্রশ্ন তুলছেন রাহমান নাসির উদ্দিন।
“বাংলাদেশের একমাত্র নীতি হচ্ছে প্রত্যাবাসন। কিন্তু যদি আগামী পাঁচ বা দশ বছরেও তা সম্ভব না হয়, তাহলে বিকল্প পরিকল্পনা কী?”
তিনি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন, সীমিত কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে নতুন ধরনের চুক্তির কথা বলেন।
“অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের কিছু দেশ মানবিক পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে পারে। একই সঙ্গে ক্যাম্পের মানুষদের কিছু উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করার বিষয়ও ভাবতে হবে।”
তার মতে, “১৫ লাখ মানুষকে বছরের পর বছর শুধু ত্রাণনির্ভর করে রাখা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।”

বাড়ি আর কত দূর?
৯ বছর আগে যারা প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়েছিল, তাদের অনেক শিশুই আজ তরুণ। কেউ কখনও রাখাইন দেখেনি, কেউ শুধু বাবা-মায়ের মুখে নিজের গ্রামের গল্প শুনেছে।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রোহিঙ্গা যুবনেতা মুজিবুর রহমান বলেন, নিজের দেশে তিনি মোটরসাইকেল চালিয়ে চলাফেরা করতেন ওই বয়সেই, প্রয়োজনমতো যাতায়াত করতেন, নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন। কারণ সেটি ছিল তার নিজের দেশ, নিজের ভূমি।
তার ভাষায়, “ওইটা আমাদের দেশ, আমাদের ধর্মভূমি, আমাদের মাদারল্যান্ড।”
রাখাইনের শৈশব আর ক্যাম্পের বর্তমান জীবনের মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা করতে গিয়ে মুজিবের কণ্ঠে ফুটে ওঠে গভীর বেদনা।
তিনি বলেন, ‘আসমান আর জমিন’ পার্থক্য।
তার মতে, রাখাইনে তিনি সুখী ছিলেন, শান্তিতে ছিলেন। চারপাশের প্রকৃতি, খোলা পরিবেশ, নির্মল বাতাস— সবকিছুই ছিল অনেক ভালো। যদিও মাঝে মধ্যে সামরিক বাহিনীর অভিযান তাদের আতঙ্কিত করত, তবুও বছরের অধিকাংশ সময় তাঁরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারতেন।
কিন্তু ক্যাম্পের জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশেষ করে শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি।
তিনি বলেন, রাখাইনে শিশুদের জন্য ছিল বিস্তীর্ণ খেলার মাঠ, খোলা জায়গা আর স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ। গ্রামের প্রতিটি পরিবারেরই ছিল পর্যাপ্ত জায়গা। শিশুরা মাঠে খেলত, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে বড় হতো।
অন্যদিকে ক্যাম্পের বাস্তবতা অত্যন্ত সংকীর্ণ। এখানে খেলার মাঠ নেই, খোলা জায়গা নেই। একটি ঘরের সঙ্গে আরেকটি ঘর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। একটু বসার জায়গাও যেন নেই। শিশুদের স্বাভাবিক শৈশব এখানে হারিয়ে গেছে।
মুজিবের কথায়, “একটা বাসার সামনে একটু দাঁড়ালেও সমস্যা হয়। জায়গা এতটাই কম।”
শুধু শৈশব নয়, ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়েই তিনি শঙ্কিত।
যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়, ক্যাম্পে থাকা শিশু ও তরুণদের ভবিষ্যৎ তিনি কীভাবে দেখেন, তখন বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে তিনি উত্তর দেন, “ক্যাম্পে থাকলে, রিফিউজি জীবন কাটাইলে কোনো ভবিষ্যৎ নাই। ভবিষ্যৎ জিরো, জিরো।”
তার এই সংক্ষিপ্ত উত্তরেই যেন ধরা পড়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দীর্ঘ অনিশ্চয়তার গল্প।
তবুও সব আশা শেষ হয়ে যায়নি। জীবনের সমস্ত কষ্ট, সীমাবদ্ধতা আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও একটি স্বপ্ন আঁকড়ে বেঁচে আছেন মুজিব। সেই স্বপ্নের নাম, বাড়ি ফিরে যাওয়া।
“এখন আমাদের জাস্ট একটা উদ্দেশ্য,” বলেন তিনি। কী সেই উদ্দেশ্য?
মুজিবের উত্তর, “আমরা মাতৃভূমিতে ফিরতে চাই।”
এটাই তার স্বপ্ন, এটাই তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। মাতৃভূমিতে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের আশাতেই দিন গুনছেন তিনি এবং তার মতো লাখো রোহিঙ্গা।
ক্যাম্পের সংকীর্ণ গলি, টিন-তাঁবু ঘেরা জীবন আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার মাঝেও তাদের হৃদয়ে এখনো জ্বলছে একটি ক্ষীণ আলো- একদিন তারা ফিরে যাবেন নিজের দেশে, নিজের মাটিতে, নিজের পরিচয়ে।
আরো পড়ুন-
তহবিল ঘাটতি রোহিঙ্গা সংকটকে আরো ঘনীভূত করতে পারে: ইউএনএইচসিআর
'অন্যদের এগিয়ে এসে সাকিবের অভাব পূরণ করতে হবে'
নিজ দেশে ‘ঈদের আশ্বাস’ পাওয়া রোহিঙ্গাদের এবারও ফেরা হল না
রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিশ্ব সম্মেলনে নেই রোহিঙ্গারা, ‘নায়কহীন নাটক’ বলছেন তারা
‘নিরাপদ প্রত্যাবাসনের’ আকুতি রোহিঙ্গাদের, ‘বাস্তবতা ভিন্ন’
রোহিঙ্গা ঢলের ৮ বছর: আটকে প্রত্যাবাসন, জাতিসংঘ সম্মেলনের দিকে তাকিয়ে সরকার
স্কুল বন্ধ, রোহিঙ্গা শিশুদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বাল্যবিয়ে আর শ্রমে
১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ‘প্রত্যাবাসনের যোগ্য’ বলছে মিয়ানমার