Published : 25 Jun 2026, 12:18 AM
“আমরা নদী ভাঙা লোক, পাটনাদার হিসেবে (ভাড়া) পরের জাইগায় রইছি। আমাদের জায়গা জাগছে, মনে করছি অহনে বাড়ি করমু। সরকারের কাছে আমাগো দাবি- এই ড্রেজারডা যেন ওঠায় নেয়। নইলে আমাগো আরও ক্ষতি অইয়্যা যাইব, আমরা ঘরবাড়ি করতে পারমু না।”
বুধবার দুপুরে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার চরমানাইর ইউনিয়নের আমির-খাঁ কান্দি গ্রামে নদের ভাঙন কবলিত পাড়ে দাঁড়িয়ে মানববন্ধনে দুঃখ ভরা মনে কথাগুলো বলেন নুরুন্নাহার বেগম।
আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনে বসতঘর, জায়গা-জমি হারিয়ে পরিবার নিয়ে অন্যের বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে ভাড়ায় বসবাস করছেন ৫২ বছরের এই বিধবা।
নদীতে জেগে ওঠা জায়গায় স্থানীয় এক বিএনপি নেতা অবৈধভাবে ড্রেজার বসানোয় ভাঙন তীব্র হয়েছে বলে জানান ভুক্তভোগী এই নারী।
নদের ভাঙনকবলিত পাড়ে মানববন্ধনে গ্রামটির অর্ধশত নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করেন।
তাদের অভিযোগ, সম্প্রতি নদটির আমির-খাঁ এলাকায় অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়েছেন সদরপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক খাঁ। বিষয়টি প্রশাসনকে অবগত করা হলেও ড্রেজার তুলে নেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি করে বালু উত্তোলনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তারা। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা জানান, চরমানাইর ইউনিয়নের ৯০ শতাংশ এলাকা পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদ বেষ্টিত। এলাকাটিতে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে। যুগ যুগ ধরে নদটির ভাঙনের শিকার হয়েছেন এলাকাটির অসংখ্য পরিবার। নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে প্রায় হাজার একর জমি।
ভাঙনের মুখে বসতঘর হারিয়ে অন্যপাড়ে নতুন করে বসতি স্থাপন করলেও চলতি বছরে সেইপাড়ও ভাঙনের মুখে পড়েছেন।
ভাঙনরোধে স্থানীয় সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ওই এলাকার বাসিন্দা মো. ফরহাদ হোসেন।
তিনি বলেন, “আড়িয়াল খাঁ নদের কারণে দীর্ঘদিন যাবৎ বাড়িঘর ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। নতুন করে পাড়টি জেগে উঠেছে, মানুষ নতুন করে ঘরবাড়ি করার চিন্তা ভাবনা করছেন। কিন্তু বর্তমানে এই এলাকার প্রভাবশালী এক ব্যক্তির নেতৃত্বে ড্রেজার বসানো হয়েছে।

“এই ড্রেজার দিয়ে বালু তুললে আর ঘরবাড়ি তোলা হবে না। তাছাড়া বসতি স্থাপন করা পাড়ও তীব্র ভাঙনের মুখে পড়বে।”
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্কুল শিক্ষক মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, “এমনেই নদী ভাঙতেছে, তার ওপর আবার ড্রেজার বসিয়ে কূমের মতো সৃষ্টি হয়ে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়ে যাবে।
“আমাদের জমিও আর জাগবে না; এলাকার লোকজন জমিজমা আর বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাবে। তাই আমরা চাই- অতিদ্রুত এই ড্রেজার সরিয়ে নেওয়া হোক।”
বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক খাঁ দাবি, নিজস্ব জায়গায় স্থাপিত প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয় সম্প্রতি ঝড়ে ভেঙে গেছে। নতুন করে দুটি ঘর করা হয়েছে। সেখানে ভিটি ভরাট করার জন্য বালু উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ইউএনওকে অবগত করার দাবি করেছেন তিনি।
ড্রেজার বসানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি দাবি করে সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ শাওন সাংবাদিকদের বলেন, “ড্রেজারের বসানোর বিষয়ে মৌখিকভাবে জেনেছি। এর মধ্যে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে বাধা দিতে বলেছি।
“নিজ উদ্যোগে যদি ড্রেজার সরিয়ে না নেয় তাহলে, পরবর্তীতে আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব।”