Published : 22 Sep 2025, 07:41 PM
নানা ঘটনায় উত্তেজনা ও অস্থিরতার মধ্যে রাকসু নির্বাচন পিছিয়ে ১৬ অক্টোবর নতুন দিন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
দিনভর নানা ঘটনার পর সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-রাকসু নির্বাচন কমিশন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ভোটের নতুন তারিখের কথা জানায়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কমিশন জরুরি সভায় বসেছিল জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সভায় রাকসু, হল সংসদ ও সিনেটে ছাত্রপ্রতিনিধি নির্বাচনপূর্ব উদ্ভূত পরিস্থিতি সার্বিকভাবে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়।
“এ সভা লক্ষ্য করে যে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরাজমান পরিস্থিতি কোনো অবস্থাতেই রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুকূলে নয়।”
এজন্য দুটি কারণের কথা বলেছে নির্বাচন কমিশন।
প্রথমত বলা হয়েছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলছে।
দ্বিতীয়ত. নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক/কর্মকর্তা/কর্মচারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়নি।
সবশেষ নির্বাচন কমিশন তাদের বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, “এসব বিবেচনায় রাকসু নির্বাচন উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার স্বার্থে কমিশন ২৫ সেপ্টেম্বরের পরিবর্তে আগামী ১৬ অক্টোবর, রোজ বৃহস্পতিবার রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।”

বৃহস্পতিবারই ভোট চেয়েছিল ছাত্রশিবির
বিকালে রাকসু কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মুস্তাকুর রহমান জাহিদ ২৫ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণের দাবি জানিয়েছিলেন।
ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের এই ভিপি প্রার্থী বলেন, “হেরে যাওয়ার ভয়েই তারা ভোট পিছানোর অপরাজনীতি করছে। ২৫ সেপ্টেম্বর নির্বাচন পিছালে শিক্ষার্থীদের রাকসু নিয়ে যে আবেগ সেটা হারিয়ে যাবে।
“আর শিক্ষার্থীরা মূলত বাসায় চলে যাচ্ছে ২৫ তারিখ রাকসুর যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে সেটির কারণে। নির্বাচন কমিশনের এক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান জানানো উচিত।”

‘শিক্ষক লাঞ্ছণা’য় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ক্যাম্পাসে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের ডাকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ চলছে। ফলে রাকসু নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে শঙ্কা দেখা দেয়।
এর মধ্যে বিকালে জামায়াতে ইসলামিপন্থি শিক্ষকরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-রাকসু নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানান। জামায়াতে ইসলামীপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পরিষদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি জে এ এম সকিলউর রহমান এ ঘোষণা দেন।
‘ভোট পূজার পরে হোক’
‘শিক্ষক লাঞ্ছিতের’ ঘটনায় ক্যাম্পাসে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’, শিক্ষার্থীদের হল ও মেস ছেড়ে চলে যাওয়ায় পরিস্থিতির মধ্যে রাকসু নির্বাচন পেছানোর দাবি জানিয়েছে ছাত্রদল।

ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী শেখ নুর উদ্দিন আবীর বলেন, “আমাদের নির্বাচনের তারিখ নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। শতভাগ শিক্ষার্থী উপস্থিতি আমাদের ভাবনার বিষয়। ভোটার ছাড়া নির্বাচন কোনোভাবেই হতে পারে না। শতভাগ ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিতে দরকার হলে ভোট দুর্গা পূজার পরে হোক। আমরা এমনটা চাচ্ছি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পরিবহন মার্কেটে চত্বরে’ ‘পোষ্য কোটা’ ইস্যুতে আবির বলেন, “আমরা বারবার জানিয়েছি ৫ অগাস্টের পরের বাংলাদেশে আর কোনোভাবেই কোটার জায়গা হবে না। সেটা যে নামেই আসুক।”
‘নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে’
ক্যাম্পাসের অস্থিতিশীল পরিবেশ, ‘কমপ্লিট শাটডাউনের’ ফলে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ এবং পূজার ছুটি সামনে রেখে শিক্ষার্থীরা হল ও মেস ছেড়ে যাচ্ছে; এই অবস্থায় তুলনামূলক কম ভোটারের উপস্থিতিতে রাকসু নির্বাচন হলে সেটি ‘প্রশ্নবিদ্ধ ও প্রহসনের’ হবে বলে বার্তা দিয়েছেন অন্তত অর্ধশতাধিক প্রার্থী।
সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেট চত্বরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সচেতন শিক্ষার্থী সংসদ’, ‘রাকসু ফর র্যাডিকাল চেঞ্জ’, ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’, ‘ইউনাইটেড ফর রাইটস’ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
এ ছাড়া এদিন চারটি প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে দ্রুত ‘পোষ্য কোটা’ সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।

তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড রেখে রাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে, ক্যাম্পাসের অস্থিতিশীল পরিবেশ, কমপ্লিট শাটডাউন, পূজার ছুটি সব কিছু বিবেচনা করে রাকসু নির্বাচন কমিশনারকে পরবর্তী পদক্ষেপ অতি দ্রুত নিতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ স্থিতিশীল করে রাকসু নির্বাচন হতে দিতে হবে।
রাকসু নির্বাচনের ইতিহাসে একমাত্র নারী ভিপি প্রার্থী তাসিন বলেন, “শিক্ষার্থীরা অলরেডি বাসায় যাওয়া শুরু করেছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বড় পূজা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছুটির পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত এই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ আমাদের সব প্যানেলের, সকল স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রচারে বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে এবং দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া রাকসু নির্বাচনকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করবে।”
‘কমপ্লিট শাটডাউনে’ ক্যাম্পাস ফাঁকা
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ‘পোষ্য কোটা’ পুনর্বহালের প্রজ্ঞাপন জারির পর একে কেন্দ্র করে পরস্পরবিরোধী পদক্ষেপে তিন ধরে ক্যাম্পাসে যে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার থেকে লাগাতার আন্দোলনের একপর্যায়ে শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবনে শিক্ষক ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। প্রবল আন্দোলনের মুখে ওই দিন গভীর রাতে পোষ্য কোটা স্থগিতের ঘোষণা দেয় প্রশাসন। রোববার সিন্ডিকেটও তা বহাল থাকে। তারপরই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ।

এই অবস্থার মধ্যে রাকসু নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিলেও; যথাসময়ে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতেখারুল আলম মাসুদ।
সোমবার সকালে ‘শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত’ করার ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি অংশ মানববন্ধন করেন। ‘প্যারিস রোডের’ এ মানববন্ধনে পাঁচ শতাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশ নেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ইউট্যাব রাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “শনিবার সন্ত্রাসীরা শিক্ষকদের যেভাবে লাঞ্ছিত করেছে, আমরা যদি এর সুষ্ঠু বিচার না করতে পারি তাহলে ভবিষ্যতে আমাদেরও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।”
রাকসু নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত ১০টা পর্যন্ত প্রচার চলার কথা ছিল।