Published : 30 Apr 2026, 12:41 PM
দেশের মাটি ছেড়ে প্রবাসে রান্নাঘরের তপ্ত কড়াই আর আগুনের শিখার সঙ্গে আমাদের সখ্য প্রতিদিনের। নুন-মশলার ঘ্রাণ আর ঘাম মোছার তোয়ালেই যেন আমাদের পরিচয়।
বাংলাদেশে প্রায়ই একটা কথা কানে আসে, “আমাদের দেশে ভালো শেফ নেই” কিংবা “দক্ষতার বড় অভাব”। কিন্তু একজন শেফ হিসেবে বাস্তব কিচেন লাইফে আমি এক অন্য সত্য দেখেছি। আমাদের দেশের মানুষের হাতের জাদু কোনো অংশেই কম নয়। সমস্যাটা আসলে হাতের কারুকার্যে নয়, সমস্যা মগজের গভীরে গেঁথে থাকা কিছু মান্ধাতা আমলের চিন্তাধারায়।
প্রবাসে আমরা কঠোর পরিশ্রম করতে জানি, দিনরাত আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে পারি। কিন্তু যেখানে রান্নার সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান আর পেশাদারিত্বের সংযোগ ঘটানোর প্রয়োজন হয়, ঠিক সেখানেই আমরা হোঁচট খাই।
আমাদের দেশের অনেক প্রতিভাবান রন্ধনশিল্পী ক্যারিয়ারের মাঝপথে এসে থমকে যান কেবল ‘শর্টকাট’ খোঁজার নেশায়। মাত্র দুই-তিন বছর কাজ করেই নামের আগে ‘শেফ’ পদবি বসানোর যে অস্থিরতা আমাদের মধ্যে কাজ করে, তা দীর্ঘমেয়াদে ক্যারিয়ারের ভিত নড়বড়ে করে দেয়।
তড়িঘড়ি করে ওপরে ওঠার এই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। আমরা কে কত বেতন পেলাম বা কার আগে কার প্রমোশন হলো, সেই তুলনায় এতটাই বুঁদ হয়ে থাকি যে, নিজের দক্ষতা বাড়ানোর সময়টুকু আর হয়ে ওঠে না। আমরা ভুলে যাই, রান্না কেবল পেট ভরানোর কাজ নয়, এটি একটি সূক্ষ্ম বিজ্ঞান। নতুন সব কৌশল শেখা আর প্রতিনিয়ত নিজেকে আপডেটেড রাখার পেছনে সময় ও শ্রম বিনিয়োগ না করলে এই আধুনিক যুগে টিকে থাকা অসম্ভব।
ইউরোপের নামি-দামি রেস্তোরাঁগুলোর ঝকঝকে কিচেনে কাজ করার স্বপ্ন আমাদের দেশের অনেক শেফেরই থাকে। অনেকেই সেই সুযোগ পান, কিন্তু সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানোর গল্প খুব কম। ইউরোপের কোনো বড় কিচেনে ঢুকতে পারাটাই শেষ কথা নয়, বরং সেখান থেকেই শুরু হয় যোগ্যতার আসল লড়াই।
প্রবাসে গিয়ে আমাদের অনেক ভাই-ই এক ধরনের আত্মতৃপ্তিতে ভোগেন। তারা মনে করেন, “আমি তো ইউরোপ পৌঁছে গেছি, আর কী লাগে!” এই ‘পৌঁছে গেছি’ মানসিকতা তাদের শেখার পথ বন্ধ করে দেয়। ফলে তারা বছরের পর বছর একই কাজ করে যান, কিন্তু নিজের মান বাড়িয়ে বড় কোনো পজিশনে যাওয়ার কথা চিন্তাও করেন না।
ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ডে একজন শেফ হওয়া মানে কেবল ভালো রান্না করা নয়, এর পেছনে থাকে গভীর বৈজ্ঞানিক জ্ঞান। সেখানে ‘হ্যাজার্ড অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কন্ট্রোল পয়েন্ট’ বা সংক্ষেপে ‘হ্যাসাপ’-এর মতো আধুনিক খাদ্য সুরক্ষা নিয়মগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হয়। এই তাত্ত্বিক বিষয়গুলো আর আধুনিক কিচেন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা করার অনীহা আমাদের প্রমোশনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এর সঙ্গে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয় ভাষাগত দক্ষতা। পেশাদার যোগাযোগ বা স্থানীয় ভাষাটা ঠিকমতো রপ্ত না করলে কোনোভাবেই একটি কিচেনের লিডার বা নেতা হওয়া সম্ভব নয়।
ইউরোপের কিচেন আমাদের কাছ থেকে কেবল গাধার খাটুনি চায় না, তারা চায় ‘স্মার্ট কোয়ালিফিকেশন’। বাংলাদেশিরা পরিশ্রমী হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও আমরা প্রায়ই কর্মী আর নেতার তফাতটা বুঝতে পারি না। আমরা হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে কিচেন হেলপার হিসেবে টিকে থাকতে পারি, কিন্তু একজন এক্সিকিউটিভ শেফ হওয়ার জন্য যে বিশ্বমানের জ্ঞান আর নেতৃত্বের গুণাবলি দরকার, সেখানে আমাদের অনেক ঘাটতি থেকে যায়।
আমরা আমাদের চেনা গণ্ডি বা কমফোর্ট জোনের বাইরে বের হতে ভয় পাই। ইউরোপের মাটিতে সম্মান পেতে হলে তাদের সংস্কৃতি আর খাদ্যাভ্যাসকে নিজের ভেতর লালন করতে হয়। যারা আজ সেখানে সফল হয়েছেন, তারা কেবল বিদেশের রেসিপি মুখস্থ করেননি, বরং ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ডকে নিজেদের সহজাত গুণের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। আমাদের অনেকের মধ্যেই এই মানিয়ে নেওয়ার আর প্রতিনিয়ত শেখার মানসিকতার অভাব স্পষ্ট।
আসলে সুযোগ আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের ‘এটুকুই যথেষ্ট’- এমন ভাবনা বড় স্বপ্ন দেখতে বাধা দেয়। আপনি যদি কেবল পেটের দায়ে বা টিকে থাকার জন্য কাজ করেন, তবে সারা জীবন একজন সাধারণ কর্মী হয়েই থাকবেন। আর যদি শেখার জন্য কাজ করেন, নিজেকে প্রতিদিন পাল্টানোর জেদ রাখেন, তবে একদিন আপনিই পুরো কিচেন রাজত্ব করবেন।
পার্থক্যটা কেবল আপনার চেষ্টার পরিধিতে আর নিজের চিন্তাধারাকে আধুনিক করার মানসিকতায়। মনে রাখবেন, কিচেনে ছুরি চালানোর চেয়েও জরুরি হলো নিজের মগজকে শানিত রাখা।
লেখক: ইউরোপীয়ান কুইজিন স্পেশালিস্ট ও কিচেন প্রফেশনাল।