Published : 08 Apr 2026, 07:10 PM
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) আয়োজিত একটি সেমিনারকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির ভেতরে মতবিরোধ এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
বুধবার দুপুরে জাকসুর পক্ষ থেকে ৯ এপ্রিল বিকাল ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনের সেমিনার কক্ষে ‘গণভোট অস্বীকার ও অধ্যাদেশ বাতিলের রাজনীতি: সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রে প্রবেশ এবং সংকটের পথে দেশ’ শীর্ষক একটি সেমিনার আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সেমিনারে আলোচক হিসেবে থাকবেন এবি পার্টির সদস্য সচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাবির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকি, ডাকসুর ভিপি ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক আবু সাদিক কায়েম, এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব সাঈফ মোস্তাফিজ, যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান, জাকসুর সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম এবং বিতার্কিক ও অ্যাক্টিভিস্ট জাহিদুল ইসলাম।
তবে এ আয়োজন নিয়ে আপত্তি তুলেছেন জাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) আব্দুর রশিদ জিতু। তিনি বলেন, জাকসু একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও মতামত থাকা উচিত।
তার অভিযোগ, এই সেমিনার আয়োজনের ক্ষেত্রে জাকসুর কোনো আনুষ্ঠানিক সভা হয়নি এবং সদস্যদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনাও করা হয়নি।
“গেস্ট নির্বাচন, বাজেট নির্ধারণ, সময়সূচি চূড়ান্তকরণ কিংবা আয়োজনের উদ্দেশ্য- কোনো বিষয়েই সম্মিলিত সিদ্ধান্তের প্রমাণ নেই।”
ভিপির দাবি, এ বিষয়ে জাকসুর সভাপতি বা অন্যান্য দায়িত্বশীলদের সঙ্গেও কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি এবং তাকে বা সভাপতিকে অবহিত না করেই একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড জাকসুর গণতান্ত্রিক চর্চাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, “এটি একটি বৃহৎ প্ল্যাটফর্মকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়।”
তিনি বলেন, জাকসুর ব্যানারে কোনো আয়োজন করতে হলে গঠনতন্ত্র মেনে সবার অংশগ্রহণে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায়, সংশ্লিষ্টরা দলীয় ব্যানারে এ ধরনের আয়োজন করতে পারেন।
অন্যদিকে, আয়োজকদের একজন ও জাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আহসান লাবিব ভিপির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, সেমিনারের বিষয়ে শুরুতেই ভিপির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল এবং তিনি উপস্থিত থাকতে পারবেন না বলে জানান।
“তিনি আমাকে জিএস মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তাই তিনি জানতেন না- এমন দাবি সঠিক নয়।”
এদিকে, এ সেমিনারকে কেন্দ্র করে একদল শিক্ষার্থী উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন। এতে তারা অভিযোগ করেন, জাকসুকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের অপচেষ্টা চলছে।
স্মারকলিপিতে জাকসুর নাম ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দলীয় কার্যক্রম বন্ধ, আগের ঘটনার তদন্ত এবং সংগঠনের সব কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোহাম্মদ রুবেল বলেন, জাকসুকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে বলে তাদের ধারণা।
তার অভিযোগ, প্রস্তাবিত সেমিনারের শিরোনাম থেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি প্রশাসনকে এ আয়োজন বন্ধ করার আহ্বান জানান এবং তা না হলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামবে বলে হুঁশিয়ারি দেন।
ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সভাপতি অদ্রি অংকুর বলেন, জাকসু নির্বাচনের মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারের পক্ষে কাজ করা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই জাকসুর নাম ব্যবহার করে কিছু নেতা তাদের রাজনৈতিক আদর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট কাজের বাইরে জাতীয় রাজনীতিতে নির্দিষ্ট দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নেই জাকসু নেতাদের আগ্রহ বেশি বলে মনে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সেমিনার ঘোষণাকে ঘিরে সভাপতি ও সহসভাপতি অবগত নন- এমন তথ্য সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধকেই সামনে এনেছে।”
এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে শিক্ষার্থীদের ‘ম্যান্ডেটের পরিপন্থি’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে, সেমিনারের একজন আমন্ত্রিত আলোচক জাহিদুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেছেন, জাকসুর অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতার কারণে তিনি এ আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন না।
তিনি বলেন, “পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখে মনে হয়েছে জাকসুর ভেতরে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে, যা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে বিব্রত করেছে।”
এই পরিস্থিতিতে তিনি আলোচক হিসেবে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেও জানান।