দেখা হবে মারাদোনার সঙ্গে!

মনের চোখে, স্পর্শহীন অনুভবে ঠিকই দেখা হবে কিংবদন্তির সঙ্গে! তার নামটি যে পাথরে লেখা নয়, হৃদয়ে খোদাই করা।

মোহাম্মদ জুবায়েরমোহাম্মদ জুবায়েরদোহা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 21 Nov 2022, 12:30 PM
Updated : 21 Nov 2022, 12:30 PM

বইতে শুরু করেছে বিশ্বকাপের বাতাস। দোলা দিতে শুরু করেছে দিয়েগো মারাদোনার স্মৃতি।

এই তো, আর্জেন্টিনার জয়ে বাঁধনহারা উল্লাসে মেতে উঠেছেন তিনি। খুশিতে আত্মহারা হয়ে মোটাসোটা শরীরটাকে এলিয়ে দিচ্ছেন, নেচে উঠছেন ট্যাঙ্গোর তালে। রাগে-ক্ষোভে ফুসে উঠেছেন কখনও। আবার হেরে গেলে শিশুর মতো ঠোট-মুখ ফুলিয়ে কেঁদে ব্যাকুল। খুব চেনা এই দৃশ্যগুলো খোলা চোখে দেখা যাবে না কাতার বিশ্বকাপে, কিন্তু মনের চোখে, স্পর্শহীন অনুভবে যে ঠিকই দেখা হবে তার সঙ্গে! তার নামটি যে পাথরে লেখা নয়, হৃদয়ে খোদাই করা।

দুই বছর আগে এই নভেম্বরে (২৫ নভেম্বর) সব চিকিৎসা, সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের আকুল প্রার্থনা ব্যর্থ করে দিয়ে না ফেরার দেশে তার চলে যাওয়া। কিন্তু চলে যাওয়া মানেই তো হৃদয় থেকে হারিয়ে যাওয়া নয়। তাই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ম্যাচ মাঠে গড়াতে ভাবনার অলিন্দে উঁকি দেবে তার ১৯৮৬ বিশ্বকাপের অবিশ্বাস্য সাফল্য, ১৯৯০ বিশ্বকাপের না পারা, নামের ভারে একটা সময় কুঁকড়ে গিয়ে পথ হারিয়ে কোকেন আসক্ত হওয়া, কিংবা শৈশবে নালায় পড়ে বেঁচে ফিরে অর্জনের সপ্তমাকাশে ওঠার মতো কত-শত স্মৃতি।

মেসি-দি মারিয়াদের ম্যাচের পরতে পরতে চেনা কোনো দৃশ্যের দেখা মিললেই উঠে আসবে মারাদোনার স্মৃতি। এই মরুভূমির কোনো এক রোদেলা দুপূরে কিংবা পড়ন্ত বিকেলে মেসি-দিবালা কিংবা অন্য কেউ লাফিয়ে উঠে হাত দিয়ে যদি গোলরক্ষককে পরাস্ত করে আরেকটি ‘হ্যান্ড অব গড’ বিতর্কের জন্ম দিয়ে বসেন, কিংবা যদি প্রতিপক্ষের পাঁচ খেলোয়াড়কে দৃষ্টিনন্দন ড্রিবলিংয়ে, চকিত চমকে ডজ দিয়ে বল নিয়ে বেরিয়ে গিয়ে লিখে বসেন ‘গোল অব দা সেঞ্চুরির’ মতো আরেকটি গল্প, তখন ১৯৮৬ বিশ্বকাপের মারাদোনা ঠিকই এক লহমায় চলে আসবেন ভক্তদের মুখে; তাবৎ দুনিয়ার গণমাধ্যমের শিরোনামে। চারদিকে বয়ে যাবে গুণ-গানের নহর।

বোধহয় ব্যতীক্রম থাকবে ইংলিশরা! নিশ্চিতভাবে ’৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালের দুঃসহ স্মৃতি তাড়িয়ে ফিরবে তাদের। ‘গোল অব দা সেঞ্চুরি’ কাণ্ডের পুনরাবৃত্তি হলে অবশ্য ভিন্ন কথা। কিন্তু ‘হ্যান্ড অব গড’ হলে বোধহয় মারাদোনার আর রেহাই নেই। সেদিনের পরাজিত গোলরক্ষক পিটার শিলটন হয়ত আবারও প্রতারণার দায়ে শুলে চড়াবেন মারাদোনাকে। হয়ত তাকে তুলোধুনো করতে কলম তুলে ধরবে ইংলিশ গণমাধ্যম। পিছিয়ে থাকা লাতিন আমেরিকার জনপদে যেটি ‘চাতুর্য্য’, সেটিই ইউরোপের দৃষ্টিতে যে ‘প্রতারণা’।

এবারের কাতার বিশ্বকাপে কেউ যদি ডোপ টেস্ট উৎরাতে না পারেন, কিংবা মেজাজের লাগাম মুঠোয় রাখতে ব্যর্থ হয়ে কোনো গণমাধ্যমকর্মীকে দু-চারটা কিল-ঘুষি বসিয়ে দেন, তখনও তেড়েফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে তার স্মৃতি এবং প্রতিবেদনের পরতে পরতে থাকবে ‘বেয়াড়া এক কিংবদন্তির’ কাহিনী, যে কাহিনীর ছত্রে-ছত্রে থাকবে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ। এমনকি হাভানা চুরুট ফুঁকতে-ফুঁকতে দোহার রাস্তায় কাউকে ধোঁয়ার কুণ্ডুলি পাকাতে দেখা গেলেও স্মৃতিপটে ভেসে উঠবেন তিনি!

কিংবা যদি অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতি কাতারের বিরূপ আচরণ, নিপীড়ণ এবং এই ইস্যুতে ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা ফিফার নিরবতা নিয়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন কেউ, উগরে দেন ক্ষোভ, তখনও কি ফিরে আসবে না বিদ্রোহী মারাদোনার স্মৃতি? ফুটবলের ইতিহাসে এমন চরিত্র যে নেই আর একটিও। একই সঙ্গে তিনি নায়ক, প্রতিবাদী, বিপথগামী, কারো কারো কাছে ভিলেনও।

অথচ মারাদোনা হতে চেয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। তাও আবার কলকারখানার ইঞ্জিনিয়ার! কিন্তু দারিদ্রতার কষাঘাত প্রকাশ্যে এবং নিয়তি কলকাঠি নাড়ল আড়াল থেকে। বই-পুস্তকের প্রথাগত পড়াশোনা কপালে জোটেনি, তিনি এলেন ফুটবলে এবং ফুটবলও পেয়ে গেল তারা সেরা শিল্পীদের একজনকে।

বুয়েন্স এইরেসের অলিগিলি, ধুলোমাখা পথ, আর্জেন্টিনোস জুনিয়র দলের আঙিনা তার জন্য হয়ে উঠল ইচ্ছে মতো ছবি আঁকার খাতা। কিশোর বয়সে বল আকঁড়ে ধরে রাতে ঘুমোতেন, দিনের বেলায় ফোটাতেন গোলের ফুল। সেই সৌরভ ছড়িয়ে পড়ত চারদিক। আর্জেন্টিনোস জুনিয়রের জার্সিতে মারাদোনার একটি গোলের ছবির মতো বর্ণনা বিখ্যাত লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানো দিয়েছেন দারুণভাবে।

“সতীর্থ গোলরক্ষকের কাছ থেকে বল পেলেন, প্রতিপক্ষের সেন্টার ফরোয়ার্ডকে কাটালেন, উড়াল দিলেন। প্রতিপক্ষের একাধিক খেলোয়াড় তার পথ আগলে দাঁড়াল। প্রথম জনের মাথার উপর দিয়ে, দ্বিতীয় জনের দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে বল বের করে নিলেন, তৃতীয় জনকে বোকা বানালেন ব্যাক হিলে এবং এরপর কোনো বিরতি না নিয়ে ছুটলেন, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের অসাড় করে দিয়ে এবং সবশেষ গোলরক্ষককে ভূপাতিত করে জালে জড়িয়ে দিলেন বল। মাঠে তখন বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে আছে রিভার প্লেটের সাত খেলোয়াড়, বাকি চার জন হা করে আছে বিস্ময়ে।”

গোল মারাদোনার পায়ে আসতে থাকল বানের স্রোতের মতো, অগণিত। জয়ও ধরা দিতে থাকল একের পর এক। শ’খানেক ম্যাচ জেতা আর্জেন্টিনোস জুনিয়র দলটি (নাম ছিল সেবোয়িতাস) নজর কাড়ল স্থানীয় গণমাধ্যমের। সংবাদ কর্মীদের প্রশ্নের উত্তর দলটির এক খেলোয়াড় ‘পয়জন’-এর বয়ানে গালিয়ানো তার বইতে তুলে ধরেছেন।

“আমরা আনন্দের জন্য খেলি। আমরা কখনও অর্থের জন্য খেলিনি। যখন এর মধ্যে টাকা-পয়সা ঢুকবে, সবাই তারকা হওয়ার জন্য নিজেকে শেষ করে দিবে এবং তখন ঈর্ষা ও স্বার্থপরতা সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিবে।”  

কথাগুলো ১৩ বছরের কিশোরটি বলেছিল ১২ বছর বয়সী মারাদোনাকে জড়িয়ে ধরে। এমনই নিঃস্বার্থ জীবন, উন্মুক্ত বিহঙ্গ হতে চেয়েছিলেন মারাদোনা। জীবন তাকে তা দেয়নি।

এক সময় তাই প্রত্যাশার চাপ, নিজের নামের ভার আর বইতে পারেননি। নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে হয়ে উঠেছিলেন দুর্বিনীত, একগুঁয়ে, আত্মঘাতী। বেহিসেবি হয়ে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছেন অন্ধকারের চোরাগলিতে। পথ হারিয়ে মুক্তির আশ্রয় খুঁজেছেন মরণ নেশা কোকেনে। পার করেছেন নির্ঘুম রাত। একটু নিদ্রার আশায় একের পর এক গিলেছেন ঘুমের বড়ি। এরপর ২০২০ সালে তো চলেই গেলেন চিরঘুমের দেশে!

কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ম্যাচের সময়ও কি ঘুমিয়ে থাকবেন মারাদোনা? নাকি জেগে উঠবেন, ফিরে আসবেন গ্যালারিতে। যেমন করে সর্বনাশা কোকেন ছেড়েছুঁড়ে ফিরেছিলেন, ২০১০ বিশ্বকাপে হয়েছিলেন আর্জেন্টিনার কোচ। পরের আসরগুলোতে মেসি-দি মারিয়াদের জন্য যেমন করে গলা ফাটিয়েছেন সমর্থকদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে, কখনও বা উত্তরসূরিদের ব্যর্থতায় তীর্যক মন্তব্য করেছেন, কিংবা আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনকে ধুয়ে দিয়েছেন ইচ্ছে মতো, ঠিক তেমন করে আপন হয়ে ফিরবেন কি?

হয়ত তিনি ফিরবেন। মরু পথ ধরে কোনো এক বেদুইনের বেশে, খরতাল বাজাতে বাজাতে, অচেনা আরবীয় সুরে গাইতে গাইতে। গ্যালারির কোনো এক কোণে বসে, সাধারণের সাথে মিশে, আগের মতোই মেসিদের গোলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়বেন। হাত-পা এদিক-ওদিক ছুঁড়বেন আত্মহারা হয়ে। আর্জেন্টিনার জয়ে আনন্দাশ্রু ঝরবে তার কপোল বেয়ে, দলের ব্যর্থতায় কেঁদে বুকও ভাসাবেন। সমর্থকদের তৃষ্ণার্ত চোখ গ্যালারিতে খুঁজে ফিরবে তাকে; প্রিয়জনের দেখা না পেয়ে ঝরা পাতার মতো ঝরে পড়বে দীর্ঘশ্বাস।

যে বন্দরে চিরতরে নোঙর ফেলেছেন মারাদোনা, সেখান থেকে কেউ ফেরে না। তবুও দেখা হবে তার সঙ্গে। বিখ্যাত কবি কাহলিল জিবরান যে তার ‘স্যান্ড অ্যান্ড ফোম’ কবিতায়  লিখেছেন, “Remembrance is a form of meeting”,  বাংলায় যার অর্থ-মনে পড়াও তো একরকম দেখা হওয়া।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক