১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

গঙ্গাচড়ায় ফিরল ৭ বছর আগের স্মৃতি, আলদাদপুর বালাপাড়ায় আতঙ্ক

২০১৭ সালের শেষ দিকে ফেইসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে গঙ্গাচড়ার ঠাকুরপাড়ায় হামলা-অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল; সাত বছর পর হামলার হল আলদাদপুর বালাপাড়া গ্রামে।

গঙ্গাচড়ায় ফিরল ৭ বছর আগের স্মৃতি, আলদাদপুর বালাপাড়ায় আতঙ্ক
হামলায় বিধ্বস্ত নিজের বাড়ির উঠানে মাথায় হাত দিয়ে বসেছিলেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ি ইউনিয়নের আলদাদপুর বালাপাড়া গ্রামের এক নারী। ছবিটি মঙ্গলবার দুপুরে তোলা।

আফতাবুজ্জামান হিরু

রংপুর প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Jul 2025, 01:55 AM

Updated : 10 Sep 2026, 12:44 PM

মিছিল এসে যখন গ্রামের ঘরবাড়িতে ভাঙচুর লুটপাট শুরু করল, সন্ধ্যা রানীরা কেবল জানটা নিয়ে সরে যেতে পেরেছিলেন। দুদিন পর গ্রামে ফিরে এলেও তাদের ভয় কাটছে না।  

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ি ইউনিয়নের শেষ সীমানায় আলদাদপুর বালাপাড়া গ্রাম, সেইখানে সন্ধ্যা রানীর বাড়ি। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গত রোববার রাতে ওই গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলার আগে এলাকায় মাইকিং করে লোকজন জড়ো করা হয়। 

পুলিশ, প্রশাসন ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বলছেন, যারা হামলা করেছেন, তাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন ‘বহিরাগত’। পাশের নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলা থেকে লোকজন এসে হামলা চালিয়ে চলে যায়। 

শনিবার রাতে এক দফা হামলার পর রোববার বিকালে দ্বিতীয় দফা হামলা হয় সেখানে। তখন পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বাধা দিতে গিয়ে তারাও হামলার শিকার হন। 

এরপর দুই দিন পেরিয়ে গেলেও মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি; গ্রেপ্তারও নেই। 

হামলার পর আলদাদপুর বালাপাড়া গ্রামের বেশ কিছু পরিবার বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মঙ্গলবার বাড়ি ফিরলেও তাদের চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। 

এলাকার পরিস্থিতি জানতে চাইলে গঙ্গাচড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান মৃধা বলেন, “এখান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ঘরবাড়ি মেরামতের কাজ শুরু করেছে। প্রশাসন ভুক্তভোগীদের পাশে আছে। এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে।”

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

শনিবার বিকালের দিকে হঠাৎ করেই এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, গ্রামের ১৭ বছরের এক কিশোর ফেইসবুকে মুসলমানদের মহানবী হয়রত মুহাম্মদকে (সা.) নিয়ে কটূক্তি করেছেন। সেই কিশোর একটি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র; তার বাবা এলাকার পল্লী চিকিৎসক।

এক প্রতিবেশী জানান, ঘটনাটি জানার পরপরই পরিবার সেই কিশোরকে নিয়ে থানায় যায়। তখন পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। তারপরই কিছু লোক এসে হামলা চালায়। 

ওই প্রতিবেশী বলছিলেন, কেউ কিছু বোঝার আগেই শনিবার রাত ৮টার দিকে কিছু লোক এসে হামলা শুরু করে। তারা ওই কিশোরের বাড়ি মনে করে প্রথমে তার চাচার বাড়িতে হামলা করে। পরে সেখানকার আরও কয়েকটি বাড়িতে হামলা চালায়। 

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে গ্রামের বাসিন্দা অতুল রায় বলেন, “সন্ধ্যার দিকে পুলিশ এক কিশোরকে আটক করে নিয়ে যায়। এরপর পাশের এলাকার একদল লোক হাতে লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় গ্রামের লোকজন ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে ওই কিশোরের বাড়ি মনে করে বিক্ষুব্ধ লোকজন অন্য একজনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর চালায়।”

সেদিন রাতের হামলায় সন্ধ্যা রানীর বাড়িঘরও ভাঙচুর করা হয়। হামলার পর তারা বাড়ি ছেড়ে গিয়েছিলেন। মঙ্গলবার সকালে আবার ফিরে এসেছেন। 

বাড়ির উঠানে বসে কথা বলছিলেন সন্ধ্যা রানী। তিনি বলেন, “দাদা, হামরা তো কিছুই কইতে পারি না। শনিবারের দিন হামরা শুননো যে, হামার মেম্বার ভাই আসি কইলো, ওই ছেলে (কিশোর) নবীক নিয়ে ফেইসবুকত কী যেন লিখছে। ওকে থানায় নিয়ে যাওয়া লাগবে। তারপর রাত ৮টার দিকে লোকজন হামার বাড়িঘর ভাঙিয়ে দিয়ে গেল।”

পুনরাবৃত্তি

২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে গঙ্গাচড়া উপজেলার ঠাকুরপাড়ার এক যুবকের বিরুদ্ধে ফেইসবুকে ‘ধর্মীয় অবমাননামূলক’ ছবি পোস্ট করার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় অক্টোবরের শেষ দিকে থানায় একটি মামলাও হয়।

পরে ওই যুবকের গ্রেপ্তার দাবিতে পাগলাপীর এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। বিক্ষোভের পর তাকে গ্রেপ্তারের দাবিতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। 

এর কয়েকদিন পর ৯ নভেম্বর ঠাকুরপাড়ায় হাজার হাজার লোক গিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে। হামলাকারীরা গঙ্গাচড়া উপজেলার খলেয়া ইউনিয়নের শলেয়াশাহ, বালাবাড়ি গ্রাম এবং পাশের মমিনপুর গ্রাম থেকে এসেছিল বলে সেসময় পুলিশ জানিয়েছিল। 

তখন পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পুলিশের সঙ্গে হামলাকারীদের সংঘর্ষে এক যুবক নিহতও হয়। আহত হন বেশ কয়েকজন। সে ঘটনায় গঙ্গাচড়া ও কোতোয়ালি থানায় দুটি মামলা হয়েছিল। 

সাত বছরের মাথায় আবার হামলার শিকার হল একই উপজেলার আলদাদপুর বালাপাড়া গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর। 

রংপুরের একজন সাংবাদিক বলছিলেন, “সেই সময় ঘটনাটি ঘটেছিল নির্বাচনের আগে আগে। তখন সেই ঘটনার কোনো বিচার হয়নি। কাউকে শাস্তি পেতে হয়নি।”তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “সেদিন যদি হামলাকারীরা শাস্তি পেত তাহলে আজকের ঘটনা না-ও ঘটতে পারত। মনে হয়, সবাই সেই হামলার ঘটনাটি ভুলে গেছে।” 

পুরনো খবর:

মাইকিংয়ের পর শত শত লোক এসে হামলা চালায়

শনিবার রাতে হামলার পর থেকেই আলদাদপুর বালাপাড়া গ্রামের পরিস্থিতি থমথমে। তার মধ্যেই দুপুরের পর থেকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগের বিচার চেয়ে এলাকায় মাইকিং করা হয় এবং লোকজনকে জড়ো করা হয়। 

পরিস্থিতি বিবেচনা করে তখন এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তার মধ্যেই বিকালের দিকে শত শত লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে হামলা চালায়। 

গ্রামের চল্লিশোর্ধ্ব এক নারী বলেন, “৫০০ থেকে ৬০০ লোক, হাতে লাঠি আর দেশীয় অস্ত্র। তারা এসে হামলা করল। পুলিশের লোকজন ছিল।তারা বাধা দিলে মিছিলের লোকজন তাদের ওপরও হামলা করে। 

“পরে পুলিশ সরে গেলে প্রত্যেক বাড়িতে ঢুকে ঢুকে তারা লুটপাট, ভাঙচুর করেছে। গ্রামের সবাই তখন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।” 

ওই নারী বলেন, “আমার কথা, আমরা চাই, যে দোষ করেছে, তাকে শাস্তির আওতায় আনা হোক। আমাদের নির্দোষ মানুষদের ঘরবাড়ি কেন ভাঙা হল, লুটপাট কেন করা হল?”

বেশ কিছু সময় ধরে হামলা-লুটপাট চালানোর পর হামলাকারীরা সেদিন নির্বিঘ্নেই চলে যায়। তাদের কোনো বাধার সন্মুখীন হতে হয়নি। 

গ্রামের বেশ কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, যারা হামলা করেছে, তাদের প্রায় কাউকেই তারা এলাকায় দেখেননি কখনো। তারা শুনেছেন, হামলাকারীরা নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের বাংলাবাজার এলাকা থেকে এসেছে।

হামলাকারীরা শুধু বাড়িঘর ভাঙচুর করেনি; স্বর্ণ, নগদ টাকা, চালের বস্তা, গরু, কাপড়-চোপড় ও আসবাবপত্র লুটে নিয়ে গেছে।

ভুক্তভোগী এক নারী বলছিলেন, মিছিল আসার সময় বাড়ি থেকে তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। ঘরের দরজা খোলা রেখেই তাকে পালিয়ে যেতে হয়। কোনোকিছু তিনি নিয়ে যেতে পারেননি। ঘরে টাকা-পয়সা, সোনার গহনা ছিল। ফিরে এসে আর কোনোকিছু তিনি পাননি। 

এ গ্রামের সন্ধ্যা রানী বলেন, “রোববার বিকালে আসি হামারগুলার সবার বাড়ি ঘর-দুয়ার ভাঙচুর, লুটপাট করে নিয়ে যায়। হামরা তো ভয়ে পালিয়ে গেছি। সেই দিন থেকে আর বাড়ি আসি নাই। আজ (মঙ্গলবার) সকালে বড়িতে আসনো। তারপরও ভয় লাগে যদি তারা আবারো হামলা চালায়।”

সোমবার রাতেও মিছিল নিয়ে আসার চেষ্টা

আলদাদপুর বালাপাড়া গ্রামের কয়েকজন বলছিলেন, সোমবার রাতেও কিশোরগঞ্জে একটি এলাকায় লোকজন জড়ো হয়েছিল। তারা মিছিল নিয়ে আবার গ্রামে আসার চেষ্টা করে। তখন গ্রামের মানুষের মধ্যে ফের আতঙ্ক জাগে। যদিও তখন গ্রামের অধিকাংশ বাড়ি ফাঁকা পড়েছিল। 

গ্রামের মানুষ বলছে, তারা জানতে পেরেছেন, তাদের গ্রামের পাশের মাগুরা চেকপোস্ট এলাকায় তারা জড়ো হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা আর মিছিল নিয়ে আসেনি। 

বিষয়টি নিয়ে দুপুরে সাংবাদিকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান মৃধার কাছে জানতে চেয়েছিলেন। তখন তিনি বলেন, “বিচ্ছিন্নভাবে কিছু বিষয় আমরা শুনছি… আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যাপ্ত সংখ্যক সদস্য এখানে মোতায়েন রয়েছে। নিরাপত্তার খাতিরে তাদের যতদিন থাকার দরকার তারা থাকবেন।”

গঙ্গাচড়া মডেল থানার ওসি আল এমরান বলেন, সোমবার রাত ৯টা–১০টার দিকে কিছু লোকজন মাগুরা চেকপোস্টে জমায়েত হয়েছিলেন। তারা সেই তথ্য পেয়েছিলেন। কিন্তু লোকজন সেখানে বিক্ষোভ করে চলে গেছে। 

এখনো আতঙ্ক 

মঙ্গলবার সকালে আলদাদপুর বালাপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামটিতে অধিকাংশ বাড়িই টিনের। কয়েকটি আধাপাকা বাড়িঘরও রয়েছে। গ্রামের রাস্তায় মানুষের চলাচল কম। লোকজনের তেমন কোনো হাঁকডাকও নেই। গ্রামটিতে ঢোকা মুখে পাশাপাশি আলদাদপুর দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় এবং আলদাদপুর নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এর পাশেই কয়েকজন সেনা সদস্য দায়িত্ব পালন করছিলেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তারা ক্যাম্প থেকে অনুমতি নিয়ে আসার কথা বলেন।

অনুমতি নিয়ে গ্রামটিকে প্রবেশ করে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি বাড়ির টিনের বেড়ায় দা দিয়ে কোপানোর দাগ। মানুষের বাড়িঘর বিধ্বস্ত। জিনিসপত্র এদিক-সেদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কেউ কেউ সেগুলো সংগ্রহ করার চেষ্টা করছেন। কেউ আবার উঠানে বা ঘরের বারান্দায় বসে চোখের পানি ফেলছেন।  

আলদাদপুর বালাপাড়া গ্রামের যে জায়গায় হামলা হয়েছে, সেখানে ২৩-২৪টির মত ঘর রয়েছে। আশপাশে আরও অনেক বাড়িঘর রয়েছে। মূলত এলাকাটি হিন্দু অধ্যুষিত। হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলোর পাশাপাশি আশপাশের বাড়িঘরের লোকজনও ভয় আর আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে যায়।  

যে কিশোরের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছে, তার বাড়িটি গ্রামটির প্রায় শেষ দিকে। তার বাড়িতেও ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে। অবশ্য সেই বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি।

প্রায় প্রতিটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর আর লুটপাটের চিহ্ন রয়েছে। কিছু কিছু বাড়িতে পূজার ঘর ও আসবাবপত্রও ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেছে। 

ষাটোর্ধ্ব বিধবা এক নারী গ্রামের মাঝামাঝি গাছের নিচে বসে বিলাপ করছিলেন। তিনি বলছিলেন, “ওরে বাবারে, হামাকগুলাক নিঃস্ব করি দিলে। হামরা এখন কেমন করে চলমো। হামাক যে নিঃস্ব করি দিয়ে গেল। হামার যে সব লুটপাট করি নিয়া গেল।”

বাসিন্দারা জানান, গ্রামের প্রমোদ মোহন্ত, সুজন রায়, কিশোর রায়, জয়চাঁদ রায়, অমিত মোহন্ত, রবীন্দ্রনাথ রায়, ধরণী মোহন্ত, অতুল রায়, সুমন রায়, ধনঞ্জয় রায়, কমলাকান্ত রায়, সুবল রায়, অবিনাশ রায়, লালমোহন রায়, হরিদাস রায়, মনোরঞ্জন শীল, লিটন মোহন্ত ও উপিন চন্দ্র মোহন্তর বাড়িতে বেশি হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে। 

হামলার পর সোমবার দুপুর পর্যন্ত অন্তত ২৫টি পরিবার গ্রাম ছেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য পরেশ চন্দ্র রায়। 

তিনি বলেন, “বিভিন্ন নম্বর থেকে মোবাইল ফোনে হুমকি পাচ্ছে গ্রামবাসী। ফলে ভয়ে অনেকে গ্রাম ছাড়ছে। ভয়ে অনেকে বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন না।”

অভয় দিচ্ছে পুলিশ 

এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তার রয়েছে দাবি করে গঙ্গাচড়া মডেল থানার ওসি আল এমরান বলেন, “কিছু পরিবার আতঙ্কে বাড়ি ছেড়েছিল। তবে তারা আবার আজ বাড়িতে ফিরছেন। আমরা তাদের আশ্বস্ত করেছি। ওই গ্রামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।” 

তিনি বলেন, হামলার ঘটনায় এখনও কোনো লিখিত অভিযোগ তারা পাননি। সে কারণে কাউকে আটকও করা হয়নি।

গঙ্গাচড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, “ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার ওই কিশোরের পরিবার ও স্বজন ভয়ে বাড়ি ছেড়েছেন। এ ছাড়া কিছু পরিবার হামলার ভয়ে বাড়ি ছেড়েছে বলে জেনেছি। তবে আমরা গ্রামবাসীদের আশ্বস্ত করেছি, বাড়ি ছাড়ার প্রয়োজন নেই।” 

পরিস্থিতি এখন শান্ত দাবি করে তিনি বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য শুকনো খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে আজ তাদের বাড়িঘর নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে।”

যে এলাকা থেকে লোকজন হামলা চালাতে এসেছে বলে পুলিশ ও প্রশাসন দাবি করেছে, সেটি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মধ্যে পড়েছে। 

কিশোরগঞ্জ থানার ওসি আশফাকুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটি সীমান্ত এলাকা। গঙ্গাচড়ার বিষয়ে এখনও কেউ থানাকে কিছু অবগত করেনি। যদি এ ধরনের কোনো বিষয় আসে তাহলে থানা থেকে সহায়তা করা হবে।  

বিচারবিভাগীয় তদন্ত দাবি

এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করেছে বিএনপি। 

রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামছুজ্জামান সামু বলেন, “আমরা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ রাখছি, যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য। এ দেশ সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের। আমরা চাই না, এ দেশে এ ধরনের উগ্রপন্থি লোকজন থাকুক। আমরা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ রাখব, তারা যেন দুষ্কৃতকারীদের খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় নিয়ে আসে।”

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ রংপুর মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক স্বপন কুমার বলেন, “আমি গিয়েছি ওই গ্রামে। সেখানে যা হয়েছে, তা আসলে খুবই ন্যক্কারজনক। জঘন্যতম কাজ হয়েছে সেখানে। কেউ অপরাধ করলে দেশে প্রচলিত আইন আছে, সেই আইনে তার বিচার হতে পারে, বিচারে সাজা হতে পারে। 

“কিন্তু এভাবে মানুষের বাড়িঘরে হামলা তো কাম্য নয়। আমরা সবাই একসঙ্গে থাকতে চাই। ছেলেটি দোষী না হলে, তাকে তার বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। আর যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সেটি রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে।” 

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রংপুর মহানগর কমিটির সভাপতি ফখরুল আলম বেঞ্জু বলেন, “বিগত সরকারের সময় থেকেই একটি চক্র এই ঘটনা ঘটিয়ে চলছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। ন্যাক্কারজনক এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। আমি মনে করি, এর বিচারবিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত। যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।” 

আরও পড়ুন:

রংপুরে হিন্দু বাড়িঘরে হামলা: দুই দিনেও মামলা হয়নি, গ্রেপ্তার নেই

রংপুরের ২২টির মধ্যে ১৯টি হিন্দু পরিবার বাড়িতেই আছে: ডিসি

গঙ্গাচড়ায় হিন্দুদের বাড়িঘর মেরামত করে দিচ্ছে প্রশাসন

রংপুরে 'ধর্ম অবমাননার' অভিযোগে কিশোর গ্রেপ্তার, ১৫ বাড়িতে ভাঙচুর

গঙ্গাচড়ায় হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগরে বিক্ষোভ