Published : 04 Mar 2026, 09:53 AM
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার নিমসার কাচাবাজারে প্রতিদিন কোটি টাকার শাকসবজি-ফলমূল কেনাবেচা হয়। তবে টোকেনের নামে বাড়তি টাকার লোভে বাজারের নির্ধারিত স্থান নয়; বরং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপরই চলে অধিকাংশ বেচাকেনা।
বারবার উচ্ছেদেও সরে না এই বাজার। অভিযোগ আছে, টোকেনের টাকা থেকেই একটি অংশ ব্যয় হয় প্রশাসন ‘ম্যানেজে’। ফলে যানজটে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়ে মহাসড়কে চলাচলকারীদের।
সোমবার সকালে নিমসার কাচাবাজারের নিমসার জুনাব আলী কলেজ গেইটে গিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাস বে পুরোটা দখল করে আছে আড়তদাররা। দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক, পিকআপ, অটোরিকশা, রিকশা থেকে বিক্রি হচ্ছে আলু, বেগুন, পেঁয়াজসহ নানা সবজি।
বগুড়া থেকে আসা এক আলু ব্যবসায়ী ওবায়দুল (ছদ্মনাম) বলেন, “ক্রেতারা যাকে সামনে আগে পায় তার কাছ থেকেই পণ্য কিনতে চায়। তাই আড়তদাররা ট্রাক থেকে আলু না নামিয়ে হাইওয়ের পাশে ট্রাকে রেখেই বিক্রি করে। প্রতিবার ট্রাক রেখে আলু বিক্রির জন্য ৫০০ টাকা দিতে হয়।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থেকে আসা পাইকারী ব্যবসায়ী আমিনুল বলেন, “আমি অটোরিকশা নিয়ে এসেছি। বাজারে রাখার জায়গা নাই, তাই হাইওয়ের উপরে রেখেছি। ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে।”

তিনি বলেন, “কখনো টাকা দিতে না চাইলে ইজারাদারদের লোকজনের মারধর ও গালাগালির শিকার হতে হয়।”
ব্যবসায়ীরা জানান, নিমসার কাঁচা শাকসবজি-ফলমূল কেনাকাটায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক কেন্দ্র। সারা দেশ থেকে শত শত ট্রাক-পিকআপ দিয়ে কাঁচাপণ্য নিয়ে আসেন আড়তদাররা। আবার ক্রেতারা তা বিভিন্ন যানবাহনে ভর্তি করে তা নিয়ে আশপাশের বিভিন্ন জেলায়।
তবে এজন্য জেলা প্রশাসন থেকে নির্ধারিত জায়গা ইজারা নেওয়া থাকলেও বাজার বসানো হয় মহাসড়কের ওপর।
পরে ‘দৈনিক নিমসার কাচাবাজার খাজনা টোকেন’ দিয়ে ট্রাকপ্রতি ৫০০ এবং পিকআপ, অটোরিকশা ব্যাটারিরিকশা-ভ্যান থেকে মালামালের পরিমাণ ভেদে সর্বনিম্ন ১০০ থেকে ৪০০ টাকা নেওয়া হয়। প্রতিদিন উত্তোলন হয় লক্ষাধিক টাকা। অথচ এই টোকেন শুধু ব্যবহার করার কথা বাজারের ভেতরে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্ধারিত স্থানের চেয়ে মহাসড়কের উপরে বাজার বসানো হলে প্রতিদিন অন্তত দুই শতাধিক অতিরিক্তি যানবাহন থেকে ইজারার নামে টাকা তোলা যায়। এই অতিরিক্ত টাকার লোভেই মহাসড়ক দখল করে বসে বাজার।
নাসির উদ্দিন নামে এক আড়তদার বলেন, “জানি মহাসড়কে বসা অবৈধ। কিন্তু অনেকেই আছে পণ্য আনলোড না করে গাড়িতে রেখেই বিক্রি করে। যে কারণে তারা বাজারের বাইরে খাজনার নামে টাকা দিয়ে রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে পণ্য বিক্রি করে চলে যায়। অতিরিক্ত টাকা দিয়ে হলেও সুবিধার জন্য এই প্রক্রিয়া চলে।”

আলমগীর কবির নামে এক আড়তদার বলেন, “দূর দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা ট্রাকে করে যে পণ্য আনেন তা বাজারের ভেতরে নিয়ে আনলোড না করেই বিক্রি করা শুরু করেন। যে কারণে তাদের রাস্তার উপরে থেকে যেতে বাড়তি টাকা দিতে হয়।
“ইজারাদারের লোকজন সেখান থেকে খাজনা টোকেনের নামেই টাকা তোলে। বাজারে যদি তিন শত যানবাহন ঢুকতে পারে তাহলে বাইরে আরও অন্তত ২০০ যানবাহন থেকে খাজনার টোকেন দিয়ে টাকা তোলা হয়। বাজারের বাইরে থেকে তোলা টাকাটি অতিরিক্ত টাকা।”
বুড়িচং উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বাংলা সন ধরে এক বছরের জন্য নিমসার বাজার পাঁচ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন হুমায়ুন কবির। এই চৈত্র মাসে শেষ হবে তার মেয়াদ। বর্তমানে তিনি এবং তার লোকজনই এ বাজার থেকে খাজনা আদায় করেন।
তবে ইজারাদার পরিবর্তন হলেও পরিবর্তন হয় না বাজারের চিত্র। অবৈধ টাকার লোভে মহসড়ক বিশৃঙ্খল করেই বসানো হয় দৈনিক বাজার।
এ বিষয়ে জানতে বাজার ইজারাদার হুমায়ুন কবিরের মোবাইলে বার বার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
তবে বাজার ইজারা দেওয়া বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তানভীর হোসেন বলেন, “আইনিভাবে বলতে গেলে কেউ মহাসড়কে বাজার বসাতে পারবেন না এবং সেখান থেকে কোনো টাকাও তুলতে পারবেন না। ক্রেতা-বিক্রেতাদের চিন্তা-ভাবনা পরিবর্তন না হলে এই দশা প্রতিদিনই হবে।”

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, “বাজারের নির্ধারিত জায়গার বাইরে ইজারা তোলার সুযোগ নাই। মহাসড়কের উপর যদি কেউ বাজার বসিয়ে টাকা তোলে সেটি অন্যায়। আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব।”
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, “কাছাকাছি সময়ে আমরা বেশ কয়েকবার নিমসার বাজার উচ্ছেদ করেছি। কিন্তু তারা আবার বসে যায়। মানুষ এখানে সচেতন না হলে আমরা যতই চেষ্টা করি- লাভ হবে না।
“আর ইজারার নামে যে টাকা মহাসড়ক থেকে উঠানো হয় তা বেআইনি। সড়ক বিভাগের কেউ এই অবৈধ টাকার অংশীদার নয়, কেউ বলে থাকলে সেটি মিথ্যা।”
এমনকি সম্প্রতি সড়ক থেকে ইজারার নামে চাঁদা তোলার অভিযোগে ১১ জনকে গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ। তবুও বন্ধ হয়নি এমন কেনাবেচা।
হাইওয়ে কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান বলেন, “ঈদ উপলক্ষে মহাসড়কে যান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে আমরা ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। সব বাজার এলাকাগুলোতেই থাকবে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন।
“নিমসার এলাকায় সড়কের উপর যে বাজারে এসেছে- তার দেখভাল করবে উপজেলা প্রশাসন। সাধারণত ভোররাত থেকে সকালবেলা পর্যন্ত নিমসার বাজার এলাকায় ভিড় থাকে। আমরা চেষ্টা করি, সেখানে পুলিশ মোতায়েন রেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে।
“তবে আমাদেরকে নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আমরা সেটি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেব।”