Published : 23 Jun 2026, 04:18 PM
গারো ভাষায় ‘দক’ অর্থ শরীর, আর ‘মান্দা’ অর্থ কাপড় বা শাড়ি। এ দুই শব্দের সমন্বয়ে সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে গারো নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘দকমান্দা’।
এটি কেবল সুতা আর রঙের বুননে তৈরি সাধারণ কোনো পোশাক নয়; বরং টাঙ্গাইলের মধুপুর, ঘাটাইল ও সখীপুরের শালবনের কোলে বেড়ে ওঠা গারো নারীদের আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতির প্রতীক।
যুগ যুগ ধরে গারো সম্প্রদায়ের নারীরা যেকোনো উৎসব-পার্বণ বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ‘দকমান্দা’ গায়ে জরিয়ে রাখেন।
তবে আধুনিকতার আগ্রাসন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহে টাঙ্গাইলের গারো সম্প্রদায়ের এই ঐতিহ্যবাহী পোশাক এখন অস্তিত্ব সংকটে।
মধুপুরের গারো সম্প্রদায়ের সদস্য অঞ্জনা নকরেক বলছিলেন, “দকমান্দার নকশা ও রঙে গারো সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির ছাপ ফুটে ওঠে।”
“আধুনিকতার নানা চাপে দকমান্দার ব্যবহার কমে এলেও সম্প্রদায়ের মানুষের মমতা ও ঐতিহ্যের প্রতি টান এখনও শত বছরের এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রেখেছে।”

বুননের ইতিহাস
গারো নারীরা কাঠের তৈরি আদি তাঁতযন্ত্রের সাহায্যে ঘরে বসে এই পোশাক বোনেন। এই পোশাকের মূল বৈশিষ্ট্য এর বাহারি রঙ এবং আকর্ষণীয় নকশা। এ পোশাকের নকশায় মূলত প্রকৃতি, পাহাড়, ফুল ও লতাপাতা ফুটিয়ে তোলা হয়।
সম্পূর্ণ হাতে বোনা এই পোশাক তৈরিতে কারিগরদের প্রচণ্ড কায়িক শ্রম দিতে হয়। একটি আকর্ষণীয় ও ভারী নকশার দকমান্দা তৈরি করতে একজন কারিগরের এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগে।তবে নকশা যদি জটিল আর সূক্ষ্ম হয়, তাহলে এক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
সম্পূর্ণ হাতে বোনা এই পোশাকটি তৈরিতে যে পরিমাণ কায়িক শ্রম দিতে হয়, সেই তুলনায় এর পেছনে ব্যয়ের পরিমাণও অনেক বেশি। বর্তমানে সুতা, রঙ ও তাঁত তৈরির উপকরণের দামও বাজারে বেড়েছে কয়েক গুণ।
‘চড়া দামে’ কমছে দকমান্দার ব্যবহার
একটি ভালো মানের দকমান্দা তৈরিতে উৎপাদন খরচ যেমন বেড়েছে, তেমনি এর খুচরা বাজারমূল্যও সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
বর্তমানে বাজারে একটি সাধারণ মানের দকমান্দা ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও আকর্ষণীয় নকশার দামি দকমান্দাগুলো ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হয়।
তাঁতিরা বলছেন, টাঙ্গাইলের মধুপুর, ঘাটাইল ও সখীপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গারো জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই নিম্ন আয়ের হওয়ায় এই চড়া মূল্যের পোশাক নিয়মিত কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

মধুপুরের পীরগাছা এলাকার তাঁতি মিনু রেমা বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে এ বস্ত্রের কারিগররা যেমন লোকসানের মুখে পড়ছেন, তেমনি আধুনিক কাপড়ের সহজলভ্যতা ও কম দামের কাছে মার খাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী পোশাকটি।
মধুপেরর বাসিন্দা প্রেমতী রিছিলের ভাষ্য, “এখন অনেকেই এটি আর নিয়মিত পরতে চান না। এই পোশাক পরে বাইরে বা শহরে গেলে আমাদের নানা ধরণের আপত্তিকর প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়।”
তিনি বলেন, “এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আর্থিক সীমাবদ্ধতা। অর্থাভাবের কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক গারো কিশোরী বা নারী এখন আর মনের মতো সুন্দর বা দামি দকমান্দা কিনে পরতে পারেন না।”

ঐতিহ্য আর আধুনিকতার টানাপোড়েন
মধুপুর উপজেলার গায়রা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমান যুগে মানুষের জীবনযাত্রা, পোশাক-আশাক এবং সংস্কৃতিতে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। আদিবাসীদের মধ্যেও এই আধুনিক পোশাকের প্রভাব পড়েছে।
কিন্তু এত পরিবর্তনের মধ্যেও অনেক গারো নারী তাদের ঐতিহ্য ছাড়েননি। পরম মায়া ও যত্নে আঁকড়ে ধরে আছেন তাদের পুরনো কৃষ্টি। প্রখর রোদে মাঠে কাজ করার সময়ও অনেক গারো নারী অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে এক প্যাঁচে জড়িয়ে গায়ে রাখেন নিজস্ব সংস্কৃতির এই দকমান্দা।
গায়রা এলাকার গারো কিশোরী বাপ্পি বেডুলকার বলছিলেন, “দকমান্দা কেবল শরীর ঢাকার আবরণ নয় বরং আমার সম্প্রদায়ের পরিচয়, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক পরম প্রতীক। এটি এক প্যাঁচে পরতে হয়। ছোটবেলা থেকেই মা-বানিদের (নানি-দাদি) দেখে আমরা এটি পরা শিখেছি; আমাদের ভীষণ ভালো লাগে।

“পোশাকটি শরীরের সঙ্গে এমনভাবে মিশে ও মানিয়ে যায় যে, মাঠের কঠিন কাজ বা ঘরের দৈনন্দিন কাজ করতে কোনো রকম অসুবিধা হয় না। ভারী কোনো পোশাক পরে আছি, এমন অস্বস্তি কখনোই তৈরি হয় না।”
আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, “এই গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য টিকে থাকার পথটি এখন আর মসৃণ নেই। বর্তমান যুগের তরুণ-তরুণীদের একাংশের অনীহা এবং বাইরের সমাজের অবহেলামূলক দৃষ্টিভঙ্গি একে কোণঠাসা করে ফেলছে।
“আধুনিকতার আগ্রাসনে এই ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও আমাদের মাতৃভাষা ধীরে ধীরে সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।”
উৎসব-অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যের ছোঁয়া
আধুনিকতার হাওয়া লাগলেও নিজের সংস্কৃতিকে গারো নারীরা কতটা আগলে রেখেছেন তা বোঝা যায় তাদের উৎসব-পার্বণে।
মধুপুরের গারো সম্প্রদায়ের সদস্য অঞ্জনা নকরেক বলছিলেন, “জীবনের সবচেয়ে বিশেষ দিনটিতে আমরা আধুনিক কোনো পশ্চিমা বা ভিনদেশি পোশাক নয়, বরং পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া অনন্য সুন্দর একটি দকমান্দা পরেই কনে সাজবো এবং বসবো বিয়ের পিঁড়িতে।”

মধুপুরের আচিক মিচিক সোসাইটির পরিচালক সুলেখা ম্রং বলেন, “একসময় গারোদের সামাজিক উৎসব, বিয়ে কিংবা ওয়ানগালা উদ্যাপনে নারীরা একই রঙের দকমান্দা পরে অংশ নিতেন। একই রঙে রাঙানো সেই উৎসবের পরিবেশ যেমন সৌহার্দ্য বাড়াত, তেমনি তা সগর্বে তুলে ধরত তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়।
“তবে সময়ের পরিবর্তন, কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়া এবং মূলধারার সমাজের সঙ্গে মিশে যাওয়ার কারণে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী এ পোশাকের ব্যবহার কমে যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “ভাষা ও পোশাকই গারো সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাই দকমান্দা টিকিয়ে রাখা মানে নিজেদের শিকড় ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা।”