Published : 26 Apr 2026, 07:43 PM
জুলাই আন্দোলন নিয়ে ‘একক কৃতিত্ব’ দাবি করার প্রবণতার সমালোচনা করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
রোববার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন নিয়ে এমনভাবে কথা বলা হচ্ছে, যেন ‘শুধু একটি পক্ষই’ আন্দোলন করেছে।
টাঙ্গাইল ৫ আসনের সংসদ সদস্য টুকু বলেন, “আওয়ামী লীগ ৭১ মনে করে যে আওয়ামী লীগই করছে, আর কেউ যুদ্ধ করে নাই। এরকম আচরণ আওয়ামী লীগ করছে। ইদানীং ওই রোগ তাদের ভিতরে ঢুকছে। জুলাই আন্দোলন খালি তারাই করছে, আর কেউ করে নেই।”
জুলাই আন্দোলনে কার কী ভূমিকা ছিল, ‘তা মানুষ জানে’ মন্তব্য করে এই বিএনপি নেতা বলেন, ওই সময় তিনি কারাগারে ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ারও তার পাশে ছিলেন।
টুকু বলেন, “আমি ম্যাক্সিমাম সময় তাকে আমার বালিশটা দিতাম শোয়ার জন্য।”
চব্বিশের ওই আন্দোলনে শিবির ও ছাত্রদলের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কারও দাবি একরকম, আর বাস্তবতা আরেকরকম।
তিনি বলেন, “এক টেলিভিশনে দেখলাম শিবিরের সভাপতি বলছে, উনি নাকি ওই টাইমে বাজার করেছেন। আর ছাত্রদলের সভাপতি রাস্তায় আহত হয়েছে পুলিশের দ্বারা। তাহলে জুলাই আন্দোলন নিয়ে কার কী ভূমিকা?”
জুলাই সনদ ও গণভোট প্রসঙ্গে টুকু বলেন, জনগণ তাদের সংসদে পাঠিয়েছে আইন পাসের জন্যই।
“আইনের বিপক্ষে কথা বললে হবে না। আইনের পক্ষে কথা বলতে আসুন, আইন নিয়ে কথা বলুন।”
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী গণভোটের পক্ষে কথা বলেছেন। বিএনপি জনগণের বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
“আমরা ৫১ পারসেন্টের প্রায় অধিক প্রতিনিধিত্ব করি। কাজেই ৭০ ভাগের মধ্যে ৫১ ভাগ মানুষ আমাদের কথায় ভোট দিয়েছে, আমাদের নেতার কথায় ভোট দিয়েছে, সেটা স্মরণে রাখতে হবে।”
সরকারকে আওয়ামী লীগ বা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তুলনা করার সমালোচনা করে টুকু বলেন, “এই সরকার মাত্র দুই মাস হয়েছে, অথচ অভিযোগ এমনভাবে তোলা হচ্ছে যেন সরকার পাঁচ বছর পার করে ফেলেছে।
“এইটা কিন্তু ১৪ সালের নির্বাচন মার্কা সরকার না, ১৮ সালের নির্বাচন মার্কা সরকার না, ২৪ এর সরকার না। এটা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের সরকার। কাজেই হিসাব করে পথ চলা উচিত।”
বিরোধী দলের রাজনৈতিক ভাষার সমালোচনা করে টুকু বলেন, “কথায় কথায় বলে ফেলেন, নিঃশেষ করে দিবেন। কাদেরকে? নিশ্চিহ্ন করে দেবেন, কাদেরকে?”
বিএনপির আন্দোলন ও রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, “আন্দোলন করে করে বিএনপি গত ১৭ বছর এই জায়গায় এসেছে। কাজেই আন্দোলনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে কোনো লাভ হবে না।”
বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির অতীত ভূমিকার সমালোচনা করে প্রতিমন্ত্রী টুকু বলেন, “আপনারা ৯৬ সালে ভুল করেছিলেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসার সুবিধা করে দিয়েছিলেন। এখনো ভুলের রাজনীতিতে আছেন। ৮৬ তেও করেছেন, ৯৬ তেও করেছেন।”
তিনি বলেন, আগামী দিনে কোনো আন্দোলন বা সংগ্রাম হলে তা বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে হবে।
বিরোধী দলের বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে টুকু বলেন, “সংসদে কয় এক কথা, বাইরে যাইয়া কয় আরেক কথা। সেইজন্য আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করছিলাম আমি মোনাফেক বলব কি না। যেহেতু আপনি না করছেন, আমিও আর বললাম না।”
এ সময় স্পিকার তাকে বলেন, সংসদে কাউকে ‘মোনাফেক’ বলা যাবে না।
টুকু বলেন, বিএনপি এই দুই মাসে যেসব কাজে হাত দিয়েছে, অন্য কোনো সরকার হলে এমন সাহস করত না।
“আগামী দিনে আসুন ঐক্যবদ্ধভাবে এই সংসদকে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী, আমরা আমাদের বিবেককে সামনে রেখে কাজ করি।”
‘আস্থার ঘাটতি’
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে চট্টগ্রাম ৭ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আস্থার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমরা বারবার করে বলেছি, আমার প্রধানমন্ত্রী বারবার করে বলেছেন, জুলাই সনদের মধ্যে যা যা লেখা আছে অক্ষরে অক্ষরে সেটা বাস্তবায়ন করব আমরা। তবে আমার বিরোধী দলের বন্ধুরা এটা বিশ্বাস করতে রাজি না।”
হুম্মাম বলেন, ‘দীর্ঘ নির্যাতনের অভিজ্ঞতার’ কারণে হয়ত বিরোধী দল এখন কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তবে সংসদের দুই পাশেই নির্যাতিত মানুষ আছেন।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে হুমাম বলেন, “আপনারা যেভাবে ১৭ বছর নির্যাতিত হয়েছিলেন, আমরা এখানে যারা উপস্থিত আছি, আমরা সকলেই নির্যাতিত হয়েছিলাম। আপনারা যেভাবে এখানে সংসদ সদস্য আছেন যে আয়নাঘরে অনেক বছর ছিলেন, আমিও সেই একই আয়নাঘরে সাত মাস থেকে এসেছি।”
তিনি বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্যে সরকার বিরোধী দলের সহযোগিতা চেয়েছে এবং এক দিনের মাথায় কমিটি গঠন করেছে।
মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার প্রসঙ্গে হুমাম বলেন, ওই অধ্যাদেশ ‘দুর্বল’ ছিল। শক্তিশালী বিল আকারে নতুন প্রস্তাব সংসদে আনা হবে।
“আশা করি তারা ভরসা রাখবে যে, যেই ব্যক্তি সাত মাস টর্চার্ড হয়েছে, সেই ব্যক্তি তাদেরকে মিথ্যা কথা বলছে না।”
সরকারের দুই মাসের কাজের ফিরিস্তি
জামালপুর ১ আসনের সংসদ সদস্য ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ২০ বছর চার মাস পর তিনি সংসদে বক্তব্য রাখছেন।
সরকারের দুই মাসের কাজের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “জনগণ প্রধানমন্ত্রীর আচরণ, ব্যবহার ও অঙ্গীকারের প্রশংসা করছে।”
রশিদুজ্জামান মিল্লাত ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম মুয়াজ্জিন ভাতা, খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির কথা বলেন।
হজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বলেন, সৌদি আরবের সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে নুসুক কার্ড দেশে এনে হাজিদের দেওয়া হয়েছে, যাতে সৌদি আরবে গিয়ে তাদের আর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে না হয়।
বিমান ও পর্যটন খাত নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বোয়িং কেনার জন্য চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার। পর্যটন করপোরেশনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বগুড়া, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, ঈশ্বরদী, শমশেরনগর ও পটুয়াখালীসহ কয়েকটি বিমানবন্দর বা স্থলবন্দর চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ারিং অ্যান্ড ওভারহলিং বা এমআরও সুবিধা তৈরি করা গেলে এ খাত থেকে ‘বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব’ বলে মনে করেন প্রতিমন্ত্রী।
ময়মনসিংহের রাস্তা ও হাসপাতালের দুরবস্থা তুলে ধরলেন মুহাম্মদুল্লাহ
ময়মনসিংহ ২ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্য মুহাম্মদুল্লাহ তার বক্তব্যে ফুলপুর ও তারাকান্দার রাস্তা, হাসপাতাল এবং স্থানীয় হামলার অভিযোগ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, তার এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন সুযোগ সুবিধা পায়নি। ফুলপুর ও তারাকান্দায় আইডিভুক্ত রাস্তাগুলোর মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ পাকা; এর মধ্যেও অনেক রাস্তা ‘অচল’ অবস্থায় রয়েছে।
সড়ক মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, এলাকার মানুষ তাকে ‘আলেম হিসেবে বিশ্বাস করে’ সংসদে পাঠিয়েছে, কারণ আগের প্রতিনিধিরা ‘প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি’।
হাসপাতালের পরিস্থিতি তুলে ধরে মুহাম্মদুল্লাহ বলেন, তার দুই থানায় দুটি হাসপাতাল আছে। একটি শুধু আউটডোরভিত্তিক, অন্যটিতে ইনডোর ও আউটডোর আছে। কিন্তু আশপাশের কয়েকটি থানার রোগী সেখানে আসায় বারান্দাসহ বিভিন্ন জায়গায় রোগীরা পড়ে থাকেন।
তিনি বলেন, রোগীদের খাবার, ওষুধ ও চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এ বিষয়ে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
মুহাম্মদুল্লাহ অভিযোগ করেন, পহেলা বৈশাখের সরকারি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তারাকান্দা উপজেলা অফিসে গেলে তার ও দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হয়। পরে প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে ফেরার পথে ১০ থেকে ১৫ জনকে রক্তাক্ত করা হয়।
তিনি ঘটনার তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
খেলাফত মজলিসের এই এমপি কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি বাস্তবায়ন, আলেমদের শিক্ষকতায় যুক্ত করা, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের ভাতা চালু এবং মসজিদভিত্তিক মক্তব শিক্ষা চালুর প্রস্তাব দেন।