Published : 08 Jul 2026, 06:16 PM
কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে বান্দরবানের কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। শহরের পৌর এলাকার হাফেজঘোনা, কাসেমপাড়া, আর্মিপাড়া, বনানী স-মিল এলাকা, বালাঘাটার আমবাগানপাড়া এবং সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী বসতঘরগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে।
এসব এলাকার বাসিন্দারা মঙ্গলবার রাত থেকে প্রশাসন নির্ধারিত কয়েকটি সরকারি বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।
আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খিচুড়ি, শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও মোমবাতি বিতরণ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার রাতে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস দুর্গত মানুষের খোঁজখবর নেন এবং ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন।
বুধবার সকালে কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রশাসন নির্ধারিত নিকটবর্তী বিদ্যালয়গুলোতে ঠাঁই নিয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বেশির ভাগ শিশু ও বৃদ্ধ বয়সী লোকজন রয়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে আসা লোকজনদের বিছানা করে গাদাগাদি করে থাকতে দেখা গেছে। তবে দুটি আশ্রয়কেন্দ্রের কেউ কেউ খাবার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
শহরের রাজারমাঠ এলাকায় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে কথা হয় পারভিন আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, “পরিবারে সদস্যদের নিয়ে বুধবার ভোরে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছি। আগে যারা আসছে তাদেরকে চাল, ডাল, শুকনা খাবার ও দিয়ে গেছে শুনলাম। তবে আমরা কিছু পাইনি।”

আবু তাহের নামে আশ্রয় নেওয়া একজন বলছিলেন, “সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যারা আশ্রয় নিয়েছে, তারা সবাই সাঙ্গু নদীর পাড়ের মানুষ। পানি বেড়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার রাতে এখানে চলে আসছি।
“তবে সবাই একসঙ্গে আসেনি। পানির অবস্থা দেখে কেউ আগে আসছে; কেউ পরে আসছে। আমরা রাতে খাবার পেয়েছি; সকালেও খিচুড়ি দিয়েছে।”
সরকারি বালিক উচ্চ বিদ্যালয়ে বুধবার সকাল পর্যন্ত ৬০ পরিবারে বেশি আশ্রয় নিয়েছে। বুধবার সকালে এসে প্রশাসনের লোকজন পরিদর্শন করেছেন বলে স্কুলের দাপ্তরিক কাজের দায়িত্বে থাকা মো. কামাল জানিয়েছেন।
এদিকে শহর মডেল সরকারি প্রাথমিক আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও রুমে নিচে বিছানা করে সবাই গাদাগাদি করে থাকছেন। কেউ কেউ সঙ্গে করে ঘরের হাঁস-মুরগিও নিয়ে এসেছেন। আশ্রয় নেওয়া লোকজনদের মধ্যে বেশির ভাগ নারী। পুরুষরা সকাল থেকে কাজে বের হয়েছে বলে জানান তারা।

সাঙ্গু নদীর পাড়ের এলাকা মোহাম্মদপুর থেকে আসা রবিউল বলেন, পানি বেড়ে যাওয়ার পর মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে আশ্রয় নিয়েছে তারা। ঘরের মালামাল সরানোর কারণে আসতে দেরি হয়েছে। অর্ধেক জিনিসপত্র ডুবে গেছে। স্কুলে একটা রুমে নয় পরিবারের লোকজন গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। রাতে নিজেদের উদ্যোগে খেয়েছে সবাই। সকালে প্রশাসনের লোকজন এসে নাম তালিকা করে গেছে।
এ সময় এই আশ্রয়কেন্দ্রে সদর উপজেলার একটি মেডিকেল টিম আশ্রয় নেওয়া লোকজনদের খোঁজ খবর নিতে দেখা গেছে।
সদর উপজেলার স্যানিটারি টিমের পরিদর্শক নাঈম উদ্দিন বলেন, “সকাল থেকে পাড়াস্কুল কেন্দ্র, বাসস্টেশন কেন্দ্র, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং শহর মডেল স্কুল কেন্দ্র পরিদর্শন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে কয়েকজন অসুস্থ রোগী পাওয়া গেছে।
“তাদের মধ্যে মূলত পানিবাহিত রোগ, সর্দি, কাশি ও হালকা জ্বর রয়েছে। এসব রোগীদের ওষুধসহ প্রাথমিক সেবাটা দেওয়া হচ্ছে।”
শহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোহের আজাদ বলেছেন, “এখানে পৌর এলাকার ইসলামপুর, আর্মিপাড়া, বনানী স-মিল ও মোহাম্মদপুর-এই চারটি এলাকার ৭৫টি পরিবারের ২৬৫ জন সদস্য আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের দুপুরে খাবার দেওয়া হয়েছে।”

তিনি বলেন, “মঙ্গলবার রাতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা আরও বেশি ছিল। তখন প্রায় ৪০০ মানুষ এখানে অবস্থান করছিলেন। পরে পুরুষ সদস্যদের অনেকে বিভিন্ন কাজে বের হয়ে গেছেন। স্কুলটিতে সর্বোচ্চ ৪০০ জনের থাকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হলেও সেক্ষেত্রে গাদাগাদি করে থাকতে হবে।”
এদিকে পরিস্থিতি জানতে থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুর রহমান আল ফয়সালকে বুধবার সকাল থেকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
থানচি প্রেস ক্লাবের সভাপতি মংবোয়াচিং মারমা অনুপম জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ না থাকায় মঙ্গলবার রাত থেকে থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের টেলিটক নম্বরটিও বন্ধ রয়েছে।
তিনি বলেন, “টানা বৃষ্টির কারণে দুদিন আগেও তিন্দু ও নাফাখুম জলপ্রপাত এলাকায় বেড়াতে যাওয়া পর্যটকেরা আটকা পড়েছিলেন। তবে মঙ্গলবারের মধ্যে সবাই নিরাপদে ফিরে গেছেন।”
রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিজা আক্তার বিথি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। কয়েকটি স্থানে পানি বেড়ে রাস্তা ও কালভার্ট তলিয়ে গিয়েছিল। পরে পানি নেমে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
“ভারি বৃষ্টির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার পরিবারগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতে বলা হয়েছে। পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করার পর অধিকাংশ পর্যটক ফিরে গেছেন। কোথাও কোনো পর্যটক আটকে থাকার খবর পাওয়া যায়নি।”

এদিকে বান্দরবানের তৃতীয় দিনের মত থেমে থেমে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। বুধবার সকালের দিকে আবহওয়া শুষ্ক থাকলেও ১০টার পর আবার গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। টানা বৃষ্টির কারণে শহরে মধ্যম পাড়ায় অবস্থিত সাপ্তাহিক মারমা বাজারও বসেনি। সকাল থেকে ক্রেতা-বিক্রেতা খুব একটা দেখা যায়নি। তবে শহরে বাইরে কোথাও এখনও বড় ধরনের পাহাড় ধসের খবর আসেনি।
জেলা শহর থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি ও উপজেলা পর্যায়েও সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক রয়েছে। শহরের পাশে কালাঘাটা এলাকায় বেইলী ব্রিজ ডুবে যাওয়ায় রোয়াংছড়ি সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে ঝুঁকি নিয়ে মোটরসাইকেল চলাচল করতে পারছে।
বান্দরবান আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা সনাতন কুমার মণ্ডল বলেন, “বান্দরবানে গত ২৪ ঘণ্টায় বুধবার বেলা ৩টা পর্যন্ত ১৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এটা মূলত ভারি বৃষ্টিপাত।”
তিনি বলেন, “সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বুধবার বিকাল ৩টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে।”
ভারি বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর কোথাও কোথাও সাময়িক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধসের আশঙ্কাও রয়েছে বলে জানান তিনি।

বান্দরবান জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, টানা ভারি বৃষ্টির কারণে জেলার সাত উপজেলায় মোট ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে বান্দরবান সদরে ৪৬টি, রুমায় ২৮টি, রোয়াংছড়িতে ১৯টি, থানচিতে ১৫টি, লামায় ৫৫টি, আলীকদমে ১৫টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বান্দরবান সদর ছাড়া অন্য উপজেলাগুলোর আশ্রয়কেন্দ্রে এখনও কেউ আসেননি। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা মাঠে কাজ করছেন। তারা প্রয়োজন মনে করলে সহায়তার জন্য তিনটি সেনাবাহিনীর দলও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
“এ ছাড়া মাঠে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। রেড ক্রিসেন্টের দুটি দল এবং আনসারের দুটি দলও কাজ করছে। মঙ্গলবার রাতের সাময়িক বিঘ্ন ছাড়া এখন পর্যন্ত জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।”
আশ্রয় নেওয়া লোকজনদের জন্য পর্যাপ্ত খবার আছে জানিয়ে তিনি বলেন, “বান্দরবান সদরে বুধবার দুপুরে খাবার শুরুতে ২৫০ জনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরে প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় বেড়েছে। আবার সেভাবে প্রস্তুত করে দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যাপ্ত খাবার আছে। কোনো সংকট নেই। ”
“৫০০ জন বা আট-দশ গুন বেড়ে গেলেও আট-দশদিনের খাবার ব্যবস্থা করা আছে। ইউএনওদের কাছেও যথেষ্ট খাবার মজুদ করা আছে।”
বান্দরবান নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব জানান, সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমা ১৪ দশমিক ৮০ মিটার। এটি বর্তমানে বিপৎসীমার ১৫ দশমিক ৮৫ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।