Published : 30 Jun 2023, 10:39 PM
সারাবছর যেমনই যাক, ঈদের ছুটিটা ভাল কাটে বান্দরবানের পর্যটন ব্যবসায়ীদের। তাই তারা দুটি ঈদের ছুটির দিকেই তাকিয়ে থাকেন ব্যবসার আশায়। কিন্তু এবার ‘বিশেষ পরিস্থিতির’ কারণে বান্দরবানে পর্যটকের সংখ্যা কমে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
যদিও কী সেই ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ তা নিয়ে কেউ মুখ খুলতে চান না। শুধু বলছেন, ‘বিশেষ পরিস্থিতির কারণে’ জেলার পর্যটনসমৃদ্ধ তিন উপজেলায় পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সেটি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ায় এবার কেউ এখানে অবসর কাটাতে আসছেন না।
গত বছরের অক্টোবর থেকে বান্দরবান জেলায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ); যা ‘বম পার্টি’ নামে পরিচিত এবং নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে র্যাব ও সেনা সদস্যরা। কেএনএফের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণের অভিযোগ আনা হয়।
এই অভিযানে সময় সেনা সদস্যদের প্রাণ দিতে হয়েছে। অপরদিকে গ্রেপ্তার হয়েছে কেএনএফ ও জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। তারপরই পরিস্থিতি বিবেচনায় জেলার রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলার ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে জেলা প্রশাসন।
সেদিকে ইঙ্গিত করে মেঘলা এলাকার হলিডে ইন ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সানি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পর্যটক বুকিংয়ের এবারের অবস্থা একেবারেই ভাল না। মনে হয়, ওই ‘ঝামেলার কারণে’ বুকিং একেবারেই কম।

“৩০ জুন ও ১ জুলাই দুদিন আপাতত ৩০ শতাংশ বুকিং হয়েছে। এরপর দিন থেকে কোনো বুকিং নেই। আর বুকিং হওয়ার কোনো লক্ষণও দেখছি না। কারণ, প্রতি বছর ঈদের সময় মেঘলা-নীলাচল পর্যটন এলাকায় যে পরিমাণে পর্যটকের ঢল নামে তার তুলনায় আজকেও ৩০ শতাংশ পর্যটক আছে কিনা সন্দেহ।”
বান্দরবান-চিম্বুক সড়কের মিলনছড়ি এলাকায় হিল সাইড রিসোর্টের ব্যবস্থাপক রয়াল বম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, “কয়েক মাস ধরে বান্দরবানের একটা ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ সারাদেশে প্রচারণা পেয়ে গেছে। নেতিবাচক দিকে বেশি প্রভাবিত হয়েছে মনে হয়। কিন্তু মেঘলা, নীলাচল, চিম্বুক এবং নীলগিরি পর্যন্ত পর্যটকরা অনায়াসে ঘুরে আসতে পারে।“
ব্যবসায়ীরা জানান, অধিকাংশ আবাসিক হোটেল-মোটেল ২০ শতাংশও অগ্রিম বুকিংও হয়নি। অথচ প্রতি বছর ঈদের ছুটির কয়েক দিন আগে থেকেই অগ্রিম বুকিং হয়ে থাকত। ঈদকে কেন্দ্র করে এক সপ্তাহ পর্যন্ত ৮০ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম বুকিং থাকত।
কিন্ত এবার ঈদের ছুটিতে পর্যটক নেই; কয়েকদিন পরও আসবে এরকম কোনো লক্ষণ নেই বলে জানালেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।
তারা আরও বলছেন, তিন উপজেলায় প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা কবে নাগাদ উঠবে তারও কোনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আগামী দিনগুলো নিয়েও তাদের অনিশ্চয়তা রয়েছে।
মেঘলা এলাকার পর্যটন মোটেলের ব্যবস্থাপক যুবায়ের বলেন, এবারে বুকিং খুবই কম। পর্যটন মোটেলে মোট ২৫টি কক্ষের মধ্যে ২ জুলাই পর্যন্ত ১২টি কক্ষ বুকিং হয়েছে। এরপর দিন থেকে এখন পর্যন্ত আর কোনো রুম বুকিং হয়নি।
“অনেক সময় ঈদের দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত পর্যটক আসেন না। মাঝে মধ্যে হঠাৎ করে চলে আসে। তবে ঈদের পরও পর্যটকরা আসবে কি-না শনিবার বোঝা যাবে।”
বান্দরবান-চিম্বুক সড়কের মিলনছড়ি এলাকায় হিল সাইড রিসোর্টের ম্যানেজার রয়াল বম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, “ঈদের ছুটিতে বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার মিলে মাত্র দুটি রুম বুকিং হয়েছে। আরও অগ্রিম বুকিং পাওয়ার সুযোগ দেখছি না। কারণ, এই রিসোর্টে যারা থাকতে আসে তারা আগে থেকেই বুকিং দিয়ে আসে। কেউ হঠাৎ করে থাকতে আসে না।”

বান্দরবান শহরের প্রবেশমুখে রয়েছে মেঘলা পর্যটন। সেখানে ঝুলন্ত ব্রিজ ও ক্যাবল কারে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ রয়েছে পর্যটকদের। প্যাডেল বোটে করে ভ্রমণ করতে পারবেন মেঘলা লেকের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত।
মেঘলা পর্যটনে টিকেট সরবরাহকারী সুকুমার তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “ঈদের দ্বিতীয় দিন বিকাল ৫টা পর্যন্ত ৫০০ টিকেট বিক্রি হয়েছে। ৬টা পর্যন্ত বেশি হলে আরও ১০০টা বিক্রি হবে। আর যারা বেড়াতে আসছে তারাও বেশিরভাগ স্থানীয় মানুষ। পর্যটক একেবারে নেই বললেই চলে।”
পর্যটক কম হওয়ায় নীলাচল পর্যটন কেন্দ্রেও টিকেট বিক্রি কম হচ্ছে জানিয়ে টিকেট সরবরাহকারী আদ্বীপ বড়ুয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নীলাচল পর্যটন কেন্দ্রে শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত ৭০০টির মত টিকেট বিক্রি হয়েছে। অথচ অন্যান্য সময় ঈদের দিনে তিন থেকে চার হাজার পর্যন্ত বিক্রি হয়। যারা আসছে তারাও স্থানীয় লোকজন। বেশিক্ষণ থাকে না। একটু ঘুরেটুরে চলে যায়।”
বান্দরবানের তিন উপজেলায় ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাকি চারটিতে পর্যটন স্পট এখনও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত। যে কেউ যেকোনো সময় এসে ঘুরে বেড়াতে পারে। প্রশাসনিক কোনো বাধা নিষেধ নেই বলে জানালেন জেলা আবাসিক হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম।

সমিতির অন্তর্ভুক্ত ৬৫টি আবাসিক হোটেল-মোটেলে ২০ শতাংশ ছাড় রয়েছে জানিয়ে সিরাজুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এসব হোটেল-মোটেলে হাজারখানেক কর্মচারী কাজ করছেন। হোটেল রক্ষণাবেক্ষণসহ কর্মচারীদের বেতন মিলে অনেক খরচ টানতে হচ্ছে। কয়েক মাস ধরে জেলায় কোনো পর্যটকদের আনাগোনা নেই। ঈদেও আশানুরূপ পর্যটক না আসায় অনেকের কপালে ভাজ পড়েছে।”
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ট্যুরিস্ট পুলিশের বান্দরবান জোনের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) নকিবুল ইসলাম বলেন, “বান্দরবান সদর এলাকাগুলোতে পর্যটকরা নিরাপদে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাদের নিরাপত্তায় সাদা পোশাকের পুলিশও নিয়োজিত রয়েছে। এবার ঈদে ট্যুরিস্ট খুবই কম।”