পথের আলাপন: পর্ব ৪
Published : 10 Jun 2026, 03:55 AM
চোখ মেললেই দেখা যায় কাঁটাতারের বেড়া। ওপাশে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর দিনাজপুর জেলার রাধিকাপুর। সীমান্তরেখার খুব কাছ দিয়ে চলে গেছে রেললাইন। দূর থেকে দাঁড়িয়ে যখন দেখি সেখানে ভারতীয় ট্রেনগুলো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তখন বুকের ভেতরে কোথাও একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভব করি।
দেশভাগের আগে এই রাধিকাপুর আর বাংলাদেশের দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রাম ছিল একই সুতোয় গাঁথা। একই সমাজ, একই সংস্কৃতি আর একই নিশ্বাসের অংশ। সময় বদলেছে, মানচিত্র বদলেছে, কাঁটাতারে ঝুলেছে বিধি-নিষেধের তালা। কিন্তু মানুষের মন কি অত সহজে ভাগ করা যায়?
প্রায় ৩০০ বছর আগের কথা। যখন কোনো কাঁটাতার ছিল না, তখন থেকেই এই রামচন্দ্রপুর গ্রামে বছরে একবার বিশাল এক মেলা বসে। নাম তার ‘শঙ্খবাণী মেলা’। একসময় এই মেলাই ছিল দুই বাংলার মিলনমেলা। রাধিকাপুরের মানুষ আসত রামচন্দ্রপুরে, আবার রামচন্দ্রপুরের মানুষ যেত ওপারে।
আত্মীয়তা আর বন্ধুত্বের এই অটুট বন্ধন এখন কেবল স্মৃতি। রাধিকাপুরের মানুষেরা এখন আর আগের মতো ঢল নামিয়ে ছুটে আসতে পারে না এ মেলায়। তারা ওপার থেকেই হয়তো অপলক চেয়ে থাকে এ জনপদের দিকে, যেখানে একসময় তাদের পূর্বপুরুষদের পদধূলি পড়ত।
কয়েক বছর আগে এক বৈশাখী সকালের কথা। বন্ধু শামীমের আমন্ত্রণে দিনাজপুরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। আমার ঘোরাঘুরির নেশা চিরকালের। পরিকল্পনা ছিল টেরাকোটার কারুকাজে ঠাসা কান্তজির মন্দির দেখব, ইতিহাসখ্যাত রামসাগর, মাতাসাগর আর সুখ সাগরের টলটলে জলের পাড়ে সময় কাটাব। রাজবাড়ীর প্রাচীন দেয়ালগুলোতে হাত বুলিয়ে খুঁজব হারিয়ে যাওয়া রাজকীয় আভিজাত্য। আর রাতের নিস্তব্ধতায় আদিবাসী পাড়ায় গিয়ে দেখব ঝুমুর কিংবা ঝুমটা নাচের ছন্দময় আসর।
কিন্তু নাস্তার টেবিলে বসে শামীম যখন ‘শঙ্খবাণী মেলার’ কথা তুলল, তখন অন্য সব পরিকল্পনা এক নিমেষে গৌণ হয়ে গেল। শামীম জানালো, হিন্দু পঞ্জিকামতে বৈশাখ মাসের প্রথম মঙ্গলবার অথবা শনিবার বিরল উপজেলার রামচন্দ্রপুরে এ মেলা বসে।
শতবর্ষী বিশাল এক বটগাছের সুশীতল ছায়ায় হয় এ মেলার আয়োজন। মেলা প্রাঙ্গণে আছে প্রাচীন কালো এক পাথরের মূর্তি, যাকে ঘিরে হাজারো মানুষের বিশ্বাস আর ভক্তি আবর্তিত হয়। মনবাসনা পূরণের তীব্র আকুলতা নিয়ে মানুষ মেলায় ভিড় জমায়। বৈশাখি রোদে তপ্ত দুপুরের কথা শুনেই আমি আর দেরি করলাম না। দিনাজপুর শহর থেকে অটোরিকশায় চড়ে বসলাম বিরলের উদ্দেশ্যে।
জীর্ণশীর্ণ গ্রাম্য রাস্তা। মাথার ওপর বৈশাখের কাঠফাটা রোদ। কিন্তু দুপাশের দৃশ্য এতটাই মনোরম যে, গরমের কষ্টটা গায়ে লাগে না। অটো চলছে ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে, আর আমি দুচোখ ভরে দেখছি বরেন্দ্র অঞ্চলের রুক্ষ অথচ মায়াবী সৌন্দর্য। চারপাশে আদিগন্ত সবুজ ধানক্ষেত। স্তরে স্তরে সাজানো সবুজ গালিচার মতো ধানক্ষেতগুলো যখন দমকা বাতাসে দুলতে থাকে, মনে হয় প্রাণের উথালপাতাল ঢেউ খেলছে পুরো চরাচরজুড়ে।
পথের পাশে চোখে পড়ে সারিবদ্ধ লিচু বাগান। ঝাঁকড়া পাতার আড়ালে থোকায় থোকায় ঝুলে আছে কচি লিচু। শামীম পাশ থেকে জানালো, বিরলের মাদরাজী আর বোম্বাই লিচুর খ্যাতি দেশজুড়ে। মে-জুন মাসে যখন লিচুগুলো পেকে টকটকে লাল হয়, তখন গ্রামগুলো স্বর্গীয় রূপ পায়। বাগানমালিকেরা তখন ব্যস্ত থাকেন লিচু পাড়ায়। মনে মনে ঠিক করে ফেললাম, আবার আসব। লিচুর ঘ্রাণে ম ম করা গ্রামগুলোতে অন্তত একবার না এলে জীবনটাই অপূর্ণ থেকে যাবে।
মিনিট চল্লিশের যাত্রা শেষে আমরা পৌঁছালাম ভারাডাংগি বাজারে। এখান থেকে আসল মেলার গন্তব্য আরও পাঁচ কিলোমিটার দূরে। পাকা রাস্তা শেষ, এখন শুরু মেঠোপথ। শামীম প্রস্তাব দিল মহিষের গাড়িতে যাওয়ার। আধুনিক যুগে এসে মহিষের গাড়ির চাকা এখন বিলুপ্তপ্রায়। আমি একবাক্যে রাজি হয়ে গেলাম। কাঠের বড় বড় চাকা, তার ওপর বাঁশের মাচান। চালক তার দীর্ঘ লাঠি দিয়ে মহিষ দুটোকে হাঁকিয়ে নিয়ে চললেন।
চাকা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত ‘ক্যাঁচ ক্যাঁচ’ শব্দ তৈরি হতে লাগল। ধীরগতির সেই দুলুনি আমাদের দেহের পাশাপাশি মনকেও দোলা দিয়ে গেল। রাস্তার ধুলো উড়ছে, দুপাশে ছোট ছোট মাটির ঘর, আর দূরে দেখা যাচ্ছে মেলার সেই সুবিশাল বটগাছের মাথা। অদ্ভুত প্রশান্তি ঘিরে ধরল আমাকে। যান্ত্রিক পৃথিবীর সব কোলাহল যেন পেছনে ফেলে আমরা এক আদিম আর অকৃত্রিম সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ করছি।
শঙ্খবাণী মেলায় যখন পৌঁছালাম, তখন দুপুর ঠিক মাথার ওপরে। কিন্তু মেলা প্রাঙ্গণে রোদের তেজ নেই। কারণ সেই সুবিশাল বটগাছ। তার ঝুরিগুলো মাটির গভীরে প্রোথিত হয়ে একেকটি স্তম্ভের রূপ নিয়েছে। গাছটিই যেন মেলার রক্ষাকর্তা, যেন পরম মমতায় আগলে রেখেছে আসা হাজারো মানুষকে। মেলার আয়োজন আমি যা ভেবেছিলাম, তার চেয়ে বহুগুণ বড়। লোকজ জীবনের এমন প্রাণবন্ত প্রকাশ আধুনিক নগরে খুঁজে পাওয়া দায়।

বটগাছের ছায়ায় সারি সারি দোকান। শিশুদের খেলনার দোকানে উপচে পড়া ভিড়। মাটির টমটম গাড়ি, কাঠের লাটিম, বাঁশের বাঁশি আর টিনের চশমা—কী নেই সেখানে! প্লাস্টিকের ভিড়ে আজও যে কাঠের খেলনার প্রতি শিশুদের আকর্ষণ, তা দেখে ভালো লাগল। মেলা মানেই তো শৈশবে ফিরে যাওয়া। মেলার আরেক কোণে শাঁখা আর কাচের চুড়ির দোকানে তরুণীদের ভিড়। চুড়ির টুংটাং শব্দ আর তাদের হাসাহাসি মেলায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কেউ কেউ দোকানির কাছে জেদ ধরছে, হাতেই পরিয়ে দিতে হবে পছন্দের শাঁখাটি। শাঁখার সাদা রঙ যেন সেই শঙ্খবাণীর পবিত্রতারই প্রতীক।
একপাশে রঙিন শামিয়ানা টাঙিয়ে বসেছে মিষ্টির দোকান। সেখানে মাটির চুলায় বড় কড়াইয়ে ফুটছে তেল। পাম্প চুলার শোঁ শোঁ শব্দ ছাপিয়ে ভেসে আসছে গরম জিলাপির সুবাস। কেউ আখের গুড়ের জিলাপি ভাজছে, কেউ বানাচ্ছে রসের চমচম আর ছানার সন্দেশ। জিলাপি না খেলে যেন মেলা দেখা সম্পূর্ণ হয় না। মাটির সানকিতে গরম গরম জিলাপি নিয়ে বসে পড়ছে মানুষ। ফুঁ দিয়ে সেই রসে টইটম্বুর জিলাপি খাওয়ার আনন্দই আলাদা।
এক কোণে বসে একজন প্রবীণ মানুষ তালের পাখা আর কাঁসার প্রদীপ বিক্রি করছেন। প্রখর রোদে সেই তালপাতার পাখাগুলো পরম স্বস্তি হয়ে নেমে এসেছে সবার কাছে। মেলার ঠিক মাঝখানে ছোট একটি মন্দির। এটাই শঙ্খবাণী মন্দির। মনবাসনা পূরণের ইচ্ছা নিয়ে শত শত লোক লাইনে দাঁড়িয়ে আছে।
সবার হাতে পাতায় মোড়ানো ধূপ, সিঁদুর আর বাতাসা। কেউ কেউ মানত পূরণ হওয়ায় শঙ্খবাণী মূর্তির জন্য রুপা বা সোনার পাদুকা নিয়ে এসেছেন। ভক্তদের এ অটুট বিশ্বাস দেখে আমি অভিভূত হলাম। মন্দির সংলগ্ন জনশ্রুতি শুনতে আমি কথা বলি পূজারী ফগেন্দ্র নাথ চক্রবর্তীর সঙ্গে। তিনি শোনালেন এই স্থানের অলৌকিক আখ্যান।
প্রচলিত লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, শত শত বছর আগে এখানে এক প্রতাপশালী রাজা ছিলেন। তার একমাত্র আদরের মেয়ের নাম ছিল ‘শঙ্খবাণী’। একদিন রাজবাড়ির পাশ দিয়ে এক শাঁখারি যাচ্ছিলেন শাঁখা ফেরি করতে। রাজকন্যা শঙ্খবাণী স্নানঘরে কাপড় কাচছিলেন। শাঁখারির হাঁক শুনে চঞ্চল হয়ে উঠলেন তিনি। কোনো কিছু না ভেবেই তিনি শাঁখারির কাছ থেকে শাঁখা কিনে হাতে পরলেন। কুমারী মেয়ের হাতে শাঁখা পরা সেসময় ছিল সামাজিক অপরাধের শামিল।
খবরটি রাজার কানে পৌঁছলে তিনি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন এবং তলোয়ার নিয়ে মেয়েকে আক্রমণ করতে যান। বাবার এ নিষ্ঠুর আচরণে ব্যথিত হয়ে রাজকন্যা শঙ্খবাণী রাজবাড়ির পাশের দীঘিতে ঝাঁপ দেন। ঝাঁপ দেওয়ার মুহূর্তে তিনি রাজাকে বলে যান, “আজ তুমি আমাকে অপমান করলে, একদিন এই আমিই দেবী হয়ে তোমার সামনে দাঁড়াব এবং তুমি আমাকেই পূজা করবে।”

কথিত আছে, তারপর একদিন সেই দীঘির জল থেকে কালো পাথরের এক জ্যোতির্ময় মূর্তি ভেসে ওঠে। সেই থেকেই শুরু হয় শঙ্খবাণী পূজা। মানুষের বিশ্বাস, রাজকন্যার সেই অতৃপ্ত আত্মা আর অলৌকিক শক্তি আজও এখানে বিরাজমান এবং যে যা চায়, মা তাকে তা-ই দেন।
হঠাৎ মন্দির প্রাঙ্গণে ঢোল আর বাঁশির সুর চড়ে গেল। মন্দির চত্বরে অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল। দেবংশী চন্দ্রকান্ত রায় মন্ত্রপাঠ করছেন উচ্চস্বরে। কয়েকজন ঊর্ধ্বাঙ্গে কোনো বস্ত্র ছাড়াই হাতের তালুতে কবুতর নিয়ে নাচ শুরু করলেন। একে বলা হয় ‘দেবতা ভর করা’। তাদের নড়াচড়া আর চাহনিতে আবেশিত ভাব। পূজা শেষ করে দেবংশী তাদের ভোগ খাওয়ালেন এবং মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনলেন। এ প্রথাটি আদিম বাংলার লোকজ বিশ্বাসের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
মেলার এক কোণে দেখা হলো সেতাবগঞ্জ থেকে আসা মালতি রাণীর সঙ্গে। ষাটোর্ধ্ব এই বৃদ্ধা নাতনির জন্য বাতাসা আর খাজা কিনছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “মা, শঙ্খবাণীর কাছে কী চাইলেন?” তিনি কেবল একগাল হাসলেন। বললেন, “মনবাসনার কথা কইতে নেই বাবা, মা সব জানেন।” এই সরল বিশ্বাসই বোধহয় আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি।
দুপুরের খাওয়ার জন্য আমরা মেলার ভেতরেই একটি অস্থায়ী হোটেলে ঢুকলাম। মেন্যু ছিল খুদকুঁড়ার খিচুড়ি আর কবুতরের মাংস। কলার পাতায় পরিবেশিত সেই ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ির স্বাদ আজও আমার জিভে লেগে আছে। মাটির উনুনে রান্না করা এ খাবারের স্বাদ যে কোন পাঁচ তারকা হোটেলের চেয়েও বহুগুণ বেশি মনে হলো। প্রতি বছর বৈশাখ এলে উত্তরবঙ্গের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে এই একটি দিনের জন্য। একে অপরকে হাঁক দিয়ে বলে ওঠে, ‘চল কেনে বাহে শঙ্খবাণী মেলাত’।
বিকেল যত গড়াচ্ছে, ভিড় তত বাড়ছে। তিল ধারণের জায়গা নেই। হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ ভুলে হাজার হাজার মানুষ শামিল হয়েছে উৎসবে। সাইকেল, ভ্যান, মহিষের গাড়ি আর মোটরবাইকের দীর্ঘ লাইন রাস্তার দুপাশে। সবাই যেন এক অজানা টানে ছুটে আসছে শঙ্খবাণীর চরণে। সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়ছে, আমরা ফেরার পথ ধরলাম।
অন্ধকার নামার আগে মহিষের গাড়িতে করে যখন আবার ফিরে আসছি, তখন কানে বাজছে মেলার সেই দূরবর্তী কোলাহল আর ঢোলের শব্দ। বিরলের সেই সবুজ ধানক্ষেত আর লিচুবাগানগুলো এখন আধো-অন্ধকারে ঢাকা। কিন্তু মনের পর্দায় ভাসছে শঙ্খবাণীর সেই কালো পাথরের মূর্তি আর শতবর্ষী বটগাছের মায়াবী ছায়া। ওপারের রাধিকাপুরে হয়তো তখনও কেউ দাঁড়িয়ে শুনছিল ঢোলের এই ক্ষীণ শব্দ।