‘আমাদের মারাদোনা আর মেসি আছে’

চলে যাওয়ার আগে নাম না জানা ওই পৌঢ় আর্জেন্টাইন সমর্থকটি ঠিকই মনে দ্যোতনা তৈরি করে গেলেন।

মোহাম্মদ জুবায়েরমোহাম্মদ জুবায়েরদোহা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 Nov 2022, 06:00 AM
Updated : 22 Nov 2022, 06:00 AM

ছবির জন্য পোজ দিয়ে ভদ্রলোক দ্রুতই বেরিয়ে গেলেন মেট্রোর দরজা দিয়ে। আর ছবি তোলার সময় সেই পৌঢ় সমর্থক বুকে সাঁটানো ছবির দিকে তর্জনী দিয়ে ইঙ্গিত করে শুধু বলে গেলেন, ‘আমাদের আছে মারাদোনা আর মেসি।’ বলার অপেক্ষা রাখে না, তিনি আর্জেন্টাইন এবং মেসিদের পাঁড় সমর্থকও।

ছবি তোলার ওই মুহূর্তটুকু ছাড়া তার সঙ্গে আলাপের সুযোগ মেলেনি। আল ওয়াকরা থেকে আর্জেন্টিনার অনুশীলন শিবির কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে মেট্রোতে তার সঙ্গে দেখা। ক্ষণিকের জন্য। কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে তিনি ঢুকলেন, সামনের সিটে বসে ভিনদেশি ভাষায় গল্প জুড়ে দিলেন।

বয়স ষাটের কম হবে না। বয়স নয় তিনি তার দিকে দৃষ্টি আটকে গেল মাথার ব্যতিক্রমী টুপির কারণে। আকাশী-নীলের টুপি, মানে আর্জেন্টিনার পতাকা। কৌতুহলী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ঠ।

এরপর চোখ পড়ল তার বুকে ঝোলানো ব্যানার গোছের কিছু একটা ঝোলানো। পায়ের উপর পা দিয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে একটু ঝুঁকে বসে ছিলেন, ফলে ছবিটাও দেখা যাচ্ছিল না স্পষ্ট। গভীর মনোযোগ দিতে দেখা গেল পোস্টারটির ভাঁজে ভাজেঁ উঁকি দিচ্ছে দিয়েগো মারাদোনা ও লিওনেল মেসির মুখচ্ছবি।

ওই ছবি দেখেই মূলত মোবাইল ক্যামেরা অন করা এবং ছবি তুলব বুঝতে পেরে তিনিও হাসিমুখে তড়িৎ উঠে দাঁড়ালেন পোজ দিতে। কেউ কারো ভাষা বুঝি না। কিন্তু তাতে কি? আর্জেন্টিনা, মারাদোনা, মেসি আর ফুটবলের ভাষা তো বিশ্বের সব প্রান্তে একই। দোহার মরুভূমিতেও তার ব্যতীক্রম হবে কেন?

ভদ্রলোক হাসিমুখে ছবি তোলার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। একটা-দুটো ক্লিক দিতে না দিতেই মেট্রো বাতাসের বেগে পরের স্টেশনে পৌঁছে গেল, যেখানে তার গন্তব্য। পোজ দেওয়া শেষ করে সতীর্থদের নিয়ে তিনিও তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেলেন। তার নামটি জানারও সুযোগ মিলল না! কিন্তু ছবি তোলার সময় ছোট্ট যে কথাটি বললেন, তা যেন অদ্ভূত এক দ্যেতনায় দুলিয়ে দিল মনটাকে।

“আমাদের আছে মারাদোনা আর মেসি।”

মারাদোনা আছেন! তিনি না ২০২০ সালে এই নভেম্বরে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন? এই প্রশ্নের আর কি উত্তর হতে পারে? কিছু মানুষের বেলায় মৃত্যুতে জীবন নামের গল্পের খাতা বন্ধ হয় না। মারাদোনার বেলায়ও তাই। পরলোকে পাড়ি জমিয়েছেন দুই বছর আগে, কিন্তু আজও আর্জেন্টাইনদের স্মৃতিতে তিনি অতীত নন, বরং প্রবলভাবে বর্তমান, বিদ্যমান। আগামীতেও হয়তো থাকবেন একইভাবে।

যতদিন না তার মতো করে কেউ একক প্রচেষ্টায় আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দিচ্ছে, নাপোলির মতো পিছিয়ে থাকা দলকে তুলছে সাফল্যের সপ্তমাকাশে, ততদিন মারাদোনা নিশ্চিতভাবে থাকবেন আর্জেন্টাইনদের হৃদয়ে। হয়তো বাকি বিশ্বের ফুটবলপিয়াসীদের মনেও।

অনেক সমালোচনার স্রোত পেরিয়ে আসা মেসিও এখন আর্জেন্টাইনদের নয়নের মণি। দেশকে বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দিতে পারতেন না বলে কত না কটু কথা হজম করতে হয়েছে তাকে। আড়ালে কেঁদেছেন, রাগে-ক্ষোভে ‘অবসরও’ নিয়েছেন, কিন্তু পরে ঠিকই নাড়ির টানে ফিরেছেন তিনি। উগ্র আর্জেন্টাইন সমর্থকরা যতই ‘মেসি আর্জেন্টিনার নয়’ নামের তির ছুঁড়ুক, তিনি থেকেছেন অবিচল।

প্রতিকূল স্রোতে সাঁতরে চলা মেসিও ফল পেলেন ২০২১ সালে। ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তিনি কোপা আমেরিকার ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ফিরিয়ে দিলেন আর্জেন্টিনাকে। সেই থেকে দলটির সমর্থকদের কটু কথার স্রোত কিছুটা থিতিয়ে গেল বটে, কিন্তু প্রত্যাশার পারদ যে চড়ল আরও উঁচুতে।

কাতার বিশ্বকাপেও মেসি আর্জেন্টিনার মাঠের ভেতর-বাইরের নেতা। কোচ লিওনেল স্কালোনির পরিকল্পনাও মূলত এই মহাতারকাকে ঘিরে। বিশ্বকাপের আঙিনায় দেশটি ১৯৮৬ সাল পরবর্তী অন্ধকার পথচলার শেষের দেখা পেতে তাকিয়ে আছে মেসির দিকে।

এবারও যে মেসি যে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের আশার আলো তা ওই বয়সী লোকটির ছোট্ট কথাতেই পরিষ্কার। অনুভবের পাল্লায় একটা মানুষ কতটা আত্মীক হলে, হৃদয়ে ছাপ ফেলতে পারলে এভাবে বলা যায়-আমাদের মারাদোনা আর মেসি আছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক