Published : 18 May 2026, 10:42 PM
স্বাদ ও মানের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাগুরার লিচুর চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে সদর উপজেলার ‘হাজরাপুরী লিচু’ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকেই সুনাম ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও বেড়েছে।
চলতি মৌসুমে বাজারে উঠতে শুরু করেছে এই ফল।
লিচুকে ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হয়ে ওঠেছে বলে জানিয়েছেন মাগুরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা।
মৌসুমের শুরুতে খরার প্রভাব থাকলেও শেষ দিকে অনুকূল আবহাওয়ায় এবার ফলন ভালো হয়েছে। জেলার বিভিন্ন বাগানে এখন থোকায় থোকায় ঝুলছে পাকা লিচু।
কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, “গত বছরের তুলনায় এবার লিচুর আকার ও রঙ ভালো এসেছে। জিআই স্বীকৃতির পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা আগাম বাগান বুকিং করছেন। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে চাষিরা আরও লাভবান হবেন। চলতি মৌসুমে প্রায় ৮৫ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।”
স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন ট্রাক ও পিকআপে করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে মাগুরার লিচু। শনিবার জেলায় দুই দিনব্যাপী ‘হাজরাপুরী লিচু মেলা’ হয়। মেলার আয়োজন ঘিরেও স্থানীয় ব্যবসায়ী ও চাষিদের মধ্যে উৎসাহ দেখা গেছে।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৫৬৭ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে লিচুর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৩১ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে সদর উপজেলায়। এ ছাড়া মহম্মদপুরে ৬০ হেক্টর, শালিখায় ৪৩ হেক্টর এবং শ্রীপুর উপজেলায় ২৭ হেক্টর জমিতে লিচুর বাগান রয়েছে।
শুধু সদর উপজেলাতেই প্রায় তিন হাজার ৭০০ বাণিজ্যিক লিচু বাগান গড়ে উঠেছে। সদর উপজেলার হাজরাপুর, হাজীপুর, রাঘবদাইড় ইউনিয়ন এবং পৌর এলাকার শিবরামপুর লিচু উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
মাগুরার প্রায় পাঁচ হাজার কৃষক, ব্যক্তি ও বাগান মালিক সরাসরি লিচু উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। পাশাপাশি মৌসুমি এই ফলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিপুল কর্মসংস্থান।
বাগান পরিচর্যা, পাহারা, লিচু সংগ্রহ, বাছাই, ঝুড়ি ও কার্টন প্রস্তুত এবং পরিবহনের কাজে যুক্ত আছেন নারী ও পুরুষ শ্রমিক। স্থানীয় অনেক দিনমজুর লিচু বাছাই ও প্যাকিংয়ের কাজ করে বাড়তি আয় করছেন।
স্থানীয় শ্রমিক মোছা. আলেয়া বেগম বলেন, “লিচুর মৌসুমে প্রায় প্রতিদিনই কাজ পাই। এতে সংসারে কিছুটা স্বচ্ছলতা আসে। অন্য সময় এত কাজ পাওয়া যায় না।”
বর্তমানে বাজারে মানভেদে স্থানীয় জাতের প্রতি হাজার লিচু এক হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে বোম্বাই ও চায়না-৩ জাতের উন্নতমানের লিচুর দাম আরও বেশি। প্রতি হাজার এসব লিচু বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৬০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ টাকায়।
হাজরাপুর গ্রামের লিচু চাষি মোজাফফর হোসেন বলেন, “আমার বাগানে স্থানীয় হাজরাপুরী ও বোম্বাই জাতের ৪০টি গাছ রয়েছে। মৌসুমের শুরুতেই বাজারদরও মোটামুটি ভালো।”
চার দশকের বেশি সময় ধরে লিচু চাষ করা উজির আলী বলেন, “আমি লিচু সরাসরি ঢাকায় পাঠাই। এবার ফলন ও বাজার দুটোই ভালো। যদি শেষ পর্যন্ত ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায়, তাহলে লাভবান হওয়া সম্ভব হবে।”

ব্যবসায়ীরাও এবার ভালো লাভের আশা করছেন। ব্যবসায়ী শাকেন শেখ বলেন, তিনি সোয়া লাখ টাকায় একটি বাগানের ৪৬টি গাছ কিনেছেন। সেখানে ১৪ জন শ্রমিক কাজ করছেন। কয়েক দিনের মধ্যেই লিচু বিক্রি শেষ করে ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা লাভের আশা করছেন তিনি।
বাগান মালিক তাহের হোসেন বলেন, তিনি তার বাগানের ৪৫টি গাছ দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন।
২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল মাগুরার ‘হাজরাপুরী লিচু’ জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধন সনদ পায়।
চাষি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারি উদ্যোগে কোল্ড স্টোরেজ ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে ভবিষ্যতে মাগুরার লিচু বিদেশেও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।