Published : 28 May 2026, 08:29 PM
রাজধানীর পোস্তগোলায় কাঠের আড়তে ট্রাকে মালামাল লোড-আনলোড শ্রমিকের কাজ করতেন মোহাম্মদ সোহাগ। ব্যস্ততার কারণে আগে বাড়ি যাওয়া হয়নি। তাই ঢাকায় ঈদের নামাজ আদায় শেষে স্ত্রী ও ছোট ছেলেকে নিয়ে রওনা হয়েছিলেন গ্রামের বাড়িতে। সেখানে মামাবাড়িতে থেকে তাদের বড় ছেলে পড়াশোনা করে। ছেলের কারণেই পিরোজপুরের গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলেন তারা।
কিন্তু ঈদের আনন্দ তো দূর, গোপালগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় গোটা পরিবারটাই শেষ হয়ে গেছে।
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার কলারদোনিয়া গ্রামের আবু হানিফের ছেলে মোহাম্মদ সোহাগ (৩৬), তার স্ত্রী খাদিজা খাতুন (৩০) আর ছোট ছেলে মো. আরমানের (৬) মরদেহ এখন গোপালগঞ্জ আড়াইশ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে পড়ে আছে।
লাশের সামনে বসে খাদিজার বাবা মোহাম্মদ আব্দুল খালেক আহাজারি করছিলেন, “আমার মেয়ে-জামাইয়ের সংসার শেষ হয়ে গেল। বড় নাতি রহমতুল্লাহ এতিম হয়ে গেল। আমি মেয়ে-জামাই-নাতির এ মৃত্যু সহ্য করতে পারছি না।”
এই বলে তিনি লাশের পাশে গড়াগড়ি যাচ্ছিলেন। অঝোরে কাঁদছিলেন। তার গায়ে ঈদের নতুন সাদা জামা, পরনে নতুন সাদা লুঙ্গি।
পাশে বসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন ছেলে মেহেদি হাসান (৩২)। আরও স্বজনরা ছিলেন। তারাও কান্না থামাতে পারছিলেন না। আহাজারি করছিলেন।
শেষ বিকালে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বাইরে এই দৃশ্য যারা দেখছিলেন, তাদের চোখও ছলছল করছিল। যেন একটি পরিবারের মৃত্যু তাদের ঈদের আনন্দকেও ম্লান করে দিয়েছে।
ঈদের দিন বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোপালগঞ্জ শহরের বেদগ্রামে বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে এই তিনজন ছাড়া আরও দুজন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ বাসযাত্রী।
নিহত অপর দুজন হলেন- মোটরসাইকেল চালক বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার বড়বাড়িয়া গ্রামের শাওন ঢালী (২২) এবং মোটরসাইকেলের যাত্রী একই গ্রামের মাহাবুব শেখের ছেলে এসএসসি পরীক্ষার্থী সোয়েব শেখ (১৬)।
আহতদের মধ্যে অঞ্জনা সিকদার (৩৫), পুর্ণিমা (২৫), মিন্টু (৪০), তামান্না (২২), ফেরদৌস (২৫), রনি (২৩), মনির (৫৫), শান্তা (২১), সাদিয়া (২৭), সজিব (২৫), হৃদয়কে (৩০) গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এ ছাড়া আহত কয়েকজন গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
আব্দুল খালেক বলছিলেন, প্রায় ১৬ বছর আগে একই গ্রামের সোহাগ ও খাদিজার বিয়ে হয়। মেয়ে-জামাই ও নাতি সকালে যখন ঢাকা থেকে রওনা হয় তখনও তার সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি বাড়িতে কোরবানির কাজ করতে করতে বার বার তাদের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলছিলেন। বড় নাতনি রহমত উল্লাহ (১৪) এমনিতেই ঈদের আনন্দে ছিল। কিন্তু বাবা-মা ও ভাই বাড়ি আসছে এতে তার আনন্দ অনেক বেড়ে গিয়েছিল।

“বেলা ১১টার দিকে তাদের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়। তখন তাদের গাড়ি ভাঙ্গা পৌঁছেছিল বলে জানিয়েছিল। তারপর থেকে অনেকবার ফোন দিয়েছি। কিন্তু ফোন ধরেনি। তখন একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম।”
আব্দুল খালেক বলেন, লাশ হাসপাতালে যাওয়ার পর সেখান থেকে ফোন দিয়ে তাদের মৃত্যুর সংবাদ জানানো হয়। তখন তিনি পাগলের মত পিরোজপুরের গ্রামে থেকে হাসপাতালে ছুটে আসেন।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে গোপালগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবর, জেলা প্রশাশক মো. আরিফ-উজ-জামান, পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তারা আহতদের সঙ্গে কথা বলেন। উদ্ধার তৎপরতায় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস কর্মী ও স্থানীয়দের সহায়তা করেন ও নিদের্শনা দেন।
‘বেপরোয়া বাইকটি বাসের নিচে ঢুকে যায়’
যাত্রী মোহাম্মদ জামাল শিকদার বাসটির মাঝামাঝি আসনে বসেছিলেন। তিনি ঢাকা থেকেই উঠেন পিরোজপুর যাবেন বলে। দুর্ঘটনায় তিনিও আহত হয়েছেন।
তার ভাষ্যমতে, “বেদগ্রামে বিপরীত দিক থেকে একটি বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেল ঢেউ দিয়ে দিয়ে আসছিল। কাছাকাছি এসেই সেটি একেবারে গাড়ির নিচে ঢুকে যায়। আর এতে আমাদের বাসের চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। বাসটি রাস্তার ওপরে উল্টে যায়।”

তিনি বলেন, বাসে ৩৫ জনের মত যাত্রী ছিল। সবাই কমবেশি আহত হয়েছে। সড়কটি দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে ওঠেছে।
গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ বলেন, পিরোজপুরগামী দোলা পরিবহনের বাসটি রাস্তায় উল্টে যায় আর মোটরসাইকেলটি দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। সোহাগ, খাদিজাসহ দুই মোটরসাইকেল আরোহী ঘটনাস্থলেই মারা যান। আর ছয় বছরের শিশু আরমান হাসপাতালে আনার পর মারা গেছে।
বেপরোয়া গতি, মাত্রাতিরিক্ত ওভারটেকিংয়ের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানান পুলিশ সুপার।
সোয়েব যাচ্ছিলেন কুম্ভ মেলায়
হাসপাতালে নিহত দুই মোটরসাইকেল আরোহীর স্বজনরাও এসেছিলেন মরদেহ নিতে। তাদের সঙ্গে আসেন নিহত সোয়েব শেখের বন্ধু সাহারুল ইসলাম।
তিনি বলছিলেন, মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ি গ্রামে গনেশ পাগলের কুম্ভ মেলায় যাচ্ছিলেন সোয়েব ও শাওন। তারা ১১টার দিকে চিতলমারীর বড়বাড়িয়া গ্রাম থেকে মোটরসাইকেলে করে রওনা দেন। পথেই দুজনের প্রাণ গেল, মেলায় আর তারা যেতে পারেননি।
গোপালগঞ্জ জেলার ভাটিয়াপাড়া হাইওয়ে থানার এসআই নৃপেন কুমার দাস বলেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
গোপালগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবর বলেছেন, “দুর্ঘটনাপ্রবণ এ সড়ককে নিরাপদ করতে আমরা কাজ করব। পুলিশ, সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রশাসনের সমন্বয়ে মিটিং করে আমরা করণীয় ঠিক করব।”