১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় নিম্নমানের কাজ দেখে মন্ত্রীর ক্ষোভ

উৎপাদনকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে সতর্ক করেন রেলমন্ত্রী।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 13 Oct 2026, 05:07 PM

Updated : 13 Oct 2026, 05:55 PM

নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় মেরামতাধীন রেলকোচের জানালার ফ্রেমে নিম্নমানের অ্যালুমিনিয়াম পাতের ব্যবহার ও সংস্কারকাজের মান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রেলপথ, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দেশের বৃহত্তম ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে এ অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।

এ সময় কারখানার বিভিন্ন বিভাগের মেরামত ও উৎপাদন কার্যক্রম ঘুরে দেখেন মন্ত্রী।

পরিদর্শনের শুরুতে কারখানার ক্যারেজ শপে যান শেখ রবিউল আলম। সেখানে মেরামতাধীন বিজি ৭৩১৭ নম্বর কোচের ওপর উঠে জানালার ফ্রেমের সংস্কারকাজ পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। এ সময় ফ্রেম তৈরিতে হালকা অ্যালুমিনিয়াম পাতের ব্যবহার ও কাজের মান দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন মন্ত্রী।

পরিদর্শনকালে মন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, রেলপথ সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম, মন্ত্রীর একান্ত সচিব (উপসচিব) হাবিবুল হাসান রুমি এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আহম্মদ হোসেন মাসুম।

এ সময় যাত্রীসেবার মান বাড়াতে রেলকোচ মেরামতে ব্যবহৃত সামগ্রীর মান যাচাই এবং সংস্কার ও

উৎপাদনকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে সতর্ক করেন মন্ত্রী।

মন্ত্রী রেলের কোচ মেরামত, পুনর্নির্মাণ এবং খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির প্রতিটি পর্যায়ে গুণগত মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এসব কাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার বা অবহেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও নির্দেশনা দেন তিনি।

পরে তিনি কারখানার চিফ মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ (সিএমডব্লিউ) বিভাগে যান। সেখানে কোচের চাকায় টায়ার পরানোর প্রক্রিয়া সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেন। এরপর ফাউন্ড্রি শপ পরিদর্শন করেন। এ বিভাগের গলিত লোহা ব্যবহার করে ট্রেনের বিভিন্ন ছোটখাটো খুচরা যন্ত্রাংশ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান।

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় কর্মকর্তা শাহ সুফি নূর মোহাম্মদ, কর্মব্যবস্থাপক এম মমতাজুল ইসলাম, নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ূন কবীর, সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারাহ ফাতেহা তাকলিমা, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার কর্মকর্তারা।

এ সময় রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, “এমন নিম্নমানের কাজ করার চাইতে রেলকোচ সংস্কার কাজ একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া হোক। এত বড় একটি কারখানায় রেলওয়ে কোচ সংস্কার কাজের মান এত নিম্নমানের, এখানে নিজে না এলে তা কোনোভাবেই বুঝতে পারতাম না। এ ধরনের কাজ দেখার পর এখানকার কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের যোগ্যতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন থেকে যায়।”

মন্ত্রী সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফি নূর মোহাম্মদকে উদ্দেশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এখানে জানালার যেভাবে সংস্কার করা হচ্ছে, এর চেয়ে অনেক ভালো কাজ তো ছোটখাটো যেকোনো ওয়ার্কশপেও করা সম্ভব। আপনার নিজের বাড়ির জানালার সংস্কারকাজ হলে কি এভাবে অবহেলাভরে কাজ করতেন?”

পরিদর্শনকালে মন্ত্রী আরও বলেন, “রেলের আধুনিকায়ন এবং যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারখানায় কোচ মেরামত ও পুনর্নির্মাণের কাজে কোনো ধরনের অবহেলা কিংবা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার বরদাশকরা হবে না।”

পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, এখানে প্রায় ২ হাজার ৪০০টি আবাসন রয়েছে। তবে সেখানে প্রায় ৯০০ জন থাকেন। ফলে আবাসনের কোনো সংকট নেই। পুরোনো ভবনের আবাসনের জন্য বেতন থেকে যে হারে টাকা কাটা হয়, তার চেয়ে কম ভাড়ায় বাইরে ভালো বাসা পাওয়া যায়। এ কারণে অনেকে রেলের আবাসনে থাকতে আগ্রহী নন।

তিনি বলেন, রেলওয়ের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ একর জমি পৌরসভার দখলে রয়েছে। জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষ ও পৌরসভার মধ্যে বিরোধ রয়েছে, যা অনেকটা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আজকের সভায় ইউএনওসহ বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

রেলওয়ের জমি দখলের বিষয়ে তিনি বলেন, রেলওয়ের জমি ব্যক্তি, গোষ্ঠীসহ বিভিন্ন পর্যায়ে লাইসেন্সের ভিত্তিতে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে এক বছর পরপর লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়। তবে বর্তমানে লিজ দেওয়া বন্ধ রয়েছে। প্রথমে রেলের প্রয়োজনে, এরপর রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এসব জমি ব্যবহার করতে চাই। জমিগুলো শনাক্ত করে সীমানা নির্ধারণ করা হচ্ছে। রেলওয়ের যেসব জমি দখল হয়ে আছে, সেগুলো চিহ্নিত করে দখলমুক্ত করা হবে।

রেলপথ মন্ত্রী বলেন, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বাংলাদেশের রেলওয়েতে যতটা সম্ভব আমূল পরিবর্তন এনে যাত্রীবান্ধব করা হবে। রেলযাত্রার ঐতিহ্য যেমন রয়েছে, তেমনি এর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। এ ব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারণের প্রয়োজন আছে। এটি আমাদের নির্বাচনি অঙ্গীকার ছিল। রেলওয়ের দুটি কারখানাকে কীভাবে এ পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়, তা দেখতে এখানে এসেছি। কারখানার সমস্যাগুলো জানার পাশাপাশি সম্ভাবনাগুলোও খতিয়ে দেখেছি।

তিনি বলেন, কারখানায় তৈরি কিছু যন্ত্রাংশের মান দেখেছি। এতে আমরা আশ্বস্ত হয়েছি। তবে কোচ মেরামতের কাজ আরও মানসম্মত করতে হবে। কারখানায় কিছু পুরোনো মেশিন রয়েছে, যেগুলো মানসম্মত। তবে কোচের বিভিন্ন অংশ ও জানালা মেরামতের কাজ আরও উন্নত করতে কী করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে মিলিয়ে প্রায় ৪০০টি কোচ মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব কোচ মেরামত করে আবার সচল করতে দক্ষ কারিগর নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

রেলওয়ে হাসপাতাল সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, রেলের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় হাসপাতাল পরিচালনা, চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ এবং রোগীদের সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। দেশের প্রায় নয়টি রেলওয়ে হাসপাতাল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথ ব্যবস্থাপনায় কীভাবে পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা একসময় প্রতিষ্ঠিত ও সুনামধন্য ছিল। ১৮৬২ থেকে ১৮৭০ সালের মধ্যে এখানে কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় যে প্রয়োজনে কারখানাটি গড়ে উঠেছিল, সেই প্রয়োজন এখনো রয়েছে, বরং বেড়েছে। তবে সে অনুযায়ী কারখানাটির উন্নয়ন হয়নি।

কারখানা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, কোচ মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক যন্ত্রাংশ একসময় এখানে প্রায় ১২ হাজার ধরনের তৈরি হতো। বর্তমানে তা কমে ৬৫৪ থেকে ৬৫৫ ধরনের মধ্যে নেমে এসেছে। এসব যন্ত্রাংশ এখন আমদানি করতে হচ্ছে। অথচ এর অনেকগুলোই এ কারখানায় তৈরি করা সম্ভব।ত করা হবে না।”