‘মারাদোনাকে চাই’ আর্জেন্টিনার

যে কোনো মূল্যে মেক্সিকো ম্যাচে দলকে পথ দেখাতে হবে লিওনেল মেসির।

মোহাম্মদ জুবায়েরমোহাম্মদ জুবায়েরদোহা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 26 Nov 2022, 05:50 AM
Updated : 26 Nov 2022, 05:50 AM

মহানায়কের প্রয়াণ দিবসের পরদিন আর্জেন্টিনার ‘বাঁচা-মরার’ লড়াই। হারলেই বিদায় নিতে হবে প্রথম রাউন্ড থেকে। এমন সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের জন্য দিয়েগো মারাদোনা সবসময়ই প্রাসঙ্গিক। তার খেলোয়াড়ি জীবনে এমন কত কঠিন সমীকরণই তো মিলিয়েছেন। জাতীয় দলে এখনও এই কিংবদন্তির ছায়ায় থাকা লিওনেল মেসির সামনে সুযোগ আপন আলোয় বেরিয়ে আসার। এর জন্য যে কোনো মূল্যে তাকে পথ দেখাতে হবে মেক্সিকোর বিপক্ষে।

লুসাইল স্টেডিয়ামে শনিবার দ্বিতীয় ম্যাচে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। খেলা শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত ১টায়। এই মাঠেই সৌদি আরবের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হেরেছিল দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।

এর আগের দিনটা বিষাদে ভরা। সকাল, তপ্ত দুপুরে, বিকেলের অস্তরাগে, সন্ধ্যের ঝড়ো বাতাসে হু হু শব্দে যেন বেজে চলেছে করুণ বিউগল। উড়তে থাকা পাখির ঝাপটানো ডানায় প্রিয়হারা বেদনার করুণ সুর, তাকে ফিরে পাওয়ার আর্তিও। আজ যে তার চলে যাওয়ার হয়ে গেল ‍দুই বছর। সময় এমনই স্রোতস্বিনী!

তিনি দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনা। বুয়েন্স এইরেসের ধুলোমাখা পথ ঘুরে নেপলস হয়ে মেক্সিকোর আজতেক পর্যন্ত সাফল্য কুড়ানো এক যাযাবর শিল্পী এবং সারা দুনিয়ার মানুষের মন জয় করা ফুটবলার। তিনি ছিলেন আগ্নেয়গিরি মতো প্রতিবাদী, বর্ণিলতায়-বৈচিত্রতায় তুলনাহীন, সীমাহীন বেয়াড়া, কখনও আত্মঘাতী। পোড় খাওয়াদের ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণার উৎসও নন কী? মেসি-দি মারিয়ারাও তো আজ সেই দলেই!

সৌদি আরবের কাছে ধরাশায়ী হয়ে কাতার বিশ্বকাপ শুরু করা আর্জেন্টিনার এবারের প্রতিপক্ষ মেক্সিকো। যারা রবের্তে লেভানদোভস্কির পেনাল্টি ঠেকিয়ে দিয়ে ড্র করেছে পোল্যান্ডের বিপক্ষে।

‘সি’ গ্রুপের এই দুই ম্যাচের পর মেট্রোর ভেতরেও দেখা মেলে ভিন্ন দৃশ্যের। ‘মেক্সিকানো, মেক্সিকানো’ চিৎকারে গলা ফাটাচ্ছেন দলটির সমর্থকরা। ঠিক তাদের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে অশ্রুসংবরণে ব্যস্ত আর্জেন্টাইনরা। প্রতিবাদের সুযোগ নেই, শুধু সয়ে যাওয়া ছাড়া।

গণমাধ্যমে খবর এসেছে, মেট্রোতে দেখা উদযাপনের ওই দৃশ্যতেই শেষ নয়। ঘটনা গড়িয়েছে বহুদূর। মেক্সিকানদের ঠাট্টা-বিদ্রুপ সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় এক পর্যায়ে বেঁধে গেছে দুই পক্ষের। বিক্ষিপ্তভাবে ধাক্কাধাক্কি, হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে দোহার রাস্তায়, ফ্যান জোনে। সে ভিডিও হয়েছে ভাইরাল। লুসাইল স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে থাকবে দুই পক্ষই, বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রতিশোধের উদগ্র বাসনা নিয়ে।

আর্জেন্টিনার জন্য এটি বাঁচা-মরার লড়াই। হারলেই আর রক্ষে নেই, বেজে যাবে বিদায় ঘণ্টা। বিস্ময় ছড়িয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ টেবিলে শীর্ষে বিশ্ব ফুটবলের পেছনের বেঞ্চের ছাত্র সৌদি আরব। ১ করে পয়েন্ট পোল্যান্ড ও মেক্সিকোর। ১৯৮৬ সালের পর মুকুট ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে, অনেক প্রত্যাশার বেলুন উড়িয়ে কাতারে আসা আর্জেন্টিনার খাতা শূন্য। তা পূর্ণ করতে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন নম্বর মাঠে কোমর বেঁধে অনুশীলন সেরেছে লিওনেল স্কালোনির দল।

এখানকার পরিবেশ এমনিতেই শান্ত। কোলাহল মুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে গাড়ি-ঘোড়ার আনাগোনা নেই বললে চলে। শুক্রবার সন্ধ্যায় আর্জেন্টিনার অনুশীলন ক্যাম্পের আবহ অন্যদিনের মতো প্রাণবন্ত নয়। মারাদোনাকে হারানোর দুই বছর হয়ে যাওয়ার বিষাদ, এর পরতে পরতে। সঙ্গে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ার শঙ্কা তো আছেই।

গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য বরাবরের মতোই বরাদ্দ ১৫ মিনিট। এরপর শুরু হবে মেসি-দি মারিয়াদের মূল অনুশীলন। সৌদি আরব ম্যাচে দশম মিনিটে এগিয়ে যাওয়ার পর কোথায় কোথায় ভুল হলো, মাঝমাঠের সুর হঠাৎ কেন উধাও হয়ে গেল, কেন এতবার পড়তে হলো অফসাইডের ফাঁদে, এত শক্তিশালী আক্রমণভাগ কেন দিশাহীন হয়ে গেল, সব ফাঁক ফোকর স্কালোনি ঠিক করে নেবেন শেষ বারের মতো।

এই প্রস্তুতির আগে কাতার ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনি অবশ্য আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের স্বস্তির বার্তা দেন মেসিকে নিয়ে। অধিনায়ককে ঘিরে চাউর হওয়া চোটের গুঞ্জন, অনুশীলনে না নামার খবর উড়িয়ে দেন।

সন্ধ্যেয় পারেদেস-দি মারিয়াদের সঙ্গে অনুশীলনও করেছেন অধিনায়ক। তাতে মেক্সিকোর বিপক্ষে মহারণে ৩৫ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের খেলার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে আরও।

শুধু খেললে হবে না, মেক্সিকো ম্যাচে অবধারিতভাবে আলো ছড়াতে হবে মেসিকে। গোল করে, ‍আক্রমণের সুর বেঁধে দিয়ে, নেতার মতো সতীর্থদের উজ্জীবিত করে পথ দেখাতে হবে আর্জেন্টিনাকে। না হলে সর্বনাশ।

দোহার ‘কনমেবল ট্রি অব ড্রিমস’-এ প্রায়ত মারাদোনাকে স্মরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে এসে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে যার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে শিরোপা উৎসবে মেতেছিলেন মারাদোনা, সেই হোর্হে বুরুচাগা পরিষ্কার বলে গেছেন, আর্জেন্টিনার সামনে আর ভুলের সুযোগ নেই।

১৯৮৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে জয়ে শেষ দিকে জয়সূচক গোলটি করা হোর্হো বুরুচাগা উত্তরসূরি মেসির কাছেও জানিয়ে গেছেন প্রত্যাশা।

“আশা করি, আগামীকাল লিও (মেসি) সেই খেলাটা খেলবে, যা সবাই চায়।”

হয়ত ‘কনমেবল ট্রি অব ড্রিমস’-এর ওই স্মরণ অনুষ্ঠানে এসে শূন্যলোকে পাড়ি জমানো সতীর্থ মারাদোনার বার্তাই যেন মেসিকে পৌঁছে দিয়ে গেলেন বুরুচাগা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক