Published : 10 Feb 2026, 11:45 PM
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্যাম্পের মানবেতর জীবনের অবসান হবে, তারা মাতৃভূমি মিয়ানমারে গিয়ে ঈদ উদযাপন করবেন- এমন স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। সেই আশার বার্তা দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বের সময় শেষ হতে যাচ্ছে, কিন্তু কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে নিজ দেশে ফেরার অপেক্ষা শেষ হয়নি রোহিঙ্গাদের।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পাওয়া মুহাম্মদ ইউনূস গত বছর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে নিয়ে আশ্রয় শিবিরে গিয়েছিলেন রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতার করতে।
আশ্বাস দিয়ে সেখানে মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন- “সামনের ঈদ রোহিঙ্গারা নিজ ভূমি মিয়ানমারে গিয়ে করবেন।”
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার গ্রহণযোগ্যতা, নোবেলজয়ী পরিচিতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা- সব মিলিয়ে তার এমন অঙ্গীকারে উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরে তৈরি হয়েছিল নতুন প্রত্যাশা।
এরপর সময় গড়িয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। যার মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। সামনে ঈদও এসে গেছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা রয়ে গেছেন ঠিক সেখানেই- কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা শরণার্থী শিবিরে।
বরং এই সময়টাতেই রোহিঙ্গা সংকট আবারও ‘অগ্রাধিকারের বাইরে’ চলে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফলে ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা আট বছরেও প্রত্যাবাসনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখেননি।
তবে স্বাভাবিকভাবেই তাদের সংখ্যা বেড়েছে। যা ইউএনএইচসিআরের হিসাবে প্রায় ১২ লাখ হলেও বেসরকারি হিসাবে ১৫ লাখের কাছাকাছি।
অপেক্ষার আরেক বছর
উখিয়ার কুতুপালং শিবিরে বসবাসরত ৪৫ বছর বয়সী আবদুস সালাম বলেন, “আমরা সত্যিই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। মনে হয়েছিল এবার হয়তো সত্যি ফিরব। এখন বুঝি, কথাটা শুধু কথাই ছিল।”
শিবিরে ঈদ মানে উৎসব নয়; বরং নতুন করে আরেকটি বছর হারিয়ে যাওয়ার বেদনা উপলব্ধি করা। বাঁশ আর ত্রিপলের ঘরে ঈদের সকালে রান্না হয় সীমিত রেশনের খাবার। নেই আয়োজন, নেই গ্রামে ফিরে আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ।
এক রোহিঙ্গা কিশোরীর কণ্ঠে ধরা পড়ে এমনই এক প্রজন্মগত সংকটের ভাষ্য। “আমি বাংলাদেশেই বড় হয়েছি। কিন্তু বাংলাদেশ আমার দেশ না, মিয়ানমারও আর চেনে না।”
মানবাধিকারকর্মী কলিম উল্লাহ বলেন, “রোহিঙ্গারা এখন ভূ-রাজনীতির অনাথ। সবাই সহানুভূতির কথা বলে, কিন্তু কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না।”

জাতীয় নীতিমালা নেই, প্রতিনিধিত্ব নেই
‘ইউনাইটেড কাউন্সিল ফর রোহিঙ্গা’র প্রেসিডেন্ট সৈয়দ উল্লাহ বলেন, “বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো জাতীয় নীতিমালা নেই। প্রতিনিধিত্বমূলক অন্তর্ভুক্তি ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।”
তিনি বলেন, ইউনূসের ওপর তারা আশাবাদী ছিলেন।
“রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরুক।”
রোহিঙ্গা আর্ট ক্লাবের অপারেশন ম্যানেজার ও চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ আরাফাত বলেন, “আমরা চাই মর্যাদা আর নিরাপত্তা নিয়ে ফিরতে। ইউএন আর বাংলাদেশ সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা যেন আমাদের কমিউনিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।”

ইউনূসের বক্তব্য: আবেগ না কৌশল?
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের দেওয়া প্রতিশ্রুতি আবেগপ্রবণ কোনো মন্তব্য, নাকি কৌশলগত বার্তা ছিল- এই প্রশ্ন ঘিরে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন গবেষকরা।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, “প্রফেসর ইউনূসের বক্তব্যকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
“প্রফেসর ইউনূস এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ যে বক্তব্য দিয়েছিলেন- ‘আগামী বছর ঈদ আপনারা নিজ ভূমিতে করবেন’, এই কথাটা তিনি আবেগের বশে বলেননি।
“উনি যে অবস্থানে ছিলেন- একটি দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান, নোবেল লরিয়েট- এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আবেগে ভেসে এমন বক্তব্য দেওয়ার কথা নয়।”
অধ্যাপক নাসির মনে করেন, ইউনূসের বক্তব্যের পেছনে দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা থাকতে পারে।
তিনি বলেন, “একটা সম্ভাবনা হচ্ছে- উনি সত্যিকার অর্থেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছেন। অন্তত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটা শক্ত বার্তা দিতে চেয়েছেন।”
তবে এর আরেকটি দিকও থাকতে পারে মন্তব্য করেন তিনি বলেন, “আরেকটা সম্ভাবনা হচ্ছে-একটা মিডিয়া সেনসেশন তৈরি করা, সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা। নোবেল লরিয়েট হিসেবে তিনি এসে এক বছরে সবকিছু ঠিক করে ফেলবেন- এই ধরনের একটা ইমেজ তৈরি করা।”
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “কিন্তু বাস্তবতা হলো- এটা বাস্তবসম্মত ছিল না।”
‘এটা প্রত্যাশা ছিল, প্রতিশ্রুতি নয়’
রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফেরা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যকে প্রতিশ্রুতি নয়, প্রত্যাশার প্রকাশ বলে ব্যাখ্যা করেছে সরকার।
বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যটি মূলত ঈদকে ঘিরে এই অঞ্চলের সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা তুলে ধরার একটি মানবিক ভাষ্য ছিল।”
মিজানুর রহমান বলেন, “এই অঞ্চলে ঈদের সময় মানুষ গ্রামে যায়, বাবা-মা ও দাদা-দাদির কবর জিয়ারত করে। রোহিঙ্গারা যেহেতু আট বছর ধরে এখানে আটকে আছে, সেই মানবিক আবেগ থেকেই বলা হয়েছে- আগামী ঈদে আপনারা আপনাদের বাড়িতে যাবেন।”
তার ভাষায়, “এটা ছিল একটা উইশ, কোনোভাবেই কমিটমেন্ট নয়।”
রোহিঙ্গা সংকটের বাস্তবতা তুলে ধরে কমিশনার বলেন, “এই সমস্যার সমাধান বাংলাদেশের হাতে নেই। এটা মূলত মিয়ানমার রাষ্ট্র এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও সম্মতির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ এখানে একটি অংশ মাত্র।”
তিনি স্পষ্ট করেন, “যদি সমাধানটা বাংলাদেশের হাতে থাকত, তাহলে গত আট বছর ধরে এই সংকট ঝুলে থাকত না।”

আন্তর্জাতিক আলোচনায় ইস্যুটি ‘জিইয়ে রাখার চেষ্টা’
অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সীমিত সময়ের মধ্যেও রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আবার দৃশ্যমান করেছে বলে দাবি করেন মিজানুর রহমান।
তার ভাষায়, “আমরা চেষ্টা করেছি। জাতিসংঘে একটি স্পেশাল কনফারেন্স হয়েছে। বাংলাদেশে তিন দিনের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিবের নজরে বিষয়টি আনা হয়েছে। বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি এসেছেন।”
তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আবার এ নিয়ে সম্পৃক্ততা শুরু হয়েছে- এটা বড় বিষয়।”
কমিশনার মিজানুর বলেন, রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক ফোরামে অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছিল।
“এই ইস্যুটাকে আবার আলোচনায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি থাকে।”
তার মতে, “এটি একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া। যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে- এই বিশ্বাস আমাদের আছে।”
বাংলাদেশ কেন রোহিঙ্গা সংকটকে বারবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলছে, সে ব্যাখ্যাও দেন কমিশনার।
তিনি বলেন, “এর দুটি প্রধান কারণ- একটি হচ্ছে প্রত্যাবাসন, আরেকটি হচ্ছে এখানে অবস্থানরত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা।
“তহবিল সংকট এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এই মানুষগুলোর জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।”
মিজানুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ সরকার এই ইস্যুটি সবসময় আন্তর্জাতিকভাবে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এটা যদি চলমান থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো না কোনো সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব- এই আশা আমরা করি।”
রাজনৈতিক দলগুলোর অগ্রাধিকারে রোহিঙ্গা সংকট নেই
নৃ-বিজ্ঞানের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনায় থাকা প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কোনোটি তাদের নির্বাচন ইশতেহারে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নিয়ে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তুলে ধরেনি।
তিনি বলেন, “এটি দেখেই বোঝা যায়, এই সংকট তাদের আগ্রাধিকার পর্যায়ে নেই।”
এটি রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক- মন্তব্য করে রহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে চাওয়া রাজনৈতিক দলগুলো রোহিঙ্গা সংকটকে একটি বড় জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখছে না। অথচ বাস্তবে এটি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনীতির বড় চ্যালেঞ্জ।”
এ বিষয়ে রাজনৈতিক মাঠের বাস্তবতা তুলে ধরেছেন উখিয়া-টেকনাফ সংসদীয় আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “প্রফেসর ইউনূস কী উদ্দেশ্যে বা কী পরিকল্পনা নিয়ে এই কথা বলেছিলেন, সেটা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। তবে বাস্তবতা হলো- এত অল্প সময়ে, বিশেষ করে নির্বাচন সামনে রেখে, এই সংকটের কোনো দৃশ্যমান সমাধান সম্ভব ছিল না।”
তার ভাষায়, “এটা যদি কোনো অলৌকিক ব্যাপার হতো- আলাউদ্দিনের চেরাগ বা আশ্চর্য প্রদীপের মতো- তাহলে হয়ত সম্ভব হত। বাস্তব দুনিয়ায় সেটা হয়নি। এখন দেখা যাচ্ছে, উনার সময় শেষ হয়ে গেছে।”
তবে তিনি বলেন, “সংকটটি এখানেই শেষ নয়। যেই সরকারই আসুক, এই বোঝা আমাদের ঘাড়েই থাকবে। এটাকে সিরিয়াসলি হ্যান্ডেল না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।”

‘রাখাইনে বৈধ সরকার নেই’
উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রতিক দাঙ্গা, সংঘাত ও সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন এখন অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে।”
প্রধান উপদেষ্টার আগের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ওই মন্তব্য হয়ত আবেগের জায়গা থেকে ছিল, অথবা তখনকার পরিস্থিতির আলোকে করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত বদলে গেছে।”
তার মতে, প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে বড় বাধা হল রাখাইনের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা।
“এখন সেখানে কোনো বৈধ, কার্যকর সরকার নেই। এই অবস্থায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন বাস্তবসম্মতভাবে অনিশ্চিত।”
‘রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি, সরকার পরিবর্তনে দায় শেষ হয় না’
২০১৭ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে হওয়া প্রত্যাবাসন চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন বলেন, “এই চুক্তিটা কোনো বিশেষ সরকার বা দলের মধ্যে হয়নি। এটা হয়েছে দুইটা রাষ্ট্রের মধ্যে।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “তখন মিয়ানমারে ছিল সুচির এনএলডি সরকার, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ। কিন্তু সরকার বদলালেই চুক্তি অকার্যকর হয়ে যায়- এমন নয়। রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার চুক্তি করে, আর যে সরকারই আসুক তার দায়িত্ব সেই চুক্তি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।”
তার মতে, নতুন সরকার চাইলে এই যুক্তি সামনে রেখে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আবার অগ্রাধিকার তালিকায় আনতে পারে।
সমাধান মিয়ানমারেই: ইউএনএইচসিআর
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলছে, বর্তমানে মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের উপযোগী নয়।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জানতে চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ই-মেইলে পাঠানো এক প্রতিক্রিয়ায় সংস্থাটির মুখপাত্র শারি নিজমান বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ধারাবাহিকভাবে জানিয়ে আসছে- উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে তারা নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে চান। তবে সেই প্রত্যাবাসনের জন্য যে মৌলিক শর্তগুলো প্রয়োজন, সেগুলো এখনো পূরণ হয়নি।

ইউএনএইচসিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের নিজেদের আদি এলাকায় বসবাসের সুযোগ, স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার, মৌলিক সেবা ও জীবিকায় প্রবেশাধিকার এবং নাগরিকত্ব ও বৈধ পরিচয়পত্র পাওয়ার একটি স্পষ্ট পথ নিশ্চিত করা জরুরি।
সংস্থাটি বলছে, এই শর্তগুলো নিশ্চিত করা মূলত মিয়ানমারের পূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সম্পৃক্ততার ওপর নির্ভর করে- যা বর্তমান বাস্তবতায় অনুপস্থিত।
ইউএনএইচসিআর জানায়, ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে সংঘাত ও নিপীড়নের কারণে আনুমানিক দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতিকে ‘চরম উদ্বেগজনক’ বর্ণনা করে সংস্থাটি জানায়, সেখানে ব্যাপক সংঘর্ষ, আন্তঃসম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং কাঠামোগত বৈষম্য এখনো বিদ্যমান। বর্তমানে রাখাইনে বসবাসকারী আনুমানিক ৫ লাখ ৩৬ হাজার রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবিকা, চলাচলের স্বাধীনতা ও নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
ইউএনএইচসিআর বলছে, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান মানবিক সংস্থার একার পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সংস্থাটি জানায়, তারা বাংলাদেশ সরকারকে মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষা সেবায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে এবং এমন উদ্যোগের পক্ষে থাকবে, যা রোহিঙ্গাদের স্বনির্ভরতা বাড়াবে ও ভবিষ্যতে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত করবে।
নতুন সরকারের সামনে রোহিঙ্গা সংকট আগের মতোই এক কঠিন বাস্তবতা। জাতীয় নীতিমালা, কূটনৈতিক আগ্রাসন ও বহুমুখী সমাধান ছাড়া এই সংকট কাটবে না- এমনটাই মত বিশ্লেষকদের।
পুরানো খবর
নিজর বাড়িত যাইয়েরে সামনর ঈদ: রোহিঙ্গাদের ইফতারে ইউনূস
প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র সমাধান: গুতেরেস
১২ লাখ ‘রোহিঙ্গা মেহমান’ যেন আগামী ঈদ স্বদেশে করতে পারে: ইউনূসের প্রত্যাশা