১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

দারিদ্র্যের ফাঁদে নতুন মানুষ, কোথায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবলয়?

বিশ্ব ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

দারিদ্র্যের ফাঁদে নতুন মানুষ, কোথায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবলয়?

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি মানুষের আয়, চাকরি ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে না পারে, তাহলে উন্নয়নের সাফল্য অসম্পূর্ণ থাকে। ফাইল ছবি

এম এম মুসা এম এম মুসা

Published : 14 Oct 2026, 08:40 PM

Updated : 14 Oct 2026, 08:40 PM

মাসের বাজার করতে গিয়ে একজন নিম্ন আয়ের পরিবারের গৃহকর্ত্রী তালিকা থেকে মাছ বাদ দেন, ডিমের সংখ্যা কমান, সন্তানের জন্য দুধ কেনা পিছিয়ে দেন। ঘরভাড়া, যাতায়াত ও ওষুধের খরচ কমানো যায় না বলে খাবারেই কাটছাঁট করতে হয়। পরিবারের আয় হয়তো আগের মতোই আছে; কিন্তু ওই আয় দিয়ে আগের জীবন আর চলে না। দারিদ্র্য অনেক সময় এভাবেই ফিরে আসে; একবারে নয়, প্রতিদিনের ছোট ছোট বঞ্চনার মধ্য দিয়ে।

৬ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ এই অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক চিত্রের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮.৭ শতাংশ। একই অর্থবছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২২.৮ শতাংশে উঠতে পারে বলে বিশ্ব ব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে। প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে অবস্থান করছেন; মূল্যবৃদ্ধি, অসুস্থতা, দুর্যোগ বা কাজ হারানোর মতো একটি ধাক্কাই তাদের আবার দারিদ্র্যে ঠেলে দিতে পারে।

এই তথ্যের তাৎপর্য শুধু দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, এতটুকু নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি মানুষের আয়, চাকরি ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে না পারে, তাহলে উন্নয়নের সাফল্য অসম্পূর্ণ থাকে। বিশ্ব ব্যাংক বলছে, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ হতে পারে; একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্থবির হয়েছে এবং নারীরা চাকরি হারিয়েছেন। অর্থাৎ, অর্থনীতির মন্থরতা শুধু জাতীয় আয়ের হিসাব নয়; এটি পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সরাসরি আঘাত করছে।

সরকারের জন্য এটি নীতির অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনার সময়। উন্নয়নকে শুধু বড় প্রকল্প, অবকাঠামো বা সামষ্টিক সূচকে বিচার করলে মানুষের বাস্তব সংকট আড়ালে থেকে যায়। দরিদ্র পরিবারের জন্য মূল্যস্ফীতি এক ধরনের অদৃশ্য কর; যাদের আয় কম, তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় হয়। দাম বাড়লে তারা সঞ্চয় করতে পারে না; বরং খাবারের মান কমায়, ঋণ নেয়, সম্পদ বিক্রি করে কিংবা শিশুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যয় কমিয়ে দেয়। এই ক্ষতি পরে সহজে পুষিয়ে নেওয়া যায় না।

মূল্যস্ফীতি কমলেই মানুষের কষ্ট কমে না

বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৭ শতাংশ হয়েছে, আগের অর্থবছরে যা ছিল ১০ শতাংশ। কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; দাম আগের চেয়ে ধীরে বাড়ছে মাত্র। নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধিও নেতিবাচক থাকায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে।

এই পার্থক্য নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে। শুধু গড় মূল্যস্ফীতি দেখলে হবে না; খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন ও ওষুধের দাম নিম্ন আয়ের পরিবারকে কতটা চাপে ফেলছে, তা নিয়মিত পরিমাপ করতে হবে। আয় ও ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন শ্রেণির পরিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা প্রকাশ করা দরকার। একই সঙ্গে বাজারে পণ্যের সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

মূল্যস্ফীতির দায় শুধু ব্যবসায়ীদের ওপর চাপিয়ে দিলেও সমাধান হবে না। কোথাও বাজারে কারসাজি থাকলে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে; আবার সরবরাহের ঘাটতি, আমদানি নীতির অনিশ্চয়তা, পরিবহন ব্যয় বা প্রতিযোগিতার অভাব থাকলে ওইসব কারণও দূর করতে হবে। কৃষক যেন ন্যায্য দাম পান এবং ভোক্তা যেন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির শিকার না হন, সে জন্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ জরুরি।

কর্মসংস্থান ছাড়া দারিদ্র্য কমবে কীভাবে?

বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্থবির। একই সময়ে বিনিয়োগের গতি কমেছে, জ্বালানি অনিশ্চয়তা ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ব্যবসার ওপর চাপ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে সামাজিক সহায়তা জরুরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য কমানোর প্রধান উপায় হলো স্থিতিশীল ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান।

সরকারকে তাই কর্মসংস্থানকে প্রতিটি অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রীয় সূচক করতে হবে। নতুন শিল্পপ্রকল্পের মূল্যায়নে শুধু বিনিয়োগের পরিমাণ নয়, কত স্থায়ী চাকরি তৈরি হবে, নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ কতটা বাড়বে, স্থানীয় সরবরাহকারী কতটা যুক্ত হবে, তা প্রকাশ করা দরকার। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য অর্থায়ন, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, সহজ ব্যবসায়িক অনুমোদন এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে; কিন্তু উচ্চ ঋণব্যয় ও অনিশ্চিত নীতির কারণে তারা সম্প্রসারণ করতে না পারলে নতুন চাকরিও তৈরি হবে না।

নারী কর্মসংস্থানের বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব দাবি করে। বিশ্ব ব্যাংক নারীদের চাকরি হারানোর কথা উল্লেখ করেছে। অর্থনৈতিক সংকটে নারীরা অনেক সময় প্রথমে কাজ হারান, আবার পরিচর্যার দায়িত্ব, নিরাপদ যাতায়াতের অভাব ও কর্মক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতার কারণে কাজে ফিরতেও পারেন না। তৈরি পোশাকের বাইরেও স্বাস্থ্যসেবা, পরিচর্যা অর্থনীতি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ডিজিটাল সেবা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে নারীর জন্য কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে। প্রশিক্ষণ তখনই কার্যকর হবে, যখন তার সঙ্গে বাজারের চাহিদা, চাকরির সংযোগ, শিশুযত্নের সুবিধা এবং নিরাপদ কর্মপরিবহন যুক্ত থাকবে।

তরুণদের ক্ষেত্রেও শুধু প্রশিক্ষণ প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপা উচিত নয়। প্রশিক্ষণের ছয় মাস বা এক বছর পর কতজন চাকরি পেয়েছেন, কতজনের আয় বেড়েছে, কতজন ব্যবসা শুরু করেছেন, এসব তথ্য প্রকাশ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও নিয়োগদাতাদের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা দরকার, যাতে প্রশিক্ষণ বাস্তব শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে মেলে।

সামাজিক সুরক্ষার ফাঁক কোথায়?

বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাগুলোর একটি হলো, দেশের দরিদ্রতম পরিবারের প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। অর্থাৎ, যাদের সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের বড় অংশই সহায়তা পাচ্ছে না। একই সময়ে জ্বালানি, সার ও সামাজিক সুরক্ষায় সম্মিলিত সরকারি ব্যয় জিডিপির প্রায় ৩.৫ শতাংশ হলেও ভর্তুকির উল্লেখযোগ্য অংশ যথাযথভাবে দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায় না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের সবচেয়ে সচ্ছল ২০ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক পায়।

এটি নীতির মৌলিক অসংগতি। জনসম্পদ ব্যয় হচ্ছে, কিন্তু সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সচ্ছল মানুষের কাছে বেশি যাচ্ছে। সরকারের উচিত ভর্তুকি কমানোকে একমাত্র লক্ষ্য না করে ভর্তুকির ন্যায্যতা নিশ্চিত করা। বিদ্যুৎ বা জ্বালানির দাম হঠাৎ বাড়িয়ে দরিদ্র পরিবারকে আরও চাপে ফেলা সমাধান নয়। বরং উচ্চ আয়ের ভোক্তা ও বেশি ব্যবহারকারীদের জন্য ভিন্ন মূল্যকাঠামো, দরিদ্র পরিবারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং অপচয় কমানোর উদ্যোগ একসঙ্গে নিতে হবে।

বিশ্ব ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একাধিক খাদ্য ভর্তুকি সমন্বয় করে এবং বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচিকে ভালোভাবে লক্ষ্যভিত্তিক করলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণে সহায়তা করা সম্ভব হতে পারে। সরকারের উচিত এই হিসাবের পদ্ধতি, বাস্তবায়নের শর্ত এবং সম্ভাব্য ব্যয় প্রকাশ করে পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালু করা। লক্ষ্য হবে শুধু সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং প্রকৃত দরিদ্র পরিবারকে নিয়মিত ও সময়মতো সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।

রাজস্ব ন্যায্য না হলে সুরক্ষা টেকসই হবে না

বিশ্ব ব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশের রাজস্ব ও জিডিপির অনুপাত মাত্র ৮.৩ শতাংশ। রাজস্ব বাড়াতে না পারলে দরিদ্রদের জন্য টেকসই কর্মসূচি চালানো কঠিন হবে। তবে কর বাড়ানোর বোঝা যেন নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। কর ফাঁকি, অযৌক্তিক অব্যাহতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতা পর্যালোচনা করে ন্যায্যভাবে রাজস্ব সংগ্রহ করা গেলে সামাজিক সুরক্ষা ও জনসেবার জন্য অর্থের পরিসর বাড়বে।

একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। কত পরিবার সহায়তা পেল, কতজনের আয় স্থিতিশীল হলো, কত শিশু স্কুলে রইল, কত নারী কাজে ফিরলেন, এসব সূচক বাজেটের অংশ হওয়া উচিত। কর্মসূচির বাজেট ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করলেই জবাবদিহি শেষ হয় না; ব্যয় মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন আনল, তাও মূল্যায়ন করতে হবে।

সরকারের জন্য একটি বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে তিন ধাপে অগ্রসর হওয়া। প্রথম তিন মাসে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের তথ্য যাচাই, খাদ্য ও নগদ কর্মসূচির মানচিত্র তৈরি এবং মূল্যস্ফীতির প্রভাব নিয়মিত পরিমাপ। পরবর্তী ছয় মাসে সমন্বিত নিবন্ধনভিত্তিক পরীক্ষামূলক কর্মসূচি, নারী ও তরুণদের কর্মসংস্থান উদ্যোগ এবং উচ্চ আয়ের পরিবারের কাছে বেশি যাওয়া ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস। এক বছরের মধ্যে স্বাধীন মূল্যায়নের ভিত্তিতে সফল কর্মসূচি সম্প্রসারণ। প্রতিটি ধাপে বাজেট, লক্ষ্য, সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং ফলাফল প্রকাশ করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনকে শুধু দারিদ্র্যের একটি সংখ্যা হিসেবে পড়লে এর মূল সতর্কতা হারিয়ে যাবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হলে এবং চাকরি না বাড়লে মানুষের সামান্য সঞ্চয়ও ঝুঁকিতে পড়ে; সামাজিক সুরক্ষা দুর্বল হলে একটি ধাক্কাই পরিবারকে দারিদ্র্যে ঠেলে দেয়। সরকারের কাজ কেবল সংকটের পর সহায়তা দেওয়া নয়, মানুষের ঝুঁকি কমানো এবং আয়ের পথ তৈরি করা। উন্নয়নের সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন পরিবারের বাজারের থলে থেকে খাবার বাদ দিতে হবে না, অসুস্থ হলে চিকিৎসা বন্ধ করতে হবে না, আর কাজ হারালে একটি পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে একা হাঁটতে হবে না।

এম এম মুসা: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক। ই-মেইল: musamiah@gmail.com