Published : 13 Mar 2026, 05:36 PM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সভাপতিমণ্ডলীর প্যানেল থেকে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলামকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট।
সেই সঙ্গে সংসদে শোক প্রস্তাব থেকে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিতদের নাম অবিলম্বে প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়েছে এ জোট।
শুক্রবার জোটের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “জাতীয় সংগীতের সময় দাঁড়াতে অস্বীকারকারী সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে সংসদীয় বিধিমালা অনুযায়ী যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
“মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত যুদ্ধাপরাধী ব্যক্তি এটিএম আজহারুল ইসলামকে অবিলম্বে সংসদের সভাপতিমণ্ডলীর প্যানেল থেকে অপসারণ করতে হবে।”
বিবৃতিতে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট বলেছে, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই একাধিক ন্যক্কারজনক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যা এই জাতির মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় মর্যাদা এবং ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের সাথে প্রকাশ্য বিশ্বাসঘাতকতা।”
বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে অধিবেশন পরিচালনার জন্য পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন দেওয়া হয়। সরকারি দল বিএনপির চারজনের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর এটিএম আজহারুল ইসলামকে রাখা হয়েছে সেখানে।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই জামায়াত নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল।
অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সেই রায় বাতিল করে তাকে খালাস দেয়।
বৃহস্পতিবার রেওয়াজ অনুযায়ী দেশি বিদেশি বিশিষ্টজন, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নিহত এবং মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে সংসদে শোকপ্রস্তাব গৃহীত হয়।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর ছয়জন এবং বিএনপির এক নেতার নামও শোকপ্রস্তাবে যুক্ত করে নেওয়া হয়।
অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিরোধিতা করে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে বিরোধী দলের এমপিদের হট্টগোল ও ওয়াকআউট করেন। ভাষণের শুরুতে যখন জাতীয় সংগীত বাজছিল, তখন জামায়াতের অনেক এমপি উঠে না দাঁড়িয়ে তাদের আসনে বসে ছিলেন।
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের বিবৃতিতে বলা হয়, “সংসদের শোক প্রস্তাবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যায় অংশগ্রহণকারী আলবদর-রাজাকার বাহিনীর সদস্য দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমন কি যে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে জনগণের কাছে ভোট চেয়েছে, সেই বিএনপি দলের চিফ হুইপ যুদ্ধপরাধীদের নাম প্রস্তাব করে, যা অত্যন্ত লজ্জার।
“সংসদের অভ্যন্তরে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রতিনিধিরা দাঁড়াতে গড়িমসি করে জাতীয় সংগীত ও জাতীয় মর্যাদার প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে। যা রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল। যারা ১৯৭১ সালে এই দেশের জন্মকে রুখতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হয়েছিল, তারা আজ এই স্বাধীন দেশের সংসদে বসে তাদের সেই পুরনো চরিত্রের পরিচয়ই দিয়েছে।”
বিবৃতিতে বলা হয়, “সংসদের সভাপতিমণ্ডলীর পাঁচ সদস্যের একজন হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত (অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ক্যাঙ্গারু কোর্টে মুক্তিপ্রাপ্ত) কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী এটিএম আজহারুল ইসলামকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই ব্যক্তি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। তাকে সংসদের সম্মানজনক সভাপতি মণ্ডলীর প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করা কেবল সংসদের মর্যাদাহানিই নয়, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রীয়ভাবে অবমাননা করা।”
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট বলছে, “২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে, ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে—এই দেশের মুক্তিযুদ্ধের ঘাতক, গণহত্যার নায়কদের পুনর্বাসনের জন্য নয়। সেই অভ্যুত্থানে যে তরুণ প্রজন্ম রক্ত দিয়েছে, তারা রাজাকারের পুনর্বাসন দেখতে রাস্তায় নামেনি।
“আমরা বর্তমান সরকারকে সুস্পষ্টভাবে হুঁশিয়ার করছি, রাজনৈতিক স্বার্থে নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের দল বলে প্রচার করবেন আর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে স্বাধীনতাবিরোধী, গণহত্যাকারী ধর্মান্ধ শক্তিকে তোষণ করে চলবেন, এই পথে হাঁটলে আপনাদের জন্যও একই পরিণতি অপেক্ষা করছে। এদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধকে বিস্মৃত হয়নি। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের ঋণ মুছে ফেলার ক্ষমতা কোনো রাজনৈতিক সমীকরণের নেই।”
গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ ক্কাফী রতন, বাংলাদেশ জাসদ-এর সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া, সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পদাক মোশরেফা মিশু, বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক পার্টির নির্বাহী সভাপতি আব্দুল আলী, জাতীয় গণ ফ্রন্টের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক রজত হুদা, সোনার বাংলা পার্টির সভাপতি সৈয়দ হারুন অর রশীদ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন।
পৃথক এক বিবৃতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ‘স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধীদের’ নামে শোক প্রস্তাব গ্রহণের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাসদ।
বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগও এক বিবৃতিতে ‘৭১ এর যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত ও দণ্ডপ্রাপ্তদের’ নামে জাতীয় সংসদে 'শোক প্রস্তাব' গ্রহণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। দলটি অবিলম্বে এই 'শোক প্রস্তাব' প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে।
দলের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ বিবৃতিতে বলেন, “জাতীয় সংসদে এই শোক প্রস্তাব গ্রহণ শুধু ন্যক্কারজনক নয়, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি এবং ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।