Published : 13 Jun 2026, 09:49 AM
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া, নদী ও কৃষিজমি থেকে অবাধে বালু উত্তোলন চলছে। প্রশাসনের অভিযান, মামলা ও জরিমানার পরও থামছে না বালুখেকোদের দৌরাত্ম্য।
এতে বছরে অন্তত ছয় থেকে সাত কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। অন্যদিকে পরিবেশ, কৃষিজমি, গ্রামীণ অবকাঠামো ও জননিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
সবশেষ চার দিনের অভিযানে উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে অবৈধভাবে উত্তোলিত করা প্রায় ১০ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এ সময় বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত তিনটি মেশিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকন বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন ও মাটি কাটার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েক মাসে একাধিক অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা, বালু জব্দ ও মেশিন ধ্বংস করা হয়।

প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১০ জনকে মোট ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। উপজেলার সিন্দুরখান, ভূনবীর, মতিগঞ্জ, কালাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৫টি অভিযান পরিচালনা করা হয়।
এসব অভিযানে একাধিক ভেকু মেশিন জব্দ ও ধ্বংসের পাশাপাশি অবৈধভাবে উত্তোলিত করা প্রায় ৩০ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়।
বালু উত্তোলন ঘিরে বাড়ছে সংঘাত
অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘর্ষ, হামলা, সড়ক দুর্ঘটনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। সম্প্রতি একটি বালুবাহী ডায়না গাড়ির চাপায় ছয়জন আহত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় জনতা গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানের সময় একটি বালুবাহী ডায়না গাড়ি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে একটি অটোরিকশা ও একটি ব্যাটারিচালিত টমটমকে চাপা দেয়। এতে চালকসহ ছয়জন আহত হন।
ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা ডায়না গাড়িটি ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং শ্রীমঙ্গল-মির্জাপুর সড়ক অবরোধ করে। এতে প্রায় চার ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ ঘটনায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদকর্মীরাও হামলার শিকার হন।
মামলাতেও দমছে না বালুখেকোদের তৎপরতা
চলতি বছরের ২ মে ভূনবীর ও মির্জাপুর এলাকায় পরিবেশ ধ্বংস করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলাটি করেন ভূনবীর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিমেল পাল।

মামলার আসামিরা হলেন- ফেরদৌস মিয়া, আহাদ মিয়া (১), আহাদ মিয়া (২), কাওছার মিয়া, উজ্জ্বল মিয়া, ফয়েজ মিয়া, মোচ্ছাব্বির মিয়া, মাসুক মিয়া, লোকমান মিয়া, মো. আব্দুল্লাহ, মকবুল মিয়া, কদর আলী, নানু মিয়া, দুদু মিয়া, সামছু মিয়া, বেলাল মিয়া, আছলম মিয়া, কবির মোল্লা, লতিফ মিয়া ও আজাদ মিয়া। তাদের অধিকাংশের বাড়ি ভুনবীর ও মির্জাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে।
মামলায় বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলা থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি ছড়া ও কৃষিজমি সংলগ্ন এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছিল। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমি, বসতভিটা ও স্থানীয় অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
ঝুঁকিতে ৩০টির বেশি পাহাড়ি ছড়া
শ্রীমঙ্গলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ৩০টিরও বেশি পাহাড়ি ছড়া হাইল হাওরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বর্মাছড়া, উদনাছড়া, হরিণছড়া, পুটিয়াছড়া, বিলাশছড়া, ফুলছড়া, কাকিয়াছড়া, আমরাইলছড়া, ইছামতিছড়া, ভুড়ভুড়িয়া ছড়া, জাগছড়া, সুনাছড়া, নারাইনছড়া, বৌলাছড়া, গিলাছড়া, শিয়ালছড়া, খাইছড়া ও শাখামোড়া ছড়া।
জানা গেছে, সিন্দুরখান ইউনিয়নের লাংলিয়া ছড়া, সিন্দুরখান চা-বাগান, কুঞ্জবন, কামারগাঁও ও চিরিগাঁও এলাকায় একাধিক পয়েন্ট থেকে নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। একই ইউনিয়েনের মটুলির পাড় এলাকায় বিটন কুর্মীর বাড়ি পাশে একটি চক্র পুটিয়া ছড়া থেকে বালু উত্তোলন করে।
আশিদ্রোন ইউনিয়নের বিলাশ নদীর পাড়ের টং, আশিদ্রোন ও জামসী এলাকা, সাতগাঁও ইউনিয়নের মাকরী ছড়া, গান্ধিছড়া ও ইছামতিছড়া, ভুনবীর ইউনিয়নের জয়িতাছড়া এবং মির্জাপুর ইউনিয়নের বড়ছড়া ও বৌলাছড়াসহ বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া কালাপুর ইউনিয়নের শিয়ালছড়া, নারাইনছড়া ও জাগছড়ার একাধিক স্থান থেকেও নিয়মিত বালু উত্তোলন হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এ ছাড়া শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন, কালিঘাট ও রাজঘাট ইউনিয়নেরও বেশ কিছু জায়গা থেকে ছোট ছোট পরিসরে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, শ্রীমঙ্গলে মোট ২৬টি বালুমহাল রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে শুধু বিলাসছড়া লিজের আওতায় রয়েছে। আইনি জটিলতার কারণে বাকি মহালগুলো দীর্ঘদিন ধরে লিজ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. সেলিম মিয়া বছরে ৬৫ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়ে বিলাসছড়ার ইজারা নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সব বালুমহাল লিজের আওতায় আনা গেলে সরকার বছরে কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারবে।
পরিসংখ্যান বলছে, লিজবিহীন ছড়াগুলো থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বালু অবৈধভাবে উত্তোলন হচ্ছে। সেইসঙ্গে পরিবেশগত ক্ষতি, পাহাড়ি ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া, কৃষিজমির ক্ষয় এবং গ্রামীণ সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গলে বালু মহালের একমাত্র লিজ গ্রহীতা সেলিম মিয়া বলেন, বছরে ৬৫ লাখ টাকা দিয়ে বিলাসছড়া লিজ নিয়েছেন তিনি। কিন্তু একটি অবৈধ চক্র তার এলাকা থেকেও রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন করে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগও করেছেন তিনি।

প্রশাসনের কঠোর অবস্থান
অবৈধ বালু উত্তোলন ও মাটি কাটার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকন।
শ্রীমঙ্গল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও জনগণের সহযোগিতায় ভারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবন্ধকতাও তৈরি করা হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, আইনি জটিলতার কারণে সব ছড়া লিজের আওতায় না থাকলেও কেউ যাতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
“পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে”, বলেন তিনি।
মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। সরকারকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এখন এটি চলবে না।
“প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, দলমত নির্বিশেষে যে-ই বালু তুলবে তাদের আইনের আওতায় আনার জন্য।”
এলাকাবাসীর কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে প্রশাসনের সঙ্গে একাধিক অভিযানে গিয়েছিলেন মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, “কৃষি জমির মাটি কেটে যেভাবে পরিবেশ ধ্বংস করা হয়েছে, তা আমি নিজ চোখে দেখে এসেছি। এটি বন্ধে আমরা প্রশাসনকে আরও উদ্যোগী ভূমিকা নিতে বলেছি।”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সব বালুমহালকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় পরিবেশ ধ্বংস, কৃষিজমির ক্ষতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।