Published : 06 Jul 2026, 07:09 PM
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) থমকে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তা পুনরুজ্জীবনে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
সোমবার সার্কের পুনরুজ্জীবন নিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত সেমিনারে তিনি এই পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
সার্ক থমকে যাওয়ার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “রাজনৈতিক অবিশ্বাস, অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় বিরোধ, আন্তঃসীমান্ত উত্তেজনা, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ নিরাপত্তা ধারণার কারণে সার্ক আক্রান্ত হয়েছে।
“ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা ঐকমত্যকে কঠিন করে তুলেছে এবং প্রায়শঃ আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোর গতি কমিয়ে দিয়েছে। তবে সার্কের চ্যালেঞ্জ কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং তা প্রাতিষ্ঠানিকও।”
সার্কের “জোরালো বাস্তবায়ন সক্ষমতা, অর্থনৈতিক শক্তি, আরও কার্যকর বিশেষায়িত মেকানিজম এবং কাজ দেখভাল করার প্রায়োগিক সংস্কৃতি থাকা উচিত” বলেও মত দেন শামা ওবায়েদ।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে ১৯৮৫ সালে গঠিত হয় সার্ক। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ২০০৭ সালে যোগ দেয় আফগানিস্তান।
ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কে তিক্ততার মধ্যে প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে অকার্যকর রয়েছে এ জোটের কার্যক্রম। ২০১৪ সালের পর আর কোনো শীর্ষ সম্মেলন না হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার নেতাদের একমঞ্চে আনতে পারেনি এই আঞ্চলিক সংস্থা।
বিএনপি গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের আগে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও সার্ক পুনরুজ্জীবনে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছিল। এ বিষয়ে ওই সরকারের আহ্বানের জবাবে ভারতের তরফে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসে এবং এর ঝিমিয়ে পড়ার পেছনে পাকিস্তানের কার্যক্রমকে দায়ী করা হয়।
পাকিস্তান প্রশ্নে অনমনীয় অবস্থানে থাকার বার্তা দিয়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছিলেন, বাংলাদেশ যেন ‘সন্ত্রাসবাদকে হালকা করে’ দেখানোর অবস্থানে না যায়।
শামা ওবায়েদ বলেন, “সার্ক যে কঠিন সময়ের মোকাবেলা করছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন প্রক্রিয়া আটকে আছে দীর্ঘদিন। রাজনৈতিক আস্থা দুর্বল। আঞ্চলিক সমন্বয় প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা ও অমীমাংসিত বিরোধগুলো সংস্থার গতিকে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।”
সার্ককে দ্বিপক্ষীয় বিরোধের বাইরে রাখার অঙ্গীকার এ জোটের সনদেই যে আছে, সে কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “সার্ককে অবশ্যই দ্বিপক্ষীয় বিরোধ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। সার্ক সনদ ইতোমধ্যে বলে দিয়েছে যে, দ্বিপক্ষীয় ও বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোকে সার্কের আলোচনায় আনা যাবে না। এই মূলনীতির প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করতে হবে।
“সার্কের মাধ্যমে কোনো দুই দেশকে আলোচনায় আনাটা উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। উদ্দেশ্য হওয়া উচিত, দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা যেন আঞ্চলিক সহযোগিতাকে পঙ্গু না করে, তা নিশ্চিত করা।”
তিনি বলেন, সার্ককে অবশ্যই ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক দক্ষিণ এশীয় প্ল্যাটফর্ম’ হিসাবে থাকতে হবে। এর মূল্যবোধ হল, এই অঞ্চলকে সহযোগিতামূলক কাঠামোতে নিয়ে আসা।
“সুতরাং, ঐকমত্য হওয়া কারিগরি ও উন্নয়নমূলক সহযোগিতা চালু রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সব সদস্য রাষ্ট্রের জন্য দরজাটা খোলা রাখা উচিত আমাদের।”
সার্কের জোরালো কার্যক্রম চলার মধ্যে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন (বিস্ট-টেক) যাত্রা শুরু করে।
ওই বছরই মিয়ানমার এই জোটে যুক্ত হওয়ার পর নাম হয় ‘বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন (বিমসটেক)।
২০০৪ সালে নেপালও সদস্যপদ পায় বিমসটেকের। এরপর দেশের নামের আদ্যক্ষরে পরিবর্তে সংস্থার নামকরণ করা হয় ‘বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন বা বিমসটেক’।

বর্তমানে সাত দেশের জোট বিমসটেকে সার্কের আট সদস্য দেশের মধ্যে পাকিস্তান, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান নেই।
সার্ক ঝিমিয়ে থাকা অবস্থায় বিমসটেক নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে শামা ওবায়েদ বলেন, এ দুই সংস্থার একে একে অপরের পরিপূরক হিসাবে কাজ করার উচিত।
তিনি বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়া অঞ্চলকে যুক্ত করে বিমসটেক। বিমসটেকভুক্ত নয়, এমন দেশকে সঙ্গে নিয়েও বিস্তৃত দক্ষিণ এশীয় পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব করে সার্ক। এই প্ল্যাটফর্মগুলোর উচিত একে অপরের পরিপূরক হওয়া, একে অপরে সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা নয়।”
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “উপ-আঞ্চলিক উদ্যোগগুলো দিয়ে সার্কের গতিবেগ কেড়ে নেওয়া উচিত নয়। বরং, বিস্তৃত আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একেকটি স্তম্ভ হিসাবে কাজ করা উচিত তাদের।”
তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সার্ক ও বিমসটেক উভয়কে সহায়তা করতে পারে। কেননা, উভয় সংস্থাই কানেক্টিভিটি, স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগতে পারে।”
তার ভাষ্য, সার্ক নিয়ে সরকার ‘আশাবাদী’, এবং ‘বাস্তববাদী’।
“রাতারাতি রাজনৈতিক স্বাভাবিকত্ব আনা যাবে, সেই ভান আমরা করছি না। একইসঙ্গে ‘কোনো কিছুই হবে না’– এমন দাবিও আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এজেন্ডা যদি বাস্তবিক, কারিগরি, জনগণকেন্দ্রিক এবং সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে অনেক কিছু করা সম্ভব। প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখা, কার্যকর উদ্যোগগুলোকে জোরদার করা, দুর্বল উদ্যোগকে মেরামত করা এবং যেখানে একমত হওয়া সম্ভব, সেখানে সহযোগিতার পথ তৈরিই হবে পথরেখা।”
আসন্ন মাসগুলোতে সার্ক সদস্যগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। প্রাথমিকভাবে তিনি ঢাকায় সার্কভূক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে আলোচনা করার ইঙ্গিত দেন।
সেইসঙ্গে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠক আয়োজন এবং মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনে সার্ক সচিবালয়ের সঙ্গে মতবিনিময়ের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, “সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগের বিষয়ও বিবেচনা আমরা করতে পারি।”
সার্কের থমকে যাওয়ার কারণ খুঁজতে সব সদস্য রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে অতীতের দিকে তাকানোর পরামর্শ দিতে শামা ওবায়েদ বলেন, “শুধু একবার ভাবুন, সার্ককে যদি অভিন্ন প্রতিষ্ঠান হিসাবে আমরা আলিঙ্গন করতে পারতাম, টেকসই অঙ্গীকার ও রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা নিয়ে এর প্রতিশ্রুতি মেনে চলতাম, গত চার দশকে দক্ষিণ এশিয়া কোথায় পৌঁছে যেত।”
তার দাবি, সার্ক রাজনৈতিকভাবে ‘সংকুচিত’ থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘প্রাসঙ্গিক’ রয়েছে। এর সনদ এখনও কার্যকর। এর সচিবালয় কাজ করছে। এর বিশেষায়িত সংস্থা ও আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো কাজ করছে। এর আইনি দলিল, কারিগরি নেটওয়ার্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি এখনও রয়েছে।
সেমিনারের মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের সেন্টার ফর বে অব বেঙ্গল স্টাডিজের উপদেষ্টা, দিল্লিতে বাংলাদেশের সাবেক হাই কমিশনার তারিক এ করিম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত পররাষ্ট্রসচিব শামসুল হক সেমিনারে একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন।