Published : 21 May 2026, 04:08 PM
কুমিল্লায় কোরবানির পশুর বাজারে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার লেনদেনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
চাহিদার তুলনায় ‘বেশি’ পশু প্রস্তুত থাকলেও সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পশু প্রবেশ এবং মহাসড়কে পশু পরিবহনের নিরাপত্তাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলার ১৭টি উপজেলায় ৪৩২টি হাটে পশু কেনাবেচা হবে; যার বড় অংশই স্থানীয় খামারি ও প্রান্তিক কৃষকের উৎপাদিত পশু।
এবার জেলায় প্রায় ২ লাখ ৫৯ হাজার গবাদিপশু প্রস্তুত রয়েছে; যেখানে চাহিদা প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার। ফলে উদ্বৃত্ত থাকবে প্রায় ১২ হাজার পশু, যা দেশের অন্যান্য জেলাতেও সরবরাহ করা হবে।
এদিকে কুমিল্লার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় অবৈধ ভারতীয় পশু প্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি নজরদারি বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে।

অর্থনৈতিক গতির সম্ভাবনা
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সামছুল আলম বলেন, “কুমিল্লায় এবার কোরবানির পশুর বাজারে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে।
“এর মধ্যে প্রায় এক হাজার ৯০০ কোটি টাকার লেনদেন কোরবানির পশু কেনাবেচা থেকেই হতে পারে।”
তার মতে, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে অবৈধ গরু ও মহিষ প্রবেশ বন্ধ এবং মহাসড়কে পশুবাহী যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এই বিপুল অর্থনৈতিক লেনদেন স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সামছুল বলেন, জেলার ১৭ উপজেলায় ৪৩২টি হাটে পশু কেনাবেচা হবে। এসব পশুর বেশির ভাগই স্থানীয় খামারি ও প্রান্তিক কৃষকের পালন করা। হাট ইজারা, পরিবহন, রশি-বাঁশের খুঁটি, জবাইয়ের হাদিয়া, মসলা বিক্রি- এসব খাতেও উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক লেনদেন হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করে।

খামার ও বাজার পরিস্থিতি
কুমিল্লা জেলার খামারগুলোতে ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করেছে। অনেকেই আগাম বুকিং দিচ্ছেন। কেউ কেউ কোরবানির পশু কিনে খামারে রেখে যাচ্ছেন।
ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে খামারিরাও গরুগুলোর ভিন্নধর্মী নামকরণ ও সাজসজ্জা করছেন।
নগরীর কালিয়াজুড়ি এলাকার ‘নূর জাহান অ্যাগ্রো ফার্মের’ মালিক খামারি মো. মনির হোসেন বলেন, তার খামারে এ বছর কোরবানির জন্য ৭২টি গরু প্রস্তুত করা হয়েছে।
এসব মধ্যে রয়েছে ‘ব্রাহমা’ ও ‘শাহীওয়াল’সহ উন্নত জাতের গরু। এর মধ্যে কয়েকটি গরুর নাম রখেছেন বাহুবলী, তুফান, ফাইটার ও মামা-ভাগিনা।
সদর দক্ষিণ উপজেলার লক্ষ্মীনগর এলাকার ‘রাফি অ্যাগ্রো’ ফার্মে গিয়ে দেখা গেছে, কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে গরু, মহিষ, গয়াল। একই সঙ্গে বিক্রির জন্য একটি উটও এনেছেন খামার মালিক জুয়েল।

তিনি বলেন, “ঈদের এখনো বেশ কয়েকদিন বাকি থাকলেও এরই মধ্যে ক্রেতারা খামারে আসতে শুরু করেছেন। পছন্দ হলে আগাম কিনে রেখে যাচ্ছেন খামারে। ঈদের আগ দিন পর্যন্ত এসব গরু আমাদের কাছেই থাকবে।
“সেই হিসেবে আমরা তাদের কাছ থেকে মূল্য নিচ্ছি। এবার আমাদের কাছে ৮০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা মূল্যের গরু রয়েছে।”
বানাসোয়া এলাকার খামারি জামাল হোসেন বলছিলেন, তার খামারে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১০৪টি গরু রয়েছে। এসবের মধ্যে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে থাকা গরুর সংখ্যাই বেশি।
তিনি বলেন, “এ বছর গরুর দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।”
এখনো বেচাকেনা পুরোপুরি জমে ওঠেনি জানিয়ে জামাল বলেন, “আগামী সপ্তাহ থেকে বাজারে কেনাবেচা ভালোভাবে জমবে বলে আশা করছি।”
সদর দক্ষিণ উপজেলার বাগমারা এলাকার খামারি আব্দুল মমিন মিয়া বলেন, “অনেক খামারি এখন আধুনিক পদ্ধতিতে গরু পালন করছেন। সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ পাওয়ায় খামারিরা লাভবান হচ্ছেন। এবার দেশীয়ভাবে উৎপাদিত গরুর চাহিদা বেশি থাকবে বলে আশা করছি।”

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বিজিবি যা বলছে
কুমিল্লা জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, এবার কোরবানির জন্য জেলায় গরু, ষাঁড়, বলদ ও মহিষ মিলিয়ে দুই লাখ ৭১৭টি পশু প্রস্তুত রয়েছে। এ ছাড়া ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য প্রাণী রয়েছে ৫৮ হাজার ২৮৩টি।
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলায় ২০ হাজার ৯২৩টি, বুড়িচংয়ে ১৮ হাজার ৭৯৪টি, বরুড়ায় ১৭ হাজার ৬৪৭টি, চৌদ্দগ্রামে ১৬ হাজার ৯০৮টি, কুমিল্লা সদর দক্ষিণে ১৪ হাজার ৫১৭টি এবং মেঘনা উপজেলায় ৮ হাজার ৭৩২টি পশু প্রস্তুত রয়েছে।
স্থানীয় চাহিদার তুলনায় এসব পশুর সংখ্যা পর্যাপ্ত বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কুমিল্লা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সামছুল আলম বলেন, “কুমিল্লায় এ বছর কোরবানির পশুর সংকট নেই। খামারিদের উৎসাহ, সরকারি সহযোগিতা এবং নিয়মিত তদারকির কারণে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পশু উৎপাদন বেড়েছে।
“অসুস্থ কিংবা ক্ষতিকর উপায়ে মোটাতাজাকৃত পশু যাতে বাজারে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকবে। ১৭টি উপজেলায় ৪৩২টি হাটে ৮৪টি ভেটেরিনারি টিম থাকবে।”
কুমিল্লা-১০ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর আলী এজাজ বলেন, “আমাদের আওতাধীন ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় গরু পাচারের তেমন প্রবণতা নাই।
“তারপরও ঈদ উপলক্ষে দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সীমান্ত এলাকায় এই নজরদারি বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।”
কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে এবার অবৈধভাবে বিদেশি পশু প্রবেশ করতে পারবে না বলে আশা প্রকাশ করেছেন এ বিজিবি কর্মকর্তা।