০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

এক খিলির দামে বিক্রি হচ্ছে এক পণ পান, চাষির মাথায় হাত

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে পানের দামে এমন দরপতন কখনো হয়নি বলে জানান চাষিরা।

এক খিলির দামে বিক্রি হচ্ছে এক পণ পান, চাষির মাথায় হাত
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার যাদুপুর পানের হাটে ক্রেতার অপেক্ষায় চাষিরা।

বিডিনিউজ২৪

আবুল হায়াত শাহীন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 05 Sep 2025, 06:09 PM

Updated : 10 Sep 2026, 12:45 PM

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় বিভিন্ন হাটে এক পণ পান বিক্রি হচ্ছে মাত্র পাঁচ টাকায়; যা এক খিলির দামের সমান। হঠাৎ পানের দাম কমে যাওয়ায়া হতাশ চাষিরা।

কৃষকরা বলছেন, এবার টানা চার-পাঁচ মাস বৃষ্টিতে পান উৎপাদন বেড়েছে। তবে সে তুলনায় বাজারে চাহিদা কম। এতে কমে গেছে পানের দাম। আর দাম কমে যাওয়ায় উৎপাদন খবর ওঠাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

সেইসঙ্গে হাট-বাজারে পাইকারদের মর্জির ওপর পানের দাম নির্ধারণ হয়ে থাকে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চাষিরা।

তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ইয়াছিন আলী জেলার বাইরে যেখানে দাম ভালো সেখানে পান বাজারজাত করতে চাষিদের পরামর্শ দিয়েছি।

জেলা সদরের একমাত্র পানের হাট যাদুপুর পানের হাট। মহানন্দা নদীর বাঁকে পশ্চিম পাড়ের শিমুলতলা ও যাদুপুর গ্রামে ছোটবড় মিলিয়ে দুই শতাধিক পানের বরজ রয়েছে। এখানে পান চাষির সংখ্যা প্রায় আড়াইশো। মূলত এই পানের বরজ ও চাষিদের ঘিরে এখানে পানের হাট বসে।

উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়নের যাদুপুর গ্রামে প্রতিদিন সকালে বসে এই পানের হাট। বছরে দুই ঈদের দিন বাদে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত এই হাটে চলে পান বেচাকেনা।

প্রতিদিন সকালে হাটে পান কিনতে আসেন জেলার বিভিন্ন উপজেলার ও আশপাশের পাইকাররা। দুই ঘণ্টার জমজমাট কেনাবেচা শেষে পাইকাররা পান নিয়ে বিভিন্ন খুচরা বাজারে চলে যান।

সাধারণত বর্ষাকালে গুল্ম জাতীয় গাছে পান পাতা ধরে বেশি; আর গ্রীষ্মকালে খরার সময় ধরে কম। এবার গ্রীষ্মের বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হয়। পরে আষাঢ়-শ্রাবণ ও ভাদ্রের মাঝামাঝিতেও ঘন ঘন বৃষ্টিপাত হয়েছে। চার-পাঁচ মাসে এবার উৎপাদন বেড়েছে; তবে সেই তুলনায় বাজারে চাহিদা কম। এতে ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না চাষিরা।

যাদুপুর হাটে পান বিক্রি করতে আসা চাষি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “হাটে এক পণ পান পাঁচ টাকায় বিক্রি করছি। এক পণ মানে আশিটা পান বেচ্যা হামারা পাছি পাঁচ টাকা; আর বাজারে এক খিলি পানের দাম পাঁচ টাকা।”

গত পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে পানের দামের এমন দরপতন কখনো হয়নি বলে হতাশা প্রকাশ করেন জাহাঙ্গীর আলম।

পান বিক্রি করতে আসা আরেক চাষি জিল্লুর রহমান বলেন, “আমার এক বিঘা জমিতে পানের বরজ আছে। প্রতিদিন হাটে পান নিয়ে আসতে হয়। পানের দর এত কম যে, তা বিক্রি করে বাড়ির বাজার করার পয়সাও হয় না।”

হাটে পাইকারের অপেক্ষায় দীর্ঘক্ষণ বসে আছেন পান চাষি গোলাম মোস্তফা। দাম কম নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “দুই তিন মাস থেকে পানের দাম কমে গেছে। পাইকারকে পণ প্রতি ৭০০ টাকার দামের পান মাত্র ৬০ টাকায় দিতে হচ্ছে। পানের দাম এখন পাইকারদের মর্জির ওপর হয়। 

“গত বছর বড় পান ২০০ টাকা, মাঝারি পান ১৬০ টাকা এবং রাশি পান মানে ছোট পান ২৫ থেকে ৩০ টাকা পণ বিক্রি করেছি। এ বছরে রাশি পান পাইকাররা ঠিক মত নিতেই চায় না। পানের বরজের খরচ যোগাতেই হিমশিম খাচ্ছি। কি খাব? কি করব?”

যাদুপুর এলাকায় পানের বরজ পরিচর্যায় ব্যস্ত চাষি ময়েজ উদ্দিন। তিনি বলেন, “সাধারণত গ্রীষ্মের খরতাপে গাছে পান পাতা কম ধরে। সেই সময় পানের দাম ভালো পাওয়া যায়। বর্ষাকালে পানের পাতা ধরে বেশি আবার রোগবালাইও বেশি হয়। 

“এ সময় পানের পাতায় হলদে পচা দাগ ও ডগা পচা রোগের সমস্যা দেখা দেয়। এতে কীটনাশকের বাড়তি খরচ হয়। গত বছর এ সময় বরজের খরচের টাকা উঠে গেছিল। এ বছর এখন পর্যন্ত শুধু খরচ হচ্ছে; হাতে কোনো টাকা আসেনি।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ইয়াছিন আলী বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম প্রধান এলাকা। এই জেলায় স্বল্প পরিসরে পান চাষ হয়। সদর উপজেলায় ১৫ হেক্টর ও শিবগঞ্জ উপজেলায় পাঁচ হেক্টর জমিতে পান হয়েছে। 

গত মাস থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে, এতে পানের কাণ্ড পচা ও পানে দাগ রোগের সমস্যা দেখা দিতে পারে। রোগ প্রতিরোধে কৃষকদের নানা রকম ছত্রাক নাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সেইসঙ্গে পান পাতা যেহেতু কাঁচা খাওয়া হয়; তাই ছত্রাক নাশক ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময় পর পান পাতা সংগ্রহের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, চলতি মাসেও প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। বর্ষাকালে পানের উৎপাদন বেশি হয়, ফলে দাম কমে যায়। এতে পান চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

এমন পরিস্থিতিতে জেলার বাইরে যেখানে দাম ভালো সেখানে পান বাজারজাত করার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন এই কৃষি কর্মকর্তা।