Published : 31 Dec 2025, 05:17 PM
সপ্তাহ ধরে উত্তরের হিমেল হাওয়ায় কাঁপছে কুড়িগ্রাম। তার মধ্যেই পেটের দায়ে মাঠে কাজ করছিলেন বৃদ্ধা মমেনা খাতুন। এমন তীব্র শীতের মধ্যেও সরকারি বা বেসরকারি কোনো সহায়তা তার ভাগ্যে জোটেনি বলে আফসোস এই নারীর।
৬০ বছরের মমেনা চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন দ্বীপচর বজরা দিয়ারখাতার বাসিন্দা।
নারী প্রধান পরিবারের মমেনা বলেন, “এই শীতে এখনা কম্বলও পাই নাই বাবা। ঠান্ডায় নাতি-নাতনীগুলো কষ্ট করছে। কাপড় কেনার টাকা নেই।”
তিনি আরও বলেন, “আমার মেয়ের ছয় সন্তানসহ আটজনের পরিবারে কোনো পুরুষ নাই। ঠাণ্ডার কারণে কাজ করতে মন চায় না। কিন্তু কাজ না করলে খামো কি। তাই কষ্ট হলেও মাঠে আসি।”
বুধবার সরজমিনে এই দ্বীপে গিয়ে দেখা যায় প্রচণ্ড ঠান্ডা উপেক্ষা করেই মাঠে বোরো ধানসহ পেঁয়াজ, আলু ও ভুট্টা রোপন করছেন কৃষকরা।
জমিতে কাজ করা ওই গ্রামের কৃষক মজিদুল জানান, ‘ঠান্ডা আর কুয়াশায় ভোরে উঠতে চাইলেও পারি না। সকালে খেয়ে ১০টা-সাড়ে ১০টার দিকে জমিতে আসি। কিছুক্ষণ পর পর বাড়িতে গিয়ে আগুনে হাত-পা গরম করে আবার মাঠে নামি।”
হিম ঠাণ্ডা বাতাস ও ঘন কুয়াশার কারণে কৃষি কাজ ব্যহত হচ্ছে জানিয়ে একই গ্রামের মজিদুল, কাদের ও মীরবকস বলেন, তারাও সকাল ১০টার পর মাঠে এসেছেন। বিকাল ৪টা বাজলেই চারদিকে কুয়াশা জেঁকে বসে ফলে কাজ করা যায় না। ”

পাশের বাড়িতে রান্না চড়িয়েছেন গৃহবধূ জহিরন। তিনি বলেন, “সারাদিন ঠান্ডা পানি নাড়াচাড়ার কারণে হাত-পা কুঁকড়ে যায়। চুলকানি হয়।
“দুদিন আগে আমার ও এক বছর বয়সী সন্তানের বমি ও পাতলা পায়খানা শুরু হয়েছে। এখানে কোনো ভালো ডাক্তার নাই। অসুস্থ্ শরীর নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। ব্রহ্মপূত্র নদ পেরিয়ে পাশের থানাহাট যেতে অনেক সময় লাগে, খরচও বেশি হয়। তাই টোটকা দিয়ে রোগ সারানোর চেষ্টা চলছে।”
একই অবস্থা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদ-নদীতে অবস্থিত ৪২০টি চরের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের। এই হিমেল ঠান্ডায় সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন এসব চরের নিম্ন আয়ের মানুষ।
তবুও অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থা, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত এসব চরের মানুষ মাটি কামড়ে পড়ে আছেন বাপ-দাদার ভিটায় এক অদৃশ্য মায়ায়। জীবন যাপনে শত কষ্ট হলেও তারা বাড়িভিটা ছাড়ছেন না।
এদিকে বুধবার জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলার রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার।
তবে আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে আবহাওয়ার উন্নতি হবে বলে আশা জানিয়েছেন তিনি।

গত সাতদিন ধরে জেলায় সূর্যের মুখ দেখা যাচ্ছে না। ঘন কুয়াশায় নৌ-ঘাটগুলো থেকে সময় মতো ছাড়ছে না শ্যালে নৌকাগুলো।
তীব্র ঠান্ডার কারণে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছে না মানুষ। বিভিন্ন জনসমাগম স্থানগুলো এখন ফাঁকা পড়ে আছে। বিশেষ করে ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের মানুষ শীতবস্ত্রের অভাবে রয়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
শীতবস্ত্রের সংকট নিয়ে ব্যাপারে চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাক বলেন, “১ হাজার তিনশ কম্বল পেয়েছি। চরাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়নে ১ হাজার দুইশ কম্বল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সেসব বিতরণ পর্যায়ে রয়েছে।”

“প্রয়োজনের তুলনায় এ বরাদ্দ অপ্রতুল, তবুও আমরা খবর পেলেই নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।”
জেলা ত্রাণ ও পূণর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন বলেন, “ইতোমধ্যে জেলার ৯টি উপজেলায় ছয় লাখ টাকা করে মোট ৫৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপজেলাগুলো থেকে শীতবস্ত্র কিনে বিতরণ শুরু করেছেন। এছাড়াও প্রাপ্ত ২৫ হাজার কম্বল জেলা থেকে বিতরণ করা হয়েছে।
এছাড়া নতুনভাবে ৪০ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। যেগুলো আগামীতে বরাদ্দ দেয়ার কাজ চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।