Published : 03 Jul 2025, 07:09 PM
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় বাড়িতে এসে হামলা চালিয়ে মা ও ছেলেমেয়েকে হত্যার ঘটনা পূর্বপরিকল্পনা মাফিক করা হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, একটি মোবাইল চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে এর সূত্রপাত এবং বুধবার সন্ধ্যায় পরিকল্পনা করে বৃহস্পতিবার সকালে হামলা চালিয়ে তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনার পর থেকে এলাকায় এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। ফলে কেউ প্রকাশ্যে এ নিয়ে কোনো কথাও বলতে চান না।
কেউ কেউ অবশ্য বলেছেন, পরিবারটির বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরেই মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলাও রয়েছে। তারা এলাকায় বেশ প্রভাবশালী। এ থেকেও এ ঘটনা ঘটতে পারে।
পুলিশ জানায়, সকাল ৯টার দিকে উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানার কড়ইবাড়ী গ্রামে একটি বাড়িতে মাদক কারবার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এনে কিছু লোক হামলা চালায়।
হামলায় কড়ইবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা খলিলুর রহমানের স্ত্রী রোকসানা বেগম ওরফে রুবি (৫৩), তার ছেলে রাসেল মিয়া (৩৫) ও মেয়ে তাসপিয়া আক্তার ওরফে জোনাকি (২৯) ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
আহত হয়েছেন রুবির মেয়ে রুমা আক্তার (২৮)। তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
দুপুরে কড়ইবাড়ী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এক ধরনের সুনসান নিরবতা। বাড়ি ঘিরে উৎসুক মানুষ আছে, কিন্তু কেউ কথা বলছেন না। কড়ইবাড়ী একটি বাসস্ট্যান্ড। রুবির বাড়িটি কড়ইবাড়ী বাসস্ট্যান্ডের কেন্দ্রস্থলে। এর আশপাশে বেশ কিছু দোকানপাটও রয়েছে। এটি মুরাদনগর-নবীনগর আঞ্চলিক সড়কের মধ্যে পড়েছে। এই সড়ক ধরেই কুমিল্লা থেকে মানুষজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাতায়াত করেন।
রুবির বাড়ির আশপাশের প্রায় সব দোকানপাট বন্ধ। বাড়ির সামনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্য ও উৎসুক মানুষ থাকলেও রাস্তায় লোকজনের চলাচল কম। কয়েকজনকে জিজ্ঞাস করলে তারা জানান যে, তারা এখানকার লোক নন। ঘটনা শুনে দেখতে এসেছেন। কেউ নিজেদের স্থানীয় হিসেবে পরিচয় দিতে চাচ্ছিলেন না। হয়তো পুলিশি ঝামেলা এড়াতে।
সড়ক-লাগোয়া রুবির তিনতলা বাড়ি। বাড়ির গেইট দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে ছোপছোপ রক্তের দাগ। একজন জানালেন, রুবির ছেলে রাসেলকে এখানে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
গেইট পেরিয়ে তিনতলা বাড়ির পেছনের উঠান। সেখানেও রক্তের দাগ। উঠানেই একসঙ্গে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে রুবি ও তার মেয়ে জোনাকিকে।
ঘরের ভেতরে ঢুকে দেখা গেছে, দোতলা পর্যন্ত ভাঙচুর করা হয়েছে। দোতলার জানালার প্রায় সব কাঁচ ভাঙা।
বাসাতেই কথা হয় নিহত রাসেলের স্ত্রী মীম আক্তারের সঙ্গে। তিনি তার পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে মারুফ নামে এক ছেলে মোবাইল চুরির ঘটনায় ধরা পড়ে। সে তাদের পরিচিত। তখন তাকে ছাড়িয়ে আনতে যান তার শাশুড়ি রুবি। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দা বাছিরের সঙ্গে রুবির বাগবিতণ্ডা হয়। এ সময় সেখানে জনপ্রতিনিধিও ছিলেন। তাদের সঙ্গেও রুবির মনোমালিন্য হয়।

মীম আক্তারের দাবি, “এখান থেকেই সূত্রপাত। বুধবার সন্ধ্যায় প্রতিপক্ষের লোকজন এই হামলার পরিকল্পনা করে। আর সকালবেলায় তারা হামলা চালায়।
“আমাদের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর চালানো হয়েছে। কিন্তু এভাবে যে তিনজন মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হবে সেটা বুঝতে পারিনি।”
যদিও কড়ইবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা মোস্তফা আহমেদ বলেন, দীর্ঘ ৪০ বছর যাবত রুবি এই এলাকায় মাদক ব্যবসা করে আসছে। তার পরিবারও স্থানীয় মানুষকে মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ক্ষতি করে আসছিল।
“এরই জের ধরে গ্রামবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের উপর হামলা করে। এ সময় বাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং গণপিটুনিতে তিনজনের মৃত্যু হয়।”
বাঙ্গরা বাজার থানার ওসি মাহফুজুর রহমানও পরিবারটির মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার কথা বলেছেন।
এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার নাজির আহমেদ খান।
এ সময় তিনি বলেন, “পুলিশ তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। কেউ এলাকায় কোনো অপরাধ কর্মকাণ্ড সংঘটিত করলে জনগণের উচিত তাকে পুলিশে সোপর্দ করা। এভাবে আইন হাতে তুলে নেওয়া কাম্য নয়। যারা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।”