Published : 22 Apr 2026, 05:55 PM
ঢাকার সাভার ও এর আশপাশে শিল্পাঞ্চল এলাকায় লোডশেডিং এবং তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন চরম সংকটের মুখে পড়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দিনের অর্ধেকেরও বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষ যেমন অতিষ্ঠ, তেমনি দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক, চামড়াসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানার চাকা ঘোরা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সাভার পৌরসভা ও আশপাশের ইউনিয়নগুলোতে দিনে-রাতে গড়ে ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। ভ্যাপসা গরমে ঘরে টেকা দায় হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও বয়স্কদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, লোডশেডিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই।
সাভার পৌর এলাকার বাসিন্দা হামিদ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ যায়। রাতে ঘুমানো যায় না, দিনে কাজ করা যায় না। আমরা এক অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্যে আছি।”
তবে পল্লী বিদ্যুৎ বলছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম হওয়ায় এই লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় তারা নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছেন না।
দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পকারখানাগুলো বর্তমানে দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে। একদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি, অন্যদিকে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও ডিজেলের তীব্র সংকট উৎপাদন ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির-৩ এর উপ-মহাব্যবস্থাপক সোলায়মান হোসেন বলছেন, “আমাদের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর অধীনে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। আমাদের এখানে প্রয়োজন ৩০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, কিন্তু আমরা পাচ্ছি ১৮৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
“বিদ্যুৎ না থাকলে আপনারা যেমন গরমে রাতে ঘুমাতে পারেন না, তেমনি গ্রাহকদের চাপে রাতে আমাদেরও ঘুম হয় না।”
কবে নাগাদ বিদ্যুতের এই সংকট দূর হবে, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। তবে জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি হলে দ্রুতই এ সংকট কেটে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
নিডেল স্টিচ কম্পোজিট লিমিটেডের পরিচালক দেলোয়ার হোসেন বলেন, “বিদ্যুৎ দুই ঘণ্টা পরপর ৪০ মিনিট ৫০ মিনিটের জন্য আসে। আবার কখনো পাঁচ মিনিট থাকার পর আবার দুই ঘণ্টার জন্য লোডশেডিং হয়। এতে আমাদের কারখানার উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুতের কারণে প্রায়ই কারখানা ছুটি দিয়ে দিতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের (ডিজেল) কারণে জেনারেটরও ঠিকমতো চালাতে পারছি না।
“আমাদের ছোট কারখানা তাতেই পামগুলো থেকে ঠিকমতো ডিজেল দিচ্ছে না; বড় বড় কারখানাগুলো পম্পের সঙ্গে কনট্রাক্ট করে সব ডিজেল নিয়ে যায়। বিদ্যুত ও জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।”
একাধিক চামড়া ও তৈরি পোশাক কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যুতের অভাবে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ৩০-৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। নির্দিষ্ট সময়ে বিদেশী বায়ারদের পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেনারেটর দিয়ে কারখানা চালাতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। আবার সব সময় ডিজেলও পাওয়া যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সাভারের একমাত্র ট্যানারি শিল্পনগরীতে চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না, যা চামড়া শিল্পে অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক কারখানায় জেনারেটর চালানো হলেও ডিজেল সংকটে জেনারেটরও চালানো যাচ্ছে না।
সালমা ট্যানারির মালিক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, “রোজার ঈদের পর আমাদের যেসব চামড়া ট্যানারিতে এসেছে, সেসবও আমরা সংরক্ষণ করতে পারছি না। দিনের অর্ধেক সময়ই বিদ্যুৎ থাকছে না; এক ঘণ্টা থাকলে আবার এক-দেড় ঘণ্টা নাই।”
বিদ্যুৎ সংকটে সাভারের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন। ফ্রিজে রাখা পচনশীল দ্রব্য নষ্ট হচ্ছে এবং ইলেকট্রনিক নির্ভর ব্যবসাগুলো বন্ধ হওয়ার পথে।
ছোট ও মাঝারি কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যদি দ্রুত এই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যার সমাধান না করা হয়, তবে অনেক কারখানা লে-অফ ঘোষণা করতে বাধ্য হবে। এতে করে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে যেসব কারখানায় নিজস্ব সোলার পাওয়ার সিস্টেম রয়েছে, তারা এই সংকট কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পারছে।
তবে ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ডিইপিজেড) মধ্যে যেসব পোশাক কারখানা রয়েছে, সেগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তুলনামূলকভাবে কম বলে জানা গেছে।
ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর মহাব্যবস্থাপক আকতারুজ্জামান লস্কর বলেন, “ভয়াবহ লোডশেডিং এ জনজীবন যেমন অতিষ্ট হয়ে পড়েছে তেমনি পোশাক কারখানার ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে লোডশেডিং এর পেছনে আমাদের কোনো হাত নেই। আমরা চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ পাচ্ছি।
“আমাদের সর্বমোট চাহিদা রয়েছে ৪৭৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিন্তু আমরা পাচ্ছি ৩০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ; যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এর মধ্যে আবার সামিট পাওয়ার প্লান্ট সরবরাহ করছে ২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।”
কিছু কিছু কারখানা বিকল্পভাবে গ্যাস জেনারেটর এবং ডিজেল জেনারেটর দিয়ে তাদের উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে বলে জানান তিনি।