Published : 10 Feb 2026, 12:53 PM
জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গাজীপুরের কারখানায় ছুটি ঘোষণা করার পর অনেক শ্রমজীবী মানুষ বাড়ির পথে ছুটতে শুরু করেছেন।
একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাড়ির পথে রওনা হওয়ায় মঙ্গলবার সকাল থেকে গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কয়েক গুণ বেড়েছে।
ঘরমুখো মানুষের ঢল নামায় সোমবার রাত থেকেই এ দুই মহাসড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে বিক্ষুব্ধ যাত্রীরা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে নামলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
থেমে থেমে যানজট তৈরি হওয়ায় ঘরমুখোদের পাশাপাশি কর্মস্থলগামী মানুষরাও চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে যাত্রীরা যানবাহন থামিয়ে বিক্ষোভ ও অবরোধ করছেন।
এর আধা ঘণ্টা পর ঢাকা-টাঙ্গাইল ভোগরা বাইপাস পেয়ারা বাগান বাস কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, অসংখ্য যাত্রী বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন; যাদের প্রায় সবাই উত্তরবঙ্গের যাত্রী।

বাসন থানার ওসি হারুন অর রশিদ বলছিলেন, সোমবার বিকাল থেকে সড়কে যাত্রীবাহী বাসের তুলনায় যাত্রীদের সংখ্যা বেশি ছিল। মঙ্গলবার সকালে একই চিত্র রয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ময়মনসিংহগামী যাত্রী আব্দুল মতিনকে বাসের জন্য অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেল। অতিরিক্ত ভাড়ার আদায়ের অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, “সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বাসে ওঠার অপেক্ষা আছি। কিন্তু পরিবহন শ্রমিকরা দেড়শ টাকার ভাড়া ৮০০ টাকা চাচ্ছে। এ তো রীতিমত হয়রানি। এই কারণেই যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হওয়ায় তারা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভে নেমেছে।”
একই এলাকায় নবীনগরগামী যাত্রী মো. সোলায়মান বলছিলেন, তিনি স্থানীয় স্টারলাইট সোয়য়েটার কারখানার শ্রমিক। ভোটের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জ যাওয়ার জন্য স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু পরিবহনের শ্রমিকরা ৭০ টাকার ভাড়া ৫০০ টাকা চাচ্ছে। এ অবস্থা দেখার জন্য কেউ নেই তাই যাত্রীরা বিক্ষোভ অবরোধ করেছে।
তিনি বলেন, “অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি। অবরোধের কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। যাত্রীরা হেঁটে বা বিকল্পভাবে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।”

বিক্ষোভের কারণে সকালে কলেজের পরীক্ষার ডিউটিতে যাওয়ার পথে যানবাহন না পেয়ে বিপাকে পড়েন সদরের ভাওয়াল মির্জাপুর কলেজের প্রভাষক মো. হাবিবুল্লাহ।
তিনি বলছিলেন, “কলেজের পরীক্ষার ডিউতে যাব। চান্দনা চৌরাস্তা থেকে কোনো গাড়ি পাচ্ছি না। এদিকে ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে সাধারণ যাত্রীরা গাছের ডাল মহাসড়কে ফেলে বিক্ষোভ ও অবরোধ তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে ভালো ভোগান্তিতে পরেছি।”
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে কলকারখানা গুলোতে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে চারদিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে। অনেকে ছুটির আগের দিন সোমবার বিকাল থেকেই নিজ নিজ গ্রামের যেতে শুরু করে।
এ অবস্থায় সন্ধ্যার পর ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গাড়ি ও মানুষের চাপ বাড়তে থাকলে শুরু হয় যানজট। এ সুযোগে বিভিন্ন পরিবহনের গাড়ি ভাড়া কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়ায় যাত্রীরা মহাসড়কে অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন। এতে যানজটও দীর্ঘ হতে শুরু করে। মধ্যরাতের পর অবরোধ তুলে নিলেও যানজট লেগে থাকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত।
সকালে আবার ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়লে আবারও যানসৃষ্টি হয়। তখনও বিভিন্ন পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করলে যাত্রীরা আবার মহাসড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন।
এর আগে সোমবার রাতে গাজীপুর নগরীর টঙ্গী, বোর্ডবাজার, ভোগরা বাইপাস, চান্দনা চৌরাস্তা, কোনাবাড়ি, কালিয়াকৈর চন্দ্রা মোড়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এবং বাসস্ট্যান্ডে অবস্থান শ্রমজীবী মানুষের ভিড় দেখা যায়।
রাত ১১টার দিকে ভোগরা বাইপাস মোড়ের পেয়ারাবাগান বাস কাউন্টারে গিয়ে শত শত যাত্রীকে গাড়ির অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেলেও সে তুলনায় বাসের সংখ্যা ছিল খুবই কম।

রংপুরের যাত্রী আকরাম হোসেন বলেন, বাস না পাওয়ায় তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। মাঝেমধ্যে কয়েকটি বাস এলো তারা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন, এতে যাত্রীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়।
এ সময় কিছু যাত্রীকে ছোট পিকআপ ভ্যানে করে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যেতে দেখা গেছে।
ইসমাইল হোসেন নামের আরেক যাত্রী বলছিলেন, “বাসের ভাড়া বেশি হওয়ায় কম পয়সায় পিকআপে করে রংপুর যাচ্ছি।”
যাত্রী কামাল হোসেন বলেন, “মূলত ভোট দেওয়ার উদ্দেশ্যেই গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা যাচ্ছি। পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে বেড়ানোও হয়ে যাবে।”
অভিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গাজী জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সদস্য আবদুল আউয়াল বলেন, নির্বাচনের জন্য অনেক বাস পুলিশ রিকুইজিশন করেছে। যার কারণে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা অনেক কম; রাস্তায় যানজট।
তবে গাড়ি গন্তব্য গিয়ে আবার ফেরার পথে আর তেমন যাত্রী পাওয়া যাবে না বলে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার কথা তিনি স্বীকার করেন।
গাজীপুর মহানগর পুলিশ ট্রাফিকের এডিসি অমৃত সূত্রধর বলছেন, কয়েকটি গার্মেন্টসের শ্রমিকরা বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তা অবরোধ করার ফলে সোমবার বিকাল থেকেই মহাসড়কে গুলোতে যানজট সৃষ্টি হয়। মঙ্গলবার সকালেও গাড়ির তুলনায় যাত্রী সংখ্যা বেশি থাকায় সংকট দেখা দিয়েছে।
অভিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, “বিচ্ছিন্নভাবে ভাড়া বেশি নেওয়ার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”