Published : 25 Jun 2025, 07:07 PM
কুমিল্লায় সরকারি হিসাবে ডেঙ্গুর সংক্রমণের তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
তারা বলছেন, সরকারিভাবে সারা জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের যে সংখ্যা দেওয়া হয়েছে; শুধু দাউদকান্দি উপজেলাতেই আক্রান্তের সংখ্যা এর চেয়ে অন্তত পাঁচ গুণ বেশি। মানুষ প্রকৃত তথ্য পেলে আরও বেশি সতর্ক হতে পারত।
স্বাস্থ্য বিভাগ অবশ্য এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়ে বলছে, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে শনাক্ত হওয়া ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তারা নথিভুক্ত করতে পারছেন না।
বুধবার কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ফেইসবুক পেইজে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত জেলায় সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা মাত্র ৩০৪ জন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করে শনাক্ত হয়েছে ২৭৭ জন এবং বাকিরা শনাক্ত হয়েছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আক্রান্তদের মধ্যে ২৭২ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন।

অথচ দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলছেন, শুধু জুন মাসের ২৫ দিনে প্রায় এক হাজার ৮৫০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন এক হাজার ৮৫০ জন। ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ছয়জন; এর মধ্যে চারজন নারী এবং দুজন পুরুষ।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে যারা মারা গেছেন তারা হলেন- ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দৌলতদী গ্রামের খোকন মিয়া (৬৫), ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নাগের কান্দি গ্রামের নুরুল আমিন (৫৫), মারুকা ইউনিয়নের লিমা আক্তার (২৪), দোনারচর গ্রামের সালমা বেগম (৫৬), শাহীনূর আক্তার (২৪) এবং সবজিকান্দি গ্রামের জ্যোস্না বেগম (৬০)।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন আলী নূর মোহাম্মদ বশির আহমেদ বলেন, “আমরা শুধু কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিভিন্ন সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্যগুলো সংগ্রহ ও প্রকাশ করছি। আমরা জানি, দাউদকান্দি উপজেলায় দেড় হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে।
“তারা বেশিরভাগই বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে শনাক্ত হয়েছে। সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ায় এই গরমিল হয়েছে। আমরা সেটি রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (আইইডিসিআর) জানিয়েছি।”

দাউদকান্দি পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাহাপাড়া এলাকার বাসিন্দা সংবাদকর্মী লিটন সরকার বাদল বলেন, “মে মাসের শুরুতে যখন সংক্রমণ বেশি হচ্ছে ধারণা করা হয়, তখন কেউ সচেতন হয়নি। এর মধ্যে একবার বৃষ্টি হয়ে আবার অনেকদিন বন্ধ থাকায় বদ্ধ ডোবা-নালায় বৃষ্টির পানি জমে এডিস মশার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। জুনের শুরুতে ঈদের পর পর আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।”
তিনি বলেন, “সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত পৌরসভার দোনারচর এবং সাহাপাড়ায়। স্বাস্থ্যবিভাগ শুরু থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সাধারণ মানুষকে জানাতে পারেনি। যে কারণে সংক্রমণ সম্পর্কে কারো কোনো ধারণাও ছিল না।”
৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর বিল্লাল হোসেন সুমন বলেন, “আমরা এরই মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণ রোধে পৌর প্রশাসনের সহযোগিতায় কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। তবে এই মুহূর্তে সংক্রমণ বেড়ে গিয়েছে। প্রকৃত তথ্য ও অবস্থা জানা থাকলে আরো আগে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া যেত।”
দাউদকান্দি পৌর বিএনপির সভাপতি নূর মোহাম্মদ সেলিম সরকার বলেন, “স্বাস্থ্য বিভাগের গাফিলতির কারণে দাউদকান্দির ডেঙ্গু সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে আর প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে লাভ কী! উপজেলায় এত এত মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হল অথচ স্বাস্থ্য বিভাগ যে জেলার তথ্য দিচ্ছে তা খুবই অবাস্তব। মানুষ জানতে পারেনি তারা মহামারীতে আক্রান্ত হচ্ছে, তাই সচেতনও হয়নি।”
দাউদকান্দির দায়িত্বপ্রাপ্ত পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রেদওয়ান ইসলাম বলেন, “পৌরসভার পক্ষ থেকে দুটি ওয়ার্ডকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ডেঙ্গু মশার বিস্তার রোধে মশকনিধন কর্মসূচি এবং সচেতনতায় প্রচার চালানো হচ্ছে।”
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আমিরুল কায়সার বলেন, “আমরা দাউদকান্দির ডেঙ্গু সংক্রমিত এলাকাগুলো সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছি। সেখানকার সংক্রমণ কমিয়ে আনতে এবং এডিস মশা নিধনে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করছি, খুব কম সময়ের মধ্যে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে।”
তথ্য সংগ্রহে স্বাস্থ্য বিভাগের অবহেলা এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ হয়েছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, “আমি মনে করি না এখানে কোনো অবহেলা হয়েছে। এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সংক্রমণ কমিয়ে আনা। আমরা সে বিষয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
ডেঙ্গু আক্রান্তের ৯০% দাউদকান্দির দুই ওয়ার্ডে, এক মাসে তিনজনের মৃত্যু