জাতীয় পার্টি ভাঙার পরিস্থিতি দেখছেন না জিএম কাদের

তবে দলের ব্যাপারে মানুষের উপলব্ধি ভালো না, মন্তব্য করেন তিনি।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 Feb 2024, 12:46 PM
Updated : 3 Feb 2024, 12:46 PM

দলের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নাম দিয়ে ও তার আদর্শ ধারণ করে আরও ১০টি দল কেউ করতে পারে তবে জাতীয় পার্টিকে ভেঙে আরেকটি দল করার মতো পরিস্থিতি দেখছেন না জিএম কাদের।

শনিবার দুপুরে বনানীতে দলের কার্যালয়ে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় নেতা এমন মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, ‘‘তবে একটা জিনিস আমি বলতে চাই, আমাদের দলের ব্যাপারে মানুষের উপলব্ধি ভালো না।”

দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ও কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ উপনেতা এবং মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বিরোধী দলীয় প্রধান হুইপ নির্বাচিত হওয়ায় ঢাকা মহানগর জাতীয় পার্টি এ সংবর্ধনার আয়োজন করে।

চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব চন্নুকে ‘অব্যাহতি’ দিয়ে দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ নিজেই দলের হাল ধরার ঘোষণা দেন গত ২৮ জানুয়ারি। এর পাঁচ দিনের মধ্যে ৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বিজয়নগরে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘণ্টা দেড়েকের জন্য দখলে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন রওশন এরশাদের অনুসারী নেতারা। 

নির্বাচনের পর রওশনের অনুসারীদের তৎপর হওয়া এবং জিএম কাদের ও চুন্নুর ওপর ক্ষুব্ধ আরেকটি অংশের পদত্যাগের মধ্যে জাতীয় পার্টির বিভক্তি আবার সামনে এসেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের এ বিষয়ে কথা বলেন।

তিনি বলেন, “অনেকে যেমন বলছেন, আমাদের দল ভাগ হয়ে যাবে। দল ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা এই মুহূর্তে আমি দেখি না। আরও একটা দল গঠন করতে পারেন, এরশাদ সাহেবের নাম দিয়ে, তার আদর্শ নিয়ে আরও ১০টা দল গঠন করতে পারেন।

‘‘নতুনভাবে দল গঠন করার প্রক্রিয়া আছে। এরপর সেই দলটি নিবন্ধন করার প্রক্রিয়া আছে। সেটা করে যে কোনো লোক করতে পারেন। আমরা যে কাঠামোতে এগিয়ে যাচ্ছি, সেখান থেকে ভেঙে নিয়ে নতুন করে দল গঠন করার এখনও সেই পরিবেশ বা পরিস্থিতি, সম্ভাবনা আমার চোখে পড়ছে না বা আমি দেখছি না।”

নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘‘আমরা নির্বাচনে ফাইট করে গেছি, সব ঠিক আছে। উনারা শুধু নৌকাটা তুলে নিয়েছিলেন। কেননা উনারা বলেছিলেন, দলীয়করণের মাধ্যমে যে নির্বাচন কুলষিত হয় বা দলীয়করণের কারণে বিভিন্নভাবে যে নিয়ম-কানুনগুলোকে ভঙ্গ করা হয়, সেটার জন্য উনাদের প্রতীক বা প্রার্থী না থাকলে সহজ হবে। কিন্তু উনারা প্রার্থী দিয়েছিলেন, বেশিরভাগ জায়গায় এবং প্রার্থীর সঙ্গে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়েছে সমানভাবে। যাইহোক, এটার মধ্যে পরনির্ভরশীলতা রয়েছে বলে আমি মনে করি।”

জিএম কাদের বলেন, ‘‘আমাদের গবেষক ও সাহিত্যিক মহিউদ্দিন আহমেদ। তার একটা সাক্ষাৎকারে আমাদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, আমরা পরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এর ফলে এ রকম দল থাকার কী দরকার! আরেক দল যদি তাকে নিয়ন্ত্রণই করে, তাহলে সে দলের অর্থ কী এটা আংশিক সঠিক।

"আমরা নিয়ন্ত্রিত হয়েছি, এটা পারশিয়ালি কারেক্ট; আমরা চেষ্টা করছি বেরিয়ে আসার জন্য।”

জাতীয় পার্টির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি বলছি না যে, দল ভাঙবে কিন্তু দলের মধ্যে সংশোধন হওয়া দরকার আছে। কঠোর সংশোধন যদি আমরা করতে না পারি, সামনের দিকে দল ভাঙবে না, দল টিকবে না। দলের অস্তিত্বের মূল্য জনগণের কাছে থাকবে না। দলকে মানুষ ভালোবাসবে না, দলের প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে না, মানুষ মনে করবে না দল তাদের স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে।

‘‘হয়তো মনে করবে কিছু নেতা-নেত্রীদের ব্যক্তিগত স্বার্থে দলটি ব্যবহৃত হচ্ছে। তাহলে জনগণের দল হবে না, জনগণের দল ছাড়া দল টিকবে না।

Also Read: জাপা কার্যালয় দখলে নিয়ে রওশনপন্থিদের সংবাদ সম্মেলন

Also Read: জাপার রওশন-মামুন কমিটির তথ্য সিইসিকে জানিয়ে চিঠি

Also Read: স্থানীয় নির্বাচনে লাঙ্গলের প্রার্থী মনোনয়ন এখন কে দেবেন?

Also Read: নিজেই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান, ঘোষণা করলেন রওশন

Also Read: নিজেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা রওশনের

তিনি নেতাকর্মীদের এক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দলকে শক্তিশালী রাখতে হলে সবাইকে একলাইনে থাকতে হবে। নিজেদের মধ্যে যে ত্রুটি আছে সেগুলো সারিয়ে তুলতে হবে।

‘‘আমরা যদি এটাতে ব্যর্থ হই তবে দল মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।”

‘আওয়ামী লীগ বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে’

নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সমঝোতার প্রসঙ্গে জিএম কাদের বলেন, ‘‘এটা নিয়ে আওয়ামী লীগ বিভ্রান্তিকর একটি স্টেটমেন্ট দিয়েছে। তারা বলেছে, আওয়ামী লীগ ২৬টি আসন ছেড়ে দিয়েছে জাতীয় পার্টির ফেভারে। কিন্তু তারা একটা সিটও জাতীয় পার্টির ফেভারে ছাড়ে নাই। সব জায়গায় তাদের লোক দিয়ে রেখেছে, ফাইট করেছে এবং আমাদের লোক অনেক জায়গায় সেখানে যেকোনোভাবেই হোক পরাজিত করা হয়েছে বা করেছে।

‘‘এতে আমাদের প্রার্থীরা বিভ্রান্ত হয়েছে। অনেকে এটাকে মহাজোট বলেছেন, অনেকে আবার এটাকে সিট ভাগাভাগি বলেছেন। আমি কিন্তু প্রথম দিন থেকে বলছি, এটা মহাজোট হয়নি, সিট ভাগাভাগিও হয়নি। এটা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। আওয়ামী লীগ ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করেছে অথবা ভুলক্রমে করেছে।”

নাম উল্লেখ না করে রওশন এরশাদের নেতৃত্বে একটি অংশের তৎপরতার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘‘সংসদে সংখ্যা কোনো ব্যাপার না। ছয়জন লোক সংসদ কাঁপিয়ে দিয়েছিল গত সংসদে। দুই-তিনজন লোক থাকলেই কাঁপিয়ে দেওয়া যায়। যদি সত্যি কথা বলা যায় এবং বলার সুযোগ পাওয়া যায়।”

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘‘জনগণ সত্যিকার অর্থে বিকল্প খুঁজছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে একটা শক্তিকে গ্রহণ করার জন্য জনগণ বসে আছে। জনগণ জানে, আওয়ামী লীগ চলে গেলে, বিএনপি এলে শুধু মানুষের চেহারার পরিবর্তন হবে। যে অনিয়ম, যে দুর্নীতি, বিভিন্ন ধরনের অত্যচার-অনাচার, টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি সব কিছু একই প্রক্রিয়ায়, একইভাবে চলতে থাকবে।

“তথাপি মানুষ পরিবর্তনের জন্য পরিবর্তন চাচ্ছে এই মুহূর্তে। সত্যিকারের যে পরিবর্তন সেটার জন্য যে দল, সেটা জাতীয় পার্টি দিতে পারবে যদি আমরা আপসকামিতা বাদ দিয়ে দেই।”

একদল নেতাকর্মীদের পদত্যাগ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘ঢাকা মহানগরের আগের কমিটি যখন ভেঙে দেওয়া হয়েছে, তখন তারা প্রেস ক্লাবে মিটিং করে বলেছে, তারা পদত্যাগ করেছে। ৩০-৪০ জন লোক নিয়ে আসে, যাদের বেশির ভাগই জাতীয় পার্টির লোক ছিল না-আমরা যতটুকু ভেরিফাই করেছি। বিভিন্ন জায়গা থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল, কয়েকজন বহিষ্কৃত নেতা ছিলেন। হঠাৎ করে ঘোষণা দিলেন ৬৭১ জন গণপদত্যাগ করেছে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন কমিটি থেকে। এটা মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। এ রকম প্রচারণা আমি খুব কম দেখেছি।

‘‘এই নিউজগুলো আমি হলে ভেরিফাই করতাম; ৬৭১ জনের তালিকাটা দেন। অথবা এটা ভেরিফাই করা হয়নি, ঘোষণা করা হয়েছে। এরপরে কয়েকজন নেতাকর্মী শৌচাগার ব্যবহার করতে চেয়েছিল, তাদের বাধা দেওয়া হয়নি। সেটাকে প্রচারিত হলো-জাতীয় পার্টির অফিস দখল হয়ে গেছে। দখল কতক্ষণ ছিল, কে করল, কেন করল। আমার মনে হয়েছে, এটা আরেকটু ভেরিফাই করা উচিত ছিল।’’

সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত নিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বক্তব্যের সমালোচনা করেন বিরোধী দলীয় নেতা কাদের।

তিনি বলেন, ‘‘আইনমন্ত্রী সেদিন একটি কথা বললেন, সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আরও ৫০ বছর লাগলে দিতে হবে। এটাকে আমি দেখেছি মধ্যযুগীয় ব্যবস্থার।

“এই বিচার যদি আরও ৫০ বছর বিলম্ব হয় তাহলে এটি তো বিচারহীনতা হল। তাহলে আমরা কি দেশকে বিচারহীনতা উপহার দিতে যাচ্ছি।”

সংবধর্না অনুষ্ঠানে দলের মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য শেরীফা কাদের, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক তৈয়বুর রহমান, সদস্য সচিব সুলতান আহমেদ সেলিমসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।