Published : 23 Apr 2026, 02:29 PM
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ডিম পাহাড় এলাকায় একটি ‘পাড়াবনে’ অবৈধভাবে গাছ কাটার খবর পেয়ে অভিযান চালিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
বুধবার সকালে ডিম পাহাড়ের ২৩ কিলো নামের এলাকায় আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনজুর আলমের নেতৃত্বে এ অভিযান চালানো হয়।
অভিযান চলাকালে বনের ভেতরে শ্রমিকদের থাকার জন্য তৈরি ঝুপড়ি ঘর এবং একটি মাটি কাটার যন্ত্র (এক্সক্যাভেটর) নষ্ট করে দেওয়া হয়েছ। প্রায় ৩০০ ঘনফুট বনজ কাঠ জব্দ করা হয়েছে।
ইউএনও মো. মনজুর আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অভিযানের সময় অনেক কাঠ দেখেছি। কিছু গাছ কাটা অবস্থায় আছে; এখনও নিয়ে যেতে পারেনি। মূল কাঠগুলো তারা চিরাই করে নিয়ে গেছে। যেগুলো হয়তো কম দামের ছিল সেগুলো ফেলে রাখা হয়েছিল। একটি এক্সক্যাভেটর পাওয়া গেছে যেটি দিয়ে নতুন রাস্তা তৈরি করা হচ্ছিল।”
“ওটা মোটামুটি এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে দেওয়া হয়েছে যে, আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা খরচ না করলে এটি আর চালু করা সম্ভব হবে না। এর তেলের ট্যাংকে মাটি ও পাথর ঢুকিয়ে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এক্সক্যাভেটরের যতগুলো জয়েন্ট ছিল সেগুলো হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে যাতে সহজে আবার লাগাতে না পারে।”
আলীকদম-থানচি সড়কে ডিম পাহাড়ে ১৭ কিলো এলাকায় ‘ব্যাঙঝিরি’ নামে স্থানীয়দের একটি ‘পাড়াবন’ থেকে দুই বছর ধরে অবৈধভাবে গাছ কাটা কাটা হচ্ছে। কাটার পর কাঠগুলো নিয়ে যাওয়া হয় ২৩ কিলো এলাকা পয়েন্ট দিয়ে। কাঠ টানার জন্য পাহাড় কেটে রাস্তাও তৈরি করা হয়েছে।
ঝিরির ওপর গাড়ি চলাচল করায় এবং গোটা ঝিরি থেকে গাছ কাটায় বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি পাড়ার খাবার পানির উৎসও।
পাহাড়িদের কোনো একটি পাড়ায় তার আশপাশে অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চলে একটি নির্দিষ্ট বড় এলাকা নিয়ে বনভূমি সংরক্ষণ করে রাখা হয়। মৌজা প্রধান হেডম্যান ও গ্রামপ্রধান কারবারীরা এটাকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন।

নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদের দ্বারা পরিচালিত এই সংরক্ষিত বনকে পাড়াবাসীরা বলে থাকেন ‘পাড়াবন’।
ইউএনও মনজুর আলম বলছেন, “ঘটনাস্থলে একটি লেবার শেড পাওয়া গেলেও লোকজন কাউকে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ওখানে সকালেও লোকজন ছিল। আমরা যে সেখানে যাচ্ছি যে কোনোভাবে হোক হয়ত সেটা জেনে গেছে।
তিনি বলেন, “এখন বন আইনে নিয়মিত মামলা করা হবে। বন বিভাগের সঙ্গে কথা হয়েছে; অভিযানে তারাও গিয়েছিল।
“দুইটা করাতকালের নাম পাওয়া গেছে। কাঠগুলো সেখানে আসে। একটা ফারুক নামে একজনের করাতকল, আরেকটা পানবাজারে। ওইগুলোতে অভিযান চালানো হবে।”
পাড়াবন অনেকের কাছে ‘পাড়াবাম’ ও ‘রিজার্ভ বন’ নামেও পরিচিত। এই পাড়াবনের প্রাকৃতিক সম্পদগুলো সামাজিকভাবে ব্যবহার করা হয়। তাই এই পাড়াবনের মালিকানা সম্পূর্ণ সামাজিক।
পাড়াবন সামাজিক মালিকানা হলেও বড় গাছ কাটার জন্য বনবিভাগের অনুমতি লাগে। বনবিভাগের অনুমতি ছাড়া কেউ বড় গাছ কাটার নিয়ম নেই।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০২৪ সালের শেষ থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত এই ‘পাড়াবনে’ ঢুকে বড় বড় গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন সময় তারা কয়েক দফা বাধা দিয়েও থামাতে পারেননি গাছ কাটা।
কেবল বর্ষাকালের কয়েক মাস ছাড়া প্রতিনিয়ত নির্বিঘ্নে গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এমনকি গাছ টানতে ঝিরির উপর ট্রাক চলাচল করায় এবং গাছের স্তূপ করার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি পাড়ার খাবার পানির উৎসও।
পাড়াবাসীর ভাষ্য, এ বছর জানুয়ারির দিকে প্রথমে আলীকদম সেনা জোন ও পরে উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
লাইরু ম্রো বলেন, “২০২৪ সালে শেষের দিকে যখন গাছ কাটা শুরু করে তখন আমরা বাধা দিয়েছিলাম। কোনো কাজ হয়নি। এ বছর শুরুর দিকে একইভাবে বাধা দিতে গিয়েছিলাম। তারা একজন ম্রোর কাছ থেকে বাগান কেনার কথা বলে। অথচ এটা একটা সংরক্ষণ করে রাখা পাড়াবন।”
তিনি বলেন, “উপায় না পেয়ে এ বছর জানুয়ারি দিকে প্রথমে আলীকদম সেনা জোন এবং পরে ইউএনও কার্যালয়ে অভিযোগ দিয়েছিলাম।

“সেনা জোন থেকে তখন আমাদেরকে বলা হয়েছিল, একমাস পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর ইউএনও কার্যালয় থেকে পুলিশ এবং বনবিভাগের সহযোগিতা নিতে পরামর্শ দিয়েছিল।”
কিন্তু গাছ কাটা আর বন্ধ হয়নি। পরে উপায় না পেয়ে তারা গাছ কাটার ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেন বলে জানান তিনি।
অবশেষে বুধবার সকালে পুলিশ ও বনবিভাগের লোকজন নিয়ে অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন।
অভিযানের বিষয়ে লামা বন বিভাগের তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম বলেন, “বুধবার দিনব্যাপী চলা এই অভিযানে ৩০০ ঘনফুট বনজ কাঠ জব্দ করা হয়েছে। অবৈধভাবে পাহাড় কাটায় ব্যবহৃত একটা এক্সক্যাভেটরও অকেজো করে দেওয়া হয়েছে।”
পাশপাশি অবৈধ করাতকলগুলোতে অভিযান চালিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।