Published : 21 Apr 2026, 10:13 PM
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আইনগত ভিত্তি নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম।
তিনি বলেন, প্রথম বৈঠকেই কমিশনের প্রস্তাব শুনে তাদের মনে হয়েছিল, ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’।
মঙ্গলবার বিকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।
পরে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির এই সংসদ সদস্য।
ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
৮ অগাস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার কয়েক ধাপে সংবিধান সংস্কারসহ মোট ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করে।
নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন থেকে আসা সুপারিশ ছাড়া অন্য সংস্কার কমিশনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ একগুচ্ছ সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সহমতে আসতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। সে কমিশন গত বছর ১২ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করে। জুলাই জাতীয় সনদ গ্রহণের পর ৩১ অক্টোবর তার মেয়াদ শেষ হয়।
সরকারি দল বিএনপির সদস্য শাহাদাত হোসেন বলেন, “ঘরে এবং বাইরে, সংসদে এবং রাজপথে ঐকমত্য কমিশন নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। ঐকমত্য কমিশনের তেমন কোনো আইনগত ভিত্তি ছিল না।”
বিএনপিতে যোগ দেওয়ার আগে বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান হিসেবে ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে অংশ নেওয়া শাহাদাত বলেন, প্রথম বৈঠকে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, ভোটারের বয়স ১৭ বছর, প্রার্থীর বয়স ২৩ বছর এবং সংসদের মেয়াদ ৪ বছর করতে হবে।
তার ভাষায়, “তখনই আমরা বুঝে গিয়েছি, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়।”
শাহাদাত বলেন, তখনই তারা বুঝেছিলেন, কমিশনের ‘একমাত্র উদ্দেশ্য’ ছিল নির্বাচনকে বিলম্বিত করা।
তিনি বলেন, “আমরা সেই সময় বুঝে গেছি, ঐকমত্য কমিশনের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্বাচনকে প্রলম্বিত করা, নির্বাচনকে বিলম্বিত করা।”
এ সময় বিএনপির প্রতিনিধি হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমদের ভূমিকার প্রশংসা করে শাহাদাত হোসেন বলেন, “তিনি অত্যন্ত চৌকষ এবং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিষয়টির মোকাবিলা করে জাতিকে নির্বাচনের দিকে টেনে উঠিয়ে নিতে পেরেছেন এবং নির্বাচন হয়েছে।”
ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় কত বিষয়ে একমত হয়েছিল, সে প্রসঙ্গেও কথা বলেন শাহাদাত।
তিনি বলেন, “আমরা বলেছি, যতটুকু ঐকমত্য পোষণ করেছি, ততটুকু আমরা বাস্তবায়ন করব।”
তার দাবি, ৮৪টি প্রশ্নের মধ্যে প্রায় ৬৮টিতে ঐকমত্য হয়েছিল। তবে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী একজন হতে পারবেন না, এমন প্রস্তাবে তারা দ্বিমত পোষণ করেছিলেন।
বিএনপির এই সদস্য বলেন, “আজকে যদি আমরা বলি যে বিরোধীদলীয় নেতা এবং দলের প্রধান একজন হতে পারে না, আমরা যদি বলি যে চিফ হুইপ এবং দলের নেতা একজন হতে পারবেন না, সেটা কী শোভনীয় হবে? সেটা কী বাস্তবসম্মত হবে?”
একপর্যায়ে ঐকমত্য কমিশনের একটি প্রস্তাবের প্রসঙ্গ টেনে শাহাদাত বলেন, একদিন বৈঠক এক ঘণ্টার জন্য মূলতবি করে কমিশনের সদস্যরা ফিরে এসে এমন একটি প্রস্তাব দেন, যাতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর কথা ছিল।

তার ভাষায়, ওই প্রস্তাব পেয়ে তারা ‘হতভম্ব’ হয়ে যান।
সরকারি দলের এই সদস্য বলেন, “আমরা দেখলাম, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ওনারা যেভাবে প্রস্তাব দিয়েছেন, নির্বাহী বিভাগকে একেবারে ‘ঠুঁটো জগন্নাথে’ পরিণত করার জন্য।”
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তখন ধরে নিয়েছিল বিএনপি ক্ষমতায় আসবে, তাই ‘কীভাবে বিএনপির হাতপা বাঁধা যায়’, সে চেষ্টাই করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাবের সমালোচনা করে শাহাদাত বলেন, “রাষ্ট্রপতিকে হঠাৎ ফ্রাঙ্কেস্টাইনে পরিণত করার জন্য ওনারা প্রস্তাব দিয়েছেন।”
বক্তব্যের শুরুতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের ব্যক্তিগত নানা অর্জনেরও প্রশংসা করেন শাহাদাত। মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা, ১৯৭৩ সালে ফুটবলে ‘ডাবল হ্যাটট্রিকের’ রেকর্ড এবং সপ্তমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে স্পিকার হওয়া নিয়েও কথা বলেন তিনি।
পরে নিজের নির্বাচনি এলাকার প্রসঙ্গে গিয়ে শাহাদাত বলেন, তার জন্মভূমি লক্ষ্মীপুরের করপাড়া গ্রাম থেকেই ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল এবং ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশনের’ প্রেক্ষাপটে মহাত্মা গান্ধী সেখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করেছিলেন।
তিনি বলেন, “আমরা সেই গ্রামের উত্তরাধিকারী। যদিও আমাদের বলা হয়, আমরা মহাত্মা গান্ধীর ছাগল খেয়ে ফেলেছি। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার ‘পাঁয়তারা’ চলেছে বলেও অভিযোগ করেন এই সংসদ সদস্য।
গেল বছর ২৫ নভেম্বর চট্টগ্রামের লালদিয়ার চরে কনটেইনার টার্মিনাল এবং পানগাঁওয়ে নৌ টার্মিনালের দায়িত্ব যে দুই বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, তারা ১০ বছর পর্যন্ত করমুক্ত সুবিধা পাবে।
চট্টগ্রামের লালদিয়ার চরে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে ডেনিশ কোম্পানি এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে চুক্তি করে সরকার।
একই দিন পানগাঁওয়ের নৌ টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়ে চুক্তি হয় সুইজারল্যান্ডের কোম্পানি মেডলগের সঙ্গে।
তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় সবাইকে ব্যস্ত রাখার সময় একদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার চেষ্টা হয়েছে, অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শাহাদাত বলেন, “এটা অসম চুক্তি।”
তার দাবি, ৫১ একর জমি ৪৮ বছরের জন্য দিয়ে দেওয়া হয়েছে ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের বিপরীতে, অথচ এই পরিমাণ বিনিয়োগ করার মতো উদ্যোক্তা বাংলাদেশেই আছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিডারও সমালোচনা করেন এই এমপি।
তিনি বলেন, “বিডার কোনো অ্যাচিভমেন্ট নাই। নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল, যেটা চট্টগ্রামের হৃৎপিণ্ড, এটা আজকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে।”
এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রয়োজন হলে রাজপথে থাকার ঘোষণাও দেন তিনি।