Published : 25 Aug 2025, 08:38 AM
পেছনে জ্বলছে গ্রামের পর গ্রাম, চলছে জঘন্য হত্যাযজ্ঞ; নাফ নদীর এপার-ওপারে কাদামাটি পেরিয়ে রোহিঙ্গাদের অনিশ্চিত যাত্রা হতবাক করেছিল বিশ্বকে।
আট বছর পেরিয়ে সেই অনিশ্চয়তা এখন পরিণত হয়েছে দীর্ঘশ্বাসে; মিয়ানমারের প্রতিশ্রুতি আর বাংলাদেশের প্রচেষ্টার মধ্যে একজন রোহিঙ্গাও ফিরে যায়নি নিজের বাসভূমে।
বাংলাদেশ সরকার সতর্ক করে বলছে, হতাশ রোহিঙ্গারা বিভিন্ন অপরাধে জড়াচ্ছে, তৈরি হচ্ছে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার শঙ্কা।
এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টিতে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীকে বড় পরিসরে সম্পৃক্ত করার কথা বলছে ২০২৪ সালের অগাস্টে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের প্রস্তাবে সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের যে সম্মেলন হতে যাচ্ছে, সেদিকেই এখন সরকারের নজর।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কক্সবাজারে রোববার থেকে তিন দিনের ‘স্টেকহোল্ডার সম্মেলন’ আয়োজন করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভের কার্যালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সোমবার এ সম্মেলনে যোগ দেবেন প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস। এ সম্মেলন থেকে আসা প্রস্তাব এবং বক্তব্যগুলো আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে অনুষ্ঠেয় সম্মেলনে তুলে ধরার কথা বলছে সরকার।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতন থেকে বাংলাদেশ অভিমুখে রোহিঙ্গাদের সেই অনিশ্চিত যাত্রার আট বছর পূর্ণ হচ্ছে সোমবার।
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে সেই ঢলের শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট; এরপর কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়। আগে থেকে ওই এলাকার ক্যাম্পে বসবাস করছিল আরও চার লাখ রোহিঙ্গা।
জাতিসংঘ সে সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর এই হত্যা ও নির্যাতনকে চিহ্নিত করেছিল ‘জাতিগত নিধনের ধ্রুপদী উদাহরণ’ হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারও রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো ওই হত্যাযজ্ঞকে ‘জেনোসাইড’ হিসাবে বর্ণনা করেছে।
বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দেওয়ার পর থেকে কক্সবাজার ও উখিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বাঁশ আর প্লাস্টিকের খুপড়ি ঘরে বসবাস শুরু করে রোহিঙ্গারা। উখিয়ার কুতুপালং পরিণত হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে।
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৭ সালের শেষ দিকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হয় মিয়ানমারের অং সান সু চি সরকার। ওই বছর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতেও সই করে।
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চলার এক পর্যায়ে ২০১৯ সালে দুই দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের প্রতিশ্রুতিতে রোহিঙ্গারা আস্থা রাখতে না পারায় সেই চেষ্টা ভেস্তে যায়।
এরপর আসে করোনাভাইরাস মহামারী, রোহিঙ্গাদের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগে ঢিল পড়ে। বিশ্বজুড়ে সেই সঙ্কটের মধ্যেই ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সু চির দ্বিতীয় দফার সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন সামরিক জান্তা জেনারেল মিন অং হ্লাইং।
এখন পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আর সেভাবে আলোচনায় নেই।
সামরিক জান্তা মিয়ানমারের ক্ষমতা দখলের কয়েক দিন আগে চীনের নেতৃত্ব প্রত্যাবাসনের বিষয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছিল। তার চূড়ান্ত ফল আর পাওয়া যায়নি।
ওই সময় বাংলাদেশ আশা করেছিল, ২০২১ সালের দ্বিতীয়ার্ধে হয়ত প্রত্যাবাসন শুরু করা যাবে। সেই পরিকল্পনা আর আলোর মুখ দেখেনি।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে অগ্রাধিকারে রাখা বাংলাদেশ সরকার বারবার অভিযোগ করে আসছে, আন্তর্জাতিক মহল প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করতে ‘ব্যর্থ’ হয়েছে।

আলোচনায় ‘মানবিক চ্যানেল’, তারপর…
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা খলিলুর রহমানকে নিজের রোহিঙ্গা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসাবে দায়িত্ব দেন মুহাম্মদ ইউনূস। পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বও তার কাঁধে দায়িত্ব বর্তায়।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের ঢাকা সফরের পর গত ৮ এপ্রিল বাংলাদেশের ‘মানবিক সহায়তা চ্যানেল’করার সম্ভাবনার বিষয়ে প্রথম ধারণা দেন খলিলুর রহমান।
৭ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে খলিলুরের আলোচনায় ‘হিউম্যানিটারিয়ান চ্যানেলে’ বাংলাদেশের সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রথম আসে।
ওইদিন এক সংবাদ সম্মেলনে খলিল বলেছিলেন, আরাকান আর্মি, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মিয়ানমার সরকার- সবার সঙ্গে আলোচনা করেই জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে গিয়েছিলেন তিনি।
“তাকে আমরা বলেছি, রাখাইনে যে মানবিক সমস্যা, যে সংকট, সেটা মোকাবেলার জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্যের বিকল্প নেই। সেই কাজটি জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানেই হবে।”
মিয়ানমার ও রাখাইন রাজ্য নিয়ন্ত্রণকারী আরাকান আর্মির সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনা এগোনোর কথা তুলে ধরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলেন, সবাই একমত হয়েছে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান। প্রথমবারের মত মিয়ানমার সরকার ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ‘প্রত্যাবাসনযোগ্য’ ঘোষণা করে। এখন প্রত্যাবাসন কোন প্রক্রিয়ায় হবে, সেটা নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
এটাকে ‘মানবিক করিডোর’ নয়, বরং ‘জরুরি ত্রাণ পাঠানোর চ্যানেল’ হিসাবে বর্ণনা করেন খলিলুর রহমান।
রাখাইনে ত্রাণ পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারলে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হবে- এমন ধারণা করার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আরাকানের অবস্থা যতদিন অস্থিতিশীল থাকবে, ততদিন আমরা প্রত্যাবাসনের কথা বলতেই পারব না। আর প্রত্যাবাসনের কথা যদি না-ই বলতে পারি, তাহলেতো প্রত্যাবাসন কৌশল নিয়েও কোনো কথা বলতে পারব না। সুতরাং, প্রত্যাবাসন কৌশলের যে পূর্বশর্ত, আমরা সেখানে আসি নাই।”
করিডোর নিয়ে খলিলুর রহমান বক্তব্যের প্রায় তিন সপ্তাহ পর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “আমি এটুকু আপনাদেরকে বলতে পারি, নীতিগতভাবে আমরা এটাতে সম্মত। কারণ, মানবিক প্যাসেজ হবে।
“কিন্তু এটাতে আমাদের কিছু শর্ত আছে, সেটার বিস্তারিততে যাচ্ছি না, সেই শর্তাবলী যদি পালিত হয়, আমরা এটাতে অবশ্যই সহযোগিতা করব, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অবশ্যই।”
তার ওই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়। কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এমন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে রাজনৈতিক দলগুলো।
‘মানবিক করিডোর’ দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের যে ‘নীতিগত সিদ্ধান্ত’ নিয়েছে, তাতে দেশের ‘স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির’ মুখে পড়বে বলে মন্তব্য করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তার মতে, এক্ষেত্রে সরকার এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এটি ‘ঠিক হয়নি’। উচিৎ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। এই করিডোর দেওয়ার ফলে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা- সার্বভৌমত্ব ‘হুমকির মুখে’ পড়বে।
রাজনৈতিক দলগুলোর এমন বিরোধিতার মুখে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘হিউম্যানিটারিয়ান প্যাসেজ’ বা ‘মানবিক করিডোর’ দেওয়া নিয়ে ‘জাতিসংঘ বা অন্য কোনো সংস্থার’ সঙ্গে সরকারের কোনো আলোচনা হয়নি।
এক ফেইসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ''যদি জাতিসংঘের নেতৃত্বে রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশ যৌক্তিক পরিকাঠামোগত সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকবে।''
পরে এক বিবৃতিতে ঢাকায় জাতিসংঘ কার্যালয় বলে, রাখাইনে মানবিক সহায়তা নেওয়ার পথ তৈরির ক্ষেত্রে জাতিসংঘ যদি জড়িত হয়, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হবে।
“আন্তঃসীমান্ত সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর অনুমোদন নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা জাতিসংঘের রয়েছে। এটা ছাড়া জাতিসংঘের সরাসরি সম্পৃক্ততা সীমিত।”

রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতা এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সতর্কতার মধ্যে মানবিক চ্যানেল কিংবা করিডোর নিয়ে আলোচনা ঝুলে যায়।
এর মধ্যে গত ১৪ মার্চ প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে কক্সবাজারে গিয়ে রোহিঙ্গাদের কষ্ট নিজের চোখে দেখেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন।
এরপর এপ্রিলে থাইল্যান্ডে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমানকে প্রত্যাবাসন বিষয়ে অগ্রগতি জানান মিয়ানমারের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী উ থান শিউ।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আট লাখ রোহিঙ্গার তালিকা থেকে আংশিক যাচাই বাছাইয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ‘যোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে মিয়ানমার।
আরও ৭০ হাজার রোহিঙ্গার চূড়ান্ত যাচাই বাছাইয়ের অংশ হিসেবে ছবি ও নাম মিলিয়ে দেখার কাজ চলছে। ওই তালিকার বাকি সাড়ে ৫ লাখ রোহিঙ্গার যাচাই বাছাই কাজও দ্রুত সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দেয় মিয়ানমার।
কিন্তু মিয়ানমারের জাতিগত সশস্ত্র সংঘাতের মধ্যে বাংলাদেশের সীমান্ত লাগোয়া সব এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। এরপর প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও চাপা পড়ে যায়।
সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস মালয়েশিয়া সফরে বিষয়টি উত্থাপন করলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।

ফেরা অনিশ্চিত, তহবিলে টান
মিয়ানমারে সংঘাতের কারণে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আরো বেশি অনিশ্চিয়তায় পড়েছে। কবে নাগাদ তা আলোচনার টেবিলে ফিরবে সেই দিশা নেই বিশ্লেষক বা সরকার–কারও কাছে।
বাংলাদেশে আশ্রিত মিয়ানমারের নাগরিকদের নিয়ে যে সংকট চলছে, তার ‘স্থায়ী সমাধান’ হিসেবে প্রত্যাবাসনের জন্য কাজ করার কথা বলেছেন হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমান।
১৭ অগাস্ট ঢাকায় কূটনৈতিকদের ব্রিফ করার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, “সবচাইতে বড় কথা হচ্ছে যে- আমরা এই সমস্যাটির একটি আশু এবং স্থায়ী সমাধান চাই, তো সেটাই।
“আপনি আন্তর্জাতিক সাহায্য দিয়ে কতদিন রাখবেন, তাদের তো বাড়ি ফিরতে হবে। সেটাই তো আসল কথা।”
তিন দিনব্যাপী ‘স্টেকহোল্ডার কনফারেন্স এর কথা তুলে ধরে খলিলুর বলেন, “জাতিসংঘে আগামী সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখে রোহিঙ্গা বিষয়ক যে আন্তর্জাতিক সম্মেলন হচ্ছে, তারই প্রস্তুতির একটা অংশ হিসেবে আমরা করেছি।”
রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক আলোচনা থেকে ‘খসে পড়ার’ প্রেক্ষাপটে এ সম্মেলন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন খলিলুর।
তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা গত বছর জাতিসংঘের সাধারণ সভায় একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহ্বান করার জন্য সদস্য দেশগহুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
“এবং সেটাতে তাৎক্ষণিকভাবে আমরা সাড়া পেয়েছি। সর্বসম্মতিক্রমে এই কনফারেন্সটা আহ্বান করার সিদ্ধান্ত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ গ্রহণ করে এবং বিশ্বের ১০৬টা দেশ এটাকে স্পন্সর করে। সুতরাং এখন আন্তর্জাতিক সমর্থন যথেষ্ট পরিমাণ আছে।”
প্রত্যাবাসন আটকে থাকার মধ্যে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের জীবনযাপনের খরচ মেটানোর জন্য আসা তহবিলও দিনে দিনে কমছে।
২০১৭ সাল থেকে জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) নামে রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার কাজটি করে আসছে জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন স্ট্র্যাটেজিক এক্সিকিউটিভ গ্রুপ।
বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের কার্যালয়ের সঙ্গে ওই গ্রুপে রয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম)।
২০১৭ সালের অগাস্টে রোহিঙ্গা ঢল নামার পরপর প্রথম জেআরপি করা হয়, যাতে চার মাসের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৩ কোটি ৪১ লাখ ডলার। তার মধ্যে ৭৩ শতাংশ অর্থাৎ ৩১ কোটি ৭২ লাখ ডলার এসেছিল দাতাদের কাছ থেকে।
৮টি জেআরপির মধ্যে পাঁচটিতে ৭০ শতাংশের বেশি তহবিল এলেও করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে ২০২০ সালে তা ৬০ শতাংশের নিচে নেমে আসে।

রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা
|
বছর |
২০২৫ |
২০২৪ |
২০২৩ |
২০২২ |
২০২১ |
২০২০ |
২০১৯ |
২০১৮ |
২০১৭ |
|
জেআরপির প্রত্যাশিত তহবিল (মিলিয়ন ডলার) |
৯৩৪.৫ |
৮৫২.৪ |
৮৭৫.৯ |
৮৮১ |
৯৪৩.১ |
১০০০.০৬ |
৯২০.৫ |
৯৫০.৮ |
৪৩৪.১ |
|
তহবিল ছাড় (মিলিয়ন ডলার) |
৩৩৮.৩ |
৫৫১.৫ |
৬১৮.৯ |
৫৫৮.৬ |
৬৮৭.৯ |
৬৩০.২ |
৬৯২ |
৬৮৮.১ |
৩১৬.৫ |
|
শতকরা হার (%) |
৩৬.২ |
৬৪.৭ |
৭০.৭ |
৬৩.৪ |
৭২.৯ |
৫৯.৬ |
৭৫.২ |
৭২.৪ |
৭২.৯ |
২০২৪ সালে আহ্বান করা ৮৫ কোটি ২৪ লাখ ডলারের মধ্যে ৫৫ কোটি ১৫ লাখ ডলার তহবিল এসেছিল। শতকরা হিসাবে যা প্রত্যাশিত তহবিলের ৬৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
চলতি বছরে জেআরপিতে মোট ৯৩কোটি ৪৫ লাখ ডলারের তহবিলের প্রয়োজন হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। অগাস্ট পর্যন্ত মাত্র ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ তহবিল এসেছে। টাকার অঙ্কে যা মাত্র ৩৩ কোটি ৮৩ ডলার।

তহবিল সংকটের কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্য সহায়তার পরিমাণ কমানোর ঘটনাও ঘটেছিল। জেআরপিতে তহবিল আসা কমে যাওয়ায় ফের একই রকমের পরিস্থিতি তৈরির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে শরণার্থী ক্যাম্পের বেশিরভাগ স্কুল চালাত ইউনিসেফ। তহবিল ঘাটতির কারণে জুনে তারা ৪ হাজার ৫০০ স্কুলের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।
রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল আনার প্রক্রিয়াটা ঠিক রাখার পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের বিষয়ে জোর দিয়ে কাজ করার পরামর্শ দিচ্ছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, আমাদের মূল ফোকাসটা দিতে হবে প্রত্যাবাসনে। আবার তহবিল আসাটাও গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়কে নতুনভাবে ভাবা যায় কি-না, সেটা দেখতে হবে।
এক্ষেত্রে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়কে স্থিতিশীল করার জন্য বিভিন্ন দেশ যে উদ্যোগ নিচ্ছে, সেখানে রোহিঙ্গাদের বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চালানোর পরামর্শ দিচ্ছেন হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ঠিক করার জন্য আসিয়ান থেকে পাঁচ দফা ভিত্তিক সমাধানের কথা বলা হচ্ছে। আসিয়ানের চেয়ার হিসাবে মালয়েশিয়া সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

“ফেডারেল স্ট্রাকচারে একটা সমাধানের কথা তারা বলছে। সেখানে কিন্তু রোহিঙ্গাদের বিষয়টি অনুপস্থিত। এক্ষেত্রে আমরা রোহিঙ্গাদের বিষয়কেও যদি সেখানকার অংশ হিসাবে রাখতে পারতাম, তাহলে ভবিষ্যতে সমাধানের একটা পথ হয়ত পাওয়া যেত।”
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কথা বলার মত বা তাদের ফেরানোর বিষয়ে কোনো কাজ করার মত ‘বড় কোনো শক্তি’ না দেখার কথাই বলছেন এই বিশ্লেষক।